kalerkantho


ক্রোয়াটদের চোখে স্বপ্নের রং

১৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০




ক্রোয়াটদের চোখে স্বপ্নের রং

মাত্র চল্লিশ লাখ মানুষের ছোট্ট একটি দেশ। গৃহযুদ্ধের ধাক্কা সামলে স্বাধীন হয়েছে দুই দশক আগে; কিন্তু সদ্য স্বাধীন আর দশটা দেশের মতোই এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি যুদ্ধের ধাক্কা। দেশজুড়ে দুর্নীতির ব্যাপকতা, রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে গণমানুষের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ প্রবল। আছে বেকারত্বের যন্ত্রণাও। কিন্তু বুধবার রাতে যেন এ সব কিছুই আড়ালে তুলে রেখেছে ক্রোয়েশিয়ানরা। আগামী তিন দিন আর কিছু ভাবতে চায় না তারা, ভাবনায় শুধুই ফুটবল! বিশ্বকাপের ফাইনালে যে উঠে গেছে তাদের দল!

সেমিফাইনালে এর আগেও একবার উঠেছিল তারা। ১৯৯৮ সালে, সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া ডেভর সুকারের দল প্রথম সুযোগেই উঠে গিয়েছিল শেষ চারে। কিন্তু এর পর থেকে হতাশার পর হতাশা। মাঝের সময়টায় দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার অভিযোগ নিয়ে ফিফার সঙ্গে লড়াই চলেছে ফুটবল ফেডারেশনেরও। অধিনায়ক লুকা মডরিচের মাথার ওপর এখনো ঝুলছে দুর্নীতির বিচারে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার অভিযোগ, যাতে দোষী প্রমাণিত হলে জেলও হয়ে যেতে পারে তাঁর! তবে এখন তিনি সেই ভয়টা দূরে রাখতেই পারেন। রিয়াল মাদ্রিদ তারকা তো এখন ক্রোয়েশিয়ার ৪০ লাখ লোকের নয়নের মণি! বুধবার রাতে সেমিফাইনাল জয়ের পর উন্মাতাল জাগরেবের রাস্তায় নাচতে নাচতে লিয়েরকা ভুসিলিচ যেমন বলছিলেন, ‘দেশটা ছোট্ট, কিন্তু আমাদের আছে হৃদয়। আমাদের ফুটবলাররা হৃদয়ের সবটুকু দরদ দিয়ে খেলে প্রতিটি ম্যাচ, ওরা সবাই এক একজন নায়ক। বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছি আমরা, আমি তো বিশ্বাস করতেই পারছি না!’ পেশায় স্কুলশিক্ষিকা লিয়েরকা জানেন, তাঁদের দেশে সমস্যার শেষ নেই। কিন্তু আপাতত সেসব নিয়ে ভাবতেও চান না তিনি, ‘এখন ওসব তোলা থাকুক। আপাতত আমরা উপভোগ করতে চাই ফাইনালে ওঠাটা।’

উৎসবের প্রস্তুতি ছিল বুধবার সন্ধ্যা থেকেই। রাজধানী জাগরেবের কেন্দ্রস্থলে বড় পর্দায় খেলা দেখতে অন্তত হাজার দশেক ভক্ত সমবেত হয়েছিলেন বৃষ্টি উপেক্ষা করে। রেইনকোটের নিচে ক্রোয়েশিয়ার লাল-সাদা দাবার বোর্ডের মতো জার্সি পরে এসেছিলেন অনেকেই, কারো কারো আবার রেইনকোটটাই জার্সির রঙে সাজানো। ম্যাচের পঞ্চম মিনিটেই ইংল্যান্ড এগিয়ে যাওয়ায় কিছুটা সময় কেটেছে উত্তেজনায়, নিস্তব্ধতায়। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে ইভান পেরিসিচের গোলে সমতা ফিরতেই যেন একসঙ্গে উল্লাসে ফেটে পড়েছে পুরো দেশ, সেই উল্লাসের শব্দকেও পেছনে ফেলেছে অতিরিক্ত সময়ে মানজুকিচের গোলের প্রতিক্রিয়া। আর শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে পুরো দেশটাই যেন হয়ে উঠেছে উন্মাতাল। গাড়ির হর্ন বাজিয়ে, আতশবাজি ফুটিয়ে যেন নরক গুলজার করেছে ভক্তরা। অনেককেই দেখা গেছে নগরকেন্দ্রের জলের ফোয়ারাটির চৌবাচ্চায় নেমে পড়তে!

সৈকত শহর স্প্লিটের দৃশ্যপটও ছিল একই রকম। শহরের প্রতিটি ক্যাফেতে সন্ধ্যা থেকেই ঠাঁই ছিল না তিল ধারণের। একেবারে সাধারণ শ্রমিকরা পর্যন্ত কাজ থেকে ছুটি নিয়ে বসেছিলেন খেলা দেখতে। সেটা বৃথা যায়নি তাদের, ম্যাচ জয়ের পর একজন ভক্তের কণ্ঠে সেই তৃপ্তির সুর, ‘এটা একটা ছোট্ট দেশ, দেখুন কী ঘটছে! সবাই বেরিয়ে এসেছে রাস্তায়, এমন দুর্দান্ত ঘটনা তো আর ঘটেনি সাম্প্রতিক সময়ে!’ আরেক ভক্ত মনে করিয়ে দিয়েছেন বাস্তবতাটাও, ‘আমাদের জন্য এটা একটা স্বস্তির জানালা! আমাদের কাজ নেই, টাকা নেই। রাজনীতিবিদরা নিজেদের পকেট ভরছে। কিন্তু আজ আমরা সেসব কিছুই মনে রাখব না। আজ আমরা সবাই খুশি, কিছুটা সময়ের জন্য হলেও ওরা আমাদের সব কিছু ভুলিয়ে দিয়েছে।’

কিন্তু এরপর? লিয়েরকা জানেন, এরপর একদিন ফিরতে হবে বাস্তবতায়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়তে হবে, জোগাড় করতে হবে বাচ্চার দুধ কেনার টাকা। কিন্তু আজ নয়। অন্য কোনো দিন। এখন চোখে একটাই স্বপ্ন, আরেকটা জয়। সেটা কি সম্ভব? ‘কেন নয়? আমরা তো ইংল্যান্ডকে হারিয়েছি! আর্জেন্টিনাকেও’—স্বপ্নমাখা চোখে বলছিলেন এই তরুণী। বিবিসি



মন্তব্য