kalerkantho


নিখোঁজ, নিরুদ্দেশ, অপহরণ ও গুম বন্ধ হবে কবে

মো. নুরুল আনোয়ার

৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



নিখোঁজ, নিরুদ্দেশ, অপহরণ ও গুম বন্ধ হবে কবে

কয়েক বছর ধরে মিডিয়ার মাধ্যমে মাঝে মাঝে সমাজের খ্যাত-অখ্যাত লোকের হঠাৎ অদৃশ্য হওয়ার ঘটনা পাঠক-দর্শকের নজর কাড়ছে, সেই সঙ্গে ভীতি ও শঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে জনমনে। সাম্প্রতিক নিরুদ্দেশ বা অদৃশ্য হওয়া ১০ জনের কেউই বাড়ি ফেরেননি। এ দফায় রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকায় আছেন ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মীসহ অন্যরা। পুলিশ বা র‌্যাব নিখোঁজদের কোনো হদিস দিতে পারছে না। যদিও এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে তাদের কর্তব্য হচ্ছে ত্বরিত মামলা রেকর্ড করে নিখোঁজদের উদ্ধারে তৎপর হওয়া। এ ক্ষেত্রে তাদের দায়সারা ভাব লক্ষ করা যায়, যা নিখোঁজদের স্বজনদের ব্যথিত, ক্ষুব্ধ ও শঙ্কিত করছে। এই দুটি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সাফসুতরো বলেছেন, তাঁদের কাছে নিখোঁজদের কোনো তথ্য নেই। এরপর সাদা তোয়ালেতে হাত মুছে তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন। বাস্তবতা এড়িয়ে গিয়ে কোনো সত্য বা চাক্ষুষ ঘটনাকে আড়াল করা কি সম্ভব? যাদের পরিবারের সদস্য নিখোঁজ বা নিরুদ্দেশ হয়েছে, হারানো মানুষটি ফেরত না আসা পর্যন্ত তাদের হাহাকার কি থামবে?

গত সোমবার নিখোঁজ হয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান। ওই দিন সন্ধ্যায় ধানমণ্ডি এলাকা থেকে বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দিয়ে তিনি নিখোঁজ হন। মঙ্গলবার খিলক্ষেত এলাকায় ৩০০ ফুট সড়ক থেকে তাঁর গাড়িটি উদ্ধার করা হয়েছে।

এর আগে গত আড়াই মাসে নিখোঁজ বা নিরুদ্দেশ হয়েছেন ১০ জন, এখনো তাঁদের হদিস পায়নি স্বজনরা। তাঁদের মধ্যে বেশি আলোচিত গুলশান থেকে নিখোঁজ ব্যবসায়ী ও বেলারুশের অনারারি কনসাল অনিরুদ্ধ রায়, ২৬ আগস্ট নিখোঁজ হন ছাত্র ইশরাক, ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা সাদাত আহম্মদ, বাংলাদেশ জনতা পার্টির (বিজেপি) সভাপতি মিঠুন চৌধুরী, একই দলের নেতা আশিক রায়, ২৭ অক্টোবর পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জ থেকে অপহৃত হন সাংবাদিক উৎপল দাশ এবং সবশেষে ৭ নভেম্বর মঙ্গলবার নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির জনসংযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক মোবাশ্বার হাসান সিজার। সিজার নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে বনশ্রীর বাসায় যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য মতে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট অব পিসের রিসলভ নেটওয়ার্কের একটি প্রকল্পে গবেষণা করছিলেন। ওই প্রকল্পে গণতন্ত্র, রাজনৈতিক সহিংসতা, মৌলবাদ, ধর্ম ও অসাম্প্র্রদায়িকতা নিয়ে গবেষকরা কাজ করেন। তিনি ওই প্রকল্পের ফেলো ছিলেন। তাঁর প্রবন্ধের নাম ছিল ‘দ্য ল্যাংগুয়েজ অব ইয়থ পলিটিকস ইন বাংলাদেশ : বিয়ন্ড সেক্যুলার রিলিজিয়ন বাইনারি’। সিজার ওই প্রবন্ধ ওয়াশিংটন ডিসিতে উপস্থাপনও করেন। সিজারের নিকটজনদের মতে, উল্লিখিত গবেষণায় জড়িত থাকাই তাঁর নিখোঁজের কারণ। সিজারের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে উদ্বেগ, ক্ষোভ ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার সামনে তাঁর সাথিরা মানববন্ধন করেন। সিজারের ছোট বোন তামান্না ফেসবুকে লিখেছেন, ‘একটি পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্য একটি পিলারের মতো। আমাদের একটি পিলার নেই। সবচেয়ে মজবুত পিলারটি নেই। ’

অতি সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে লেখা এক চিঠিতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক লেখেন, ‘মোবাশ্বারকে খুঁজে বের করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমাদের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল খুবই সজ্জন ব্যক্তি, মানবিকতার সব গুণে সমৃদ্ধ মানুষ তিনি। গত ১২ নভেম্বর নৌ পুলিশের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজ পাওয়া যাবে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে গোয়েন্দারা কাজ করছে। তারা ব্যর্থ নয়, অপেক্ষা করুন। ’ বেশ কয়েক মাস আগে ‘বেলার’ অ্যাডভোকেট রেজওয়ানার স্বামী নারায়ণগঞ্জ-ফতুল্লা এলাকা থেকে অপহৃত হন, অবশ্য তিনি উদ্ধার হন। ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর গভীর রাতে সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় লক্ষ্মীপুরের কোচ থেকে নামার পর অপহৃত হন বিসিএস ক্যাডারের ডা. ইকবাল মাহমুদ। সাত মাস নিরুদ্দেশ থাকার পর কে বা কারা তাঁকে লক্ষ্মীপুরে বাড়ির কাছে ফেলে যায়। অপহরণকালে ভিডিও রেকর্ডে দেখা যায়, একটি মাইক্রোবাসে তাঁকে ওঠানো হচ্ছে, পেছনে পুলিশের একটি ‘পিকআপ’। অথচ স্থানীয় থানা পুলিশ কিছু জানে না বা হদিসও পায়নি। ফেরত আসা ব্যক্তিরা নিখোঁজ সময়ের ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকেন। সিজারের উধাও হওয়ার ব্যাপারে র‌্যাব-৩-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল এমরানুর হাসান ঢাকার একটি দৈনিককে বলেছেন, গতকাল (১১ নভেম্বর) পর্যন্ত তাঁর জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার কোনো খবর তাঁরা জানতে পারেননি। এদিকে নিখোঁজের চার দিন পর র‌্যাব-পুলিশ কোনো খোঁজ দিতে না পারলেও গোয়েন্দা সংস্থার বেনামি সূত্র ব্যবহার করে গণমাধ্যম উল্লেখ করেছে যে মোবাশ্বারের জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার বিষয় গোয়েন্দারা খতিয়ে দেখছে। বিষয়টি তাহলে কি দাঁড়াল?

মাইক্রোবাস ব্যবহার করে র‌্যাব-পুলিশের নাম ভাঙিয়ে বা পরিচয়ে অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায় করে অপরাধীচক্র—এটা একটি জানা ও পুরনো অপরাধের ধরন। সৌভাগ্যবান ব্যক্তিরা জীবিত ফেরেন, অন্যরা না ফেরার দেশে চলে যান। জায়গা-সম্পত্তির লোভে মানুষ সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্রকে অপহরণের কাজে নিয়োগ করে। শিশু অপহরণ এবং এলাকায় ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক প্রভাব নিশ্চিত করার জন্যও অপহরণকারীচক্র ব্যবহৃত হয়। আবার কখনো কখনো জঙ্গি কার্যক্রমে যোগ দিতে তরুণরা স্বেচ্ছা গুম বা নিখোঁজ হয়। বিদেশে পাঠানোর জন্য অর্থ নিয়ে প্রতারণাকারীরাও নিখোঁজ হয়। কোনো কোনো অপরাধীচক্র মাইক্রোবাস, র‌্যাব, পুলিশ, ডিবির জ্যাকেট, হাতকড়া, পিস্তল, ওয়াকিটকি ব্যবহার করে। এ ধরনের একটি ঘটনার খবর ১৩ নভেম্বরের একটি জাতীয় দৈনিকে এসেছে। গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয় দিয়ে একদল লোক মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার চাঁদপুর গ্রামের ইউপি সদস্য হাসানুজ্জামানকে তাঁর গ্রামের চায়ের দোকান থেকে গত ১১ নভেম্বর সন্ধ্যায় টেনে-হিঁচড়ে একটি সাদা মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। দোকানে উপস্থিত লোকজনের জিজ্ঞাসাবাদে অপহরণকারীরা নিজেদের ডিবির লোক বলে পরিচয় দেয়। থানার ওসি এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানান। পোশাক পরে নকল পুলিশ সাজার সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনা আমরা পত্রপত্রিকায় ও নেটে দেখেছি।

নিখোঁজ বা গুমের ঘটনার ভিন্ন চিত্রের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। কয়েক দিন আগে হাইওয়ে বা শিল্প পুলিশের এক এএসআই সঙ্গীয় চারজন অপরাধীসহ এক দম্পতিকে বলপূর্বক আটক ও অর্থ আদায়কালে হাতেনাতে গ্রেপ্তার হন। কক্সবাজার জেলার আসল ডিবি পুলিশের আটজনের একটি দল অপহরণ করে মুক্তিপণের ১৭ লাখ টাকা নিয়ে ফেরার পথে বমাল উখিয়ার সেনা চেকপোস্টে মেজর নাজিমের হাতে ধরা পড়ে। অনেক ঘটনাই প্রকাশ পায় না। প্রকাশ পাওয়া ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ১৫ নভেম্বর বুধবার প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক সংবাদে দেখা যায়, যশোর কোতোয়ালির মডেল থানার সাত কর্মকর্তাসহ ১৬ জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অপহরণ ও গুমের মামলা হয়েছে আদালতে এবং পিবিআইকে তদন্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

র‌্যাবের বিরুদ্ধেও আগে একই ধরনের অভিযোগ শোনা যেত। দুই বছর ধরে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ খুব একটা শোনা যায় না। তবে নারায়ণগঞ্জে র‌্যাব সদস্যদের সংশ্লিষ্টতায় সাত খুনের ঘটনা এবং তালসারা মাজারের সাড়ে তিন কোটি টাকা ডাকাতির ঘটনা মানুষের মন থেকে মুছবে না।

সম্প্রতি রহস্যজনক নিখোঁজগুলো নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে।

বিগত আড়াই মাসের ১০টি নিখোঁজের ঘটনা ভিন্ন চরিত্রের, সাধারণ অপরাধীদের কাজ বলে মনে হয় না। জনমনে ধারণা হচ্ছে, নিখোঁজগুলোর বৈশিষ্ট্য ভিন্নতর। এর কারণও অন্য প্রকৃতির। কোনো ব্যক্তির কার্যকলাপ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও জনস্বার্থের পরিপন্থী মনে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আটক করে আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় বিচারে সোপর্দ করা যায়। এ ধরনের বিশেষ অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আটক ও জিজ্ঞাসাবাদের বিধান আইনেই উল্লেখ আছে। ফৌজদারি কার্যবিধিতে আটক ব্যক্তিকে এক মামলায় ১৪ দিন পর্যন্ত রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়। এ কাজগুলো স্বচ্ছভাবে করলে জনসমর্থন সব সময় অনকূলে থাকবে। মানুষ ক্ষতিকর ব্যক্তিদের সহজে চিনতে পারবে। হলি আর্টিজান ও শোলাকিয়ার ঘটনার পর এ ধরনের সন্দেহজনক ব্যক্তিদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা অধিক দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। আমরাও দেখেছি, দেশবাসী জঙ্গি ও চরমপন্থী কার্যকলাপ আদৌ সমর্থন করে না। এ পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের রহস্যজনক নিখোঁজ বা নিরুদ্দেশ হওয়ার ঘটনা গণমানুষকে ভুল মেসেজ দেবে। ফলে নিখোঁজ সিস্টেমের পরিবর্তে প্রকাশ্য আইনানুগ আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ বেশি ফলপ্রসূ হবে বলে মনে হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ভেবে দেখতে পারে।

লেখক : সাবেক মহাপুলিশ পরিদর্শক


মন্তব্য