kalerkantho


গঙ্গাচড়ার ঘটনা—রামু ও নাসিরনগরের শিক্ষা

মো. নুরুল আনোয়ার

১৪ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



গঙ্গাচড়ার ঘটনা—রামু ও নাসিরনগরের শিক্ষা

ধর্ম মানুষের জন্য। মানবকুলের কল্যাণের জন্য ধর্মের অবতারণা হয়েছে।

সব ধর্মেই মানুষকে শোভন, সুশীল ও সহনশীল হতে শিক্ষা দেয়। সাধারণত মানুষ জন্মসূত্রেই কোনো ধর্মের অন্তর্ভুক্ত হয়। ধর্মান্তর বর্তমানে বিরল ঘটনা। অন্যদিকে মানুষের আয়ুষ্কাল ৫০ থেকে ১০০ বছরের মধ্যে, ব্যতিক্রম বাদ দিলে আমাদের দেশে মূলত চারটি ধর্মের মানুষ বাস করে—মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান। সুদূরকাল থেকে এই বাংলায় মানুষ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের সঙ্গে বসবাস করছে। এ অঞ্চলে প্রথম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অবনতি ঘটে ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিকে ১৯৪৬ সালে ভারত ভাগের আগে। ভয়াবহ ছিল সে সময়কার পরিস্থিতি। এর আগে অন্য ধরনের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল। ১৯০৫-১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গের সময়টাতে। এ দুটি সময় বাদে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক খুবই প্রীতিকর ছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির পর পাকিস্তানি ক্ষমতাসীনরা ধর্মীয় অশান্তির চেষ্টা করলেও শুভ জ্ঞানসম্পন্ন বাঙালিরা তা প্রতিহত করেছিল।

স্বাধীন বাংলাদেশেও বিগত সাত বছরে নিন্দনীয় ও ধিক্কারযোগ্য কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, যা একটা অশুভ পরিণতির ইঙ্গিত দেয় এবং যা আমাদের সুদূর অতীতের গৌরবের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

গত ৫ নভেম্বর শুক্রবার রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া থানার শালেয়াশা ইউনিয়নের লালচান্দপুরের জনৈক রাজু আহম্মদ একই থানার হরকলি ঠাকুরপাড়া গ্রামের মৃত খগেন রায়ের ছেলে টিটু রায়ের বিরুদ্ধে নিজ থানায় এই মর্মে অভিযোগ দায়ের করেন যে টিটু তাঁর ফেসবুকে ধর্মীয় অবমাননাকর ব্যঙ্গচিত্র পোস্ট দিয়েছে। কথিত অবমাননাকর পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় ঠাকুরপাড়া ও আশপাশের গ্রামগুলোতে উত্তেজনা চলছিল, সঙ্গে বিক্ষোভ মিছিলও। উল্লিখিত গ্রামটি রংপুর সদর, তারাগঞ্জ ও গঙ্গাচড়া থানার সীমান্তে অবস্থিত। পরিস্থিতির ধারাবাহিকতায় গত শুক্রবার ১০ নভেম্বর ২০১৭ বিকেল ৩টায় আকস্মিকভাবে শালেয়াশা, বালিপাড়াসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের শত শত মানুষ বিক্ষোভ করে টিটুর বাড়িতে গিয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে। এতে তিনটি ঘর ভস্মীভূত হয়। এরপর আরো সাতটি হিন্দু বাড়িতে গিয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এতে ১৫টি ঘর পুড়ে যায়। টিটুর মা জিতেন বালা বলেন, ‘আমরা কিছুই জানি না, কেন আমাদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হলো?’

এবার ঘটনার উল্টো চিত্রের দিকে দৃষ্টি ফেরাই। জনতার বিক্ষোভ, হামলা ও অগ্নিসংযোগের সংবাদ পেয়ে তিন থানার বিপুলসংখ্যক পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাকালে আক্রান্ত হয়। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও শটগান থেকে গুলিবর্ষণ করে। ফলে শালেয়াশা গ্রামের ইকরামুল হকের ছেলে হাবিবুর রহমান (৩০) ঘটনাস্থলে নিহত হন। ৯ জন গুলিবদ্ধ হয়। এর মধ্যে মাহবুবের অবস্থা গুরুতর। রংপুরের জেলা পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের অদক্ষতা, অযোগ্যতা ও দায়িত্বহীনতার এক জ্বলন্ত ছবি আমরা দেখলাম। দেখলাম রংপুরের জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সুধীজন ও আলেমসমাজের নির্বিকার থাকার মানসিকতা। পুলিশের দিকটি বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। ৫ নভেম্বর অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ কি তাত্ক্ষণিকভাবে তদন্ত শুরু করেছিল? টিটুর ফেসবুক আইডি আছে কি না? থাকলে সেটা আসল, না ফেইক, তাঁর অবস্থান জেনে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রয়োজনে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি? পুলিশের তদন্তের অগ্রগতি বাদী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবহিত করা হয়েছিল কি না? বর্তমানে সিআইডি, পুলিশ হেডকোয়ার্টার, র‌্যাবে মোবাইল বা সাইবার সংক্রান্ত অপরাধের খুঁটিনাটি বিষয় জানার প্রযুক্তি আছে, তাদের সহায়তায় ২৪ ঘণ্টায় ফেসবুক পোস্ট সংক্রান্ত তথ্য জানা সম্ভব। সে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না, তা জানা যায়নি। না হয়ে থাকলে পুলিশের দায় মুক্তির সুযোগ নেই। জেলার এসপি গোয়েন্দাপ্রধানও। তিনি কি অগ্রিম কোনো তথ্য পাননি, তিনি কি জেলার ম্যাজিস্ট্রেটসহ জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা চেয়েছিলেন?

এবার জেলা প্রশাসনের দায়ও দেখা দরকার। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের গোচরে কখন বিষয়টি আসে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিষয়টি তাত্ক্ষণিক অবহিত করেছিলেন কি না? জেলা প্রশাসন বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কী পদক্ষেপ নিয়েছিল? পুলিশ সুপার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করে সহায়তা চেয়েছিলেন কি না? পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণমুখী পুলিশ দলের সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেট কেন অনুপস্থিত ছিলেন? পুলিশ প্রবিধানের নির্দেশনা মোতাবেক পুলিশ সুপার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের গোচরে ঘটনার আগে কখন নিয়েছিলেন?

জনপ্রতিনিধি, আলেমসমাজ, এলিট সমাজ কেন চোখ বুজে ছিল? সমাজের প্রতি, মানুষের প্রতি তাদের কি কোনো দায়বদ্ধতা নেই?

২০১২ সালে কক্সবাজার জেলার রামুতে এক বড়ুয়া যুবকের ফেসবুক স্ট্যাটাস নিয়ে কী হয়েছিল আমরা কি ভুলে গেছি? ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর থানার দুঃখজনক সেই অবমাননাকর ফেসবুক স্ট্যাটাসের কথা কিভাবে বিস্মৃত হলাম? যেখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের এক জেলে যুবককে নিয়ে কত কাহিনি, অথচ তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টই ছিল না। তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পরও তার মুক্তি অনেক কষ্টকর হয়েছিল। অথচ ওই জেলার সরকারি দলের শক্তিশালী এক নেতা নাসিরনগরের দলীয় মন্ত্রীকে কোণঠাসা করার প্রচেষ্টা ছিল সেই ঘটনার মূল সূত্র। বলি হয়েছিল কত পরিবারের সম্পদ, ভীতিকর জীবন কেটেছে কতজনের। ওই জেলায় চাকরি করার কারণে ঘটনা বুঝতে সহজ হয়েছিল।

এদিকে বিলম্বে প্রাপ্ত সংবাদে জানা যায়, এক ধরনের ঘটনায় ফরিদপুর সদর উপজেলার হাটকৃষ্ণপুর বাজারের কম্পিউটার ও মুঠোফোন সারাই ব্যবসায়ী বিষ্ণু কুমার মালোর হাটকৃষ্ণপুর মালোপাড়ার বাড়িতে ভাঙচুর করা হয় গত ২ নভেম্বর সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সেই ২ নভেম্বর রাতে বিষ্ণুকে (২৮) একমাত্র আসামি করে তথ্য-প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় থানায় একটি মামলা করা হয়, যার বাদী হাটকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ব্যবসায়ী যাত্রাবাড়ী গ্রামের ইসারত মুন্সী (৪০)। হাটকৃষ্ণপুর মালোপাড়ার ক্ষীরত চন্দ্র ও লক্ষ্মী রানীর ছেলে বিষ্ণু গত ১০ সেপ্টেম্বর তাঁর ফেসবুকে এ ধরনের স্ট্যাটাস দেখে এটি তাঁর নয় বলে সতর্কমূলক স্ট্যাটাস দেন। আবার ৫৩ দিন পর ২ নভেম্বর তাঁর ফেসবুক থেকে বিষ্ণু কুমার মালো নামে একই আপত্তিকর স্ট্যাটাস দেখে সেদিনই সকাল ৯টা ৪৬ মিনিটে তাঁর ফেইক আইডি দিয়ে স্ট্যাটাসটি দেওয়া হয়েছে বলে সবাইকে সতর্ক করেন। কিন্তু এতেও তাঁর শেষ রক্ষা হয়নি। মামলার আসামি হয়ে গ্রেপ্তার হওয়া, ঘরবাড়ি ভাঙচুর—সবই সম্পন্ন হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও পুলিশের ধীরগতি অগ্রহণযোগ্য।

গঙ্গাচড়ার ঘটনার পর বিবেকহীন মানুষের নানা রকম মন্তব্য শোনা যায়। যেমন—টিটুর গোটা গ্রাম ধ্বংস করা উচিত ছিল। ভারতে গোরক্ষার নামে মুসলিম নিধন হচ্ছে—এটা এর বদলি। মেহেরপুর সীমান্ত দিয়ে ভারত রোহিঙ্গাদের ঠেলে দিচ্ছে, হিন্দুদেরও একইভাবে ভারতে ঠেলে দেওয়া উচিত। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ করেছে, হিন্দুদের তাড়িয়ে রোহিঙ্গাদের স্থান দেওয়া দরকার। মানুষ কত অমানুষ ও দায়িত্বহীন হলে এ ধরনের চিন্তা করা সম্ভব! এটি মানসিক বিকারগ্রস্ততার আরেক রূপ।

শেষে না বলা কথাটি বলতে হচ্ছে। জেলার পুলিশ সুপার, ওসি, সার্কেল অতিরিক্ত এসপি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কী ভূমিকা রেখেছিলেন তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তাঁদের যোগ্যতাও প্রশ্নাতীত নয়। বর্তমানে জেলার আকার বড় নয়। রাস্তাঘাট ভালো। সরকারি যানবাহনও প্রচুর। সঙ্গে আছে মোবাইল ফোনের সুবিধা। কেন জেলা প্রশাসক ঘটনার নিবৃত্তির জন্য কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলেন, তারও তদন্ত হওয়া দরকার। তা না হলে রামু, নাসিরনগর, গঙ্গাচড়া আরো অনেক সৃষ্টি হবে। ধর্মের দোহাই দিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর, লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা কোনোক্রমেই খাটো করে দেখার উপায় নেই। দ্রুততার সঙ্গে তদন্তপূর্বক ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হোক। অন্যথায় ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে অনেক গঙ্গাচড়ার জন্ম হবে।

লেখক : সাবেক আইজিপি


মন্তব্য