kalerkantho


এই সময়

চলতি বছরটি কেমন যাবে

তারেক শামসুর রেহমান

৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



চলতি বছরটি কেমন যাবে

অনেক শঙ্কা, অনেক উত্তেজনা আর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে আমরা ২০১৭ সালটি পার করলাম। এখন কেমন হবে ২০১৮ সালটি? এই অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা, সম্ভাব্য যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড—এসবই কি বজায় থাকবে ২০১৮ সালে? বলার অপেক্ষা রাখে না, ২০১৭ সালের অনেক ঘটনা ২০১৮ সালের বিশ্বরাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে। তবে বেশ কয়েকটি ঘটনার দিকে দৃষ্টি থাকবে অনেকের। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি, ভেনিজুয়েলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি, চীনের বিশ্বভূমিকা, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, বিভিন্ন দেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অগ্রযাত্রা, এমনকি রোহিঙ্গা পরিস্থিতির দিকে লক্ষ থাকবে পর্যবেক্ষকদের।

ইরান সংকট চলতি বছর বিশ্বরাজনীতিতে বড় ধরনের আলোচিত বিষয় হয়ে থাকবে। পাঠক, নিশ্চয়ই আপনাদের স্মরণ আছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত বছর স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ব্যাপারে ছয় জাতির যে সমঝোতা হয়েছিল (জুলাই ২০১৫) তা তিনি মানেন না। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে, ওই সমঝোতার মধ্য দিয়ে ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে নিবৃত্ত করা যায়নি; যদিও সমঝোতায় আগামী ১০ বছর ইরান কোনো পারমাণবিক কর্মসূচি হাতে নেবে না এবং তাদের সব পরমাণুকেন্দ্র আন্তর্জাতিক নজরদারিতে থাকবে—এ রকম একটি শর্ত ছিল। ইসরায়েল প্রথম থেকেই এই সমঝোতার বিরোধিতা করে আসছিল। এখন ট্রাম্প এই বিরোধিতায় যোগ দিলেন। ট্রাম্প যে নয়া নিরাপত্তা স্ট্র্যাটেজি প্রণয়ন করেছেন তার অন্যতম টার্গেট হচ্ছে ইরান। সুতরাং চলতি বছর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরানকে কেন্দ্র করেই ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি আবর্তিত হবে। এরই মধ্যে জেরুজালেমে ইসরায়েলের রাজধানী স্থানান্তরে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত এবং এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-সৌদি-আরব অ্যালায়েন্স মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন একটি মাত্রা এনে দিয়েছে। ইরানকে নিয়ে একদিকে যেমন সৌদি আরবের একটি ‘ভয় ও শঙ্কা’ রয়েছে, ঠিক তেমনি ইসরায়েলের ইরানকে নিয়ে ‘শঙ্কা ও ভয়’ রয়েছে। ফলে এখানে ইসরায়েল ও সৌদি আরবের স্বার্থ এক ও অভিন্ন। গেল বছর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে কতগুলো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ করা গেছে, যার প্রভাব ২০১৮ সালেও থেকে যাবে। প্রথমত, সিরিয়া সংকটে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ আসাদ সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখে। এর মধ্য দিয়ে সিরিয়া-রাশিয়া অ্যালায়েন্স গড়ে ওঠে, যাতে যোগ দেয় ইরান।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে রাশিয়া-সিরিয়া-ইরান ঐক্য অন্যতম একটি পক্ষ, যা কিনা ২০১৮ সালে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে। সিরিয়া ও ইরাক আইএসমুক্ত হয়েছে। এ অঞ্চলে আইএসের সর্বশেষ ঘাঁটি থেকে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস উত্খাত হয়েছে। কিন্তু যে প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে আইএস জঙ্গিরা তাহলে গেল কোথায়? এমন খবরও সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র আইএস জঙ্গিদের সিরিয়া ও ইরাক থেকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে! রাতারাতি হাজার হাজার জঙ্গি ‘হাওয়া’ হয়ে যাবে না। তারা নিশ্চয়ই অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। ২০১৮ সালে আইএস জঙ্গিরা কোথায় তাদের জঙ্গি তৎপরতা শুরু করে সেদিকে দৃষ্টি থাকবে অনেকের। এ ক্ষেত্রে অনেক সম্ভাবনা আছে। ইউরোপে ২০১৮ সালেও সীমিত জঙ্গি আক্রমণের ধারা (লোন উলফ) লক্ষ করা যাবে। মধ্য এশিয়ায় (তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান, তুর্কমেনিস্তান) জঙ্গি তৎপরতা বেড়ে যাবে। আফগানিস্তানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল আইএসের কর্তৃত্বে চলে যাবে। সিরিয়া-ইরাক থেকে আইএস জঙ্গিদের এসব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেশি। মিয়ানমারের রাখাইনে আইএসের তৎপরতা বেড়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কাও করা হচ্ছে।

গেল বছর উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে পারমাণবিক হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। চলতি বছর উত্তর কোরিয়া-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কোন দিকে যায় সেদিকে লক্ষ থাকবে অনেকের। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোনো মহল থেকে উত্তর কোরিয়ায় একটি সামরিক অভ্যুত্থানকে উৎসাহিত করা, সীমিত কমান্ডো আক্রমণের মধ্য দিয়ে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিককেন্দ্র ধ্বংস করে দেওয়া ইত্যাদির কথা বলা হয়েছে। তবে এ ধরনের কোনো ‘সিদ্ধান্ত’ শুধু আঞ্চলিক রাজনীতি নয়, বরং বিশ্বরাজনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। এ ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বড় ধরনের কোনো ‘ঝুঁকি’ নেবেন বলে মনে হয় না। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সরাসরি ‘সংলাপ’ হচ্ছে সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ। কিন্তু চলতি ২০১৮ সালে এ ধরনের সম্ভাবনা কম। গেল বছর উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে জাতিসংঘ বড় ধরনের অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছে। কিন্তু দেখা গেছে, সেই অবরোধ উপেক্ষা করে চীন উত্তর কোরিয়াকে জ্বালানি তেল সরবরাহ করেছে। রাশিয়ার ভূমিকাও এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট নয়। ফলে চীন ও রাশিয়ার সহযোগিতা ছাড়া উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের আওতায় আনা সম্ভব নয়। উত্তর কোরিয়ার এই পারমাণবিক কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রকে প্যাসিফিক অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে সাহায্য করবে। বিশেষ করে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক উপস্থিতি তথা সামরিক কার্যক্রম বাড়াবে।

যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্যাসিফিক কর্মসূচিকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত সম্প্রসারিত করেছে। আর এ জন্যই তারা এশিয়া-প্যাসিফিকের নাম দিয়েছে ইন্দো-প্যাসিফিক। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে তাদের সামরিক তৎপরতা বাড়াবে। এই সামরিক কর্মসূচিতে তারা অস্ট্রেলিয়াকেও জড়িত করেছে। গেল বছর ইউরোপে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে, যার প্রভাব চলতি বছরও থাকবে। ব্রিটেন লিসবন চুক্তি অনুযায়ী ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে আসার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। গেল ডিসেম্বর মাসেই ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে ব্রেক্সিটের কারণে ব্রিটেনকে কী পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে (অর্থের পরিমাণ ৪০ থেকে ৬০ বিলিয়ন ইউরো)। ২০১৯ সালে ব্রিটেনের ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। জার্মানিতে গেল বছর যে নির্বাচন সম্পন্ন হয়, তাতে বর্তমান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের দল বিজয়ী হলেও সরকার গঠনে সেখানে জটিলতা রয়ে গেছে। ডিসেম্বরে এসেও সরকার গঠনের কাজটি সম্পন্ন হয়নি। মে মাসে ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ম্যাখোঁ বিজয়ী হয়েছিলেন। সেটা ছিল একটি বড় ধরনের ঘটনা। সেপ্টেম্বর মাসে কাতালোনিয়ায় গণভোটে স্পেন থেকে বেরিয়ে গিয়ে আলাদা একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশের পক্ষে রায় পড়লেও তা স্পেন স্বীকার করে নেয়নি, বরং কাতালোনিয়া সরকারকে বরখাস্ত করে। ডিসেম্বরের নির্বাচনে ওই বিচ্ছিন্নতাবাদীরাই আবার বিজয়ী হয়। অস্ট্রিয়ার নির্বাচনে উগ্রপন্থীরা বিজয়ী হয়ে সেখানে সরকার গঠন করেছে। জুন মাসে মন্টিনেগ্রো ২৯তম সদস্য হিসেবে ন্যাটোতে যোগ দেয়। এক ধরনের উগ্র জাতীয়তাবাদ ইউরোপের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। মূলত ব্যাপক হারে সিরীয় ও ইরাকি অভিবাসীদের ইউরোপে প্রবেশের কারণেই ওই দক্ষিণপন্থী প্রবণতা বেড়েছে। এটি ২০১৮ সালের রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলবে। ইতালিতে (মার্চ) যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তাতে দক্ষিণপন্থীরা প্রভাব ফেলতে পারে।

গেল বছর দক্ষিণ এশিয়ায়ও অনেক সংবাদ বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। দুর্নীতিতে অভিযুক্ত হয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নেওয়াজ শরিফ প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের একটি সিদ্ধান্ত ছিল। তবে বলা হয়, সেনাবাহিনীর সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণেই শরিফকে সরে যেতে হয়েছিল। ২০১৮ সালে সেখানে নির্বাচন। ওই নির্বাচনে শরিফ ব্যক্তিগতভাবে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। নেপালে সংসদীয় নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছিল ডিসেম্বর মাসেই। এতে নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি (ইউএমএল) ও মাওবাদীদের জোট বিজয়ী হয়েছে। তবে ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত তারা সেখানে সরকার গঠন করতে পারেনি। ভারতে গুরুত্বপূর্ণ গুজরাট রাজ্য সরকারের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে ডিসেম্বরেই। মোদির বিজেপি সেখানে আবারও বিজয়ী হয়। এর মধ্য দিয়ে নরেন্দ্র মোদি ভারতে ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে যে ‘গেরুয়া বিপ্লব’-এর সূচনা করেছিলেন, তা অব্যাহত রাখলেন। ভারতের বেশ কিছু রাজ্যে এখন বিজেপির নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছে। ২০১৪ সালে বিজেপি যেখানে সাতটি রাজ্যে বিজয়ী হয়েছিল (কংগ্রেস ১৩টিতে) সেখানে ২০১৭ সালে বিজেপির হাতে রয়েছে ১৯টি রাজ্য, আর কংগ্রেসের মাত্র চারটি রাজ্য। এর অর্থ মোদির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। এই জনপ্রিয়তা নিয়েই ২০১৯ সালে নরেন্দ্র মোদি ১৭তম লোকসভা নির্বাচনে দল তথা জোটের নেতৃত্ব দেবেন। অন্যদিকে কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছেন রাহুল গান্ধী, যা ছিল অনেকটা প্রত্যাশিত। গত তিন বছরে ভারতে ধর্মবিদ্বেষ আরো শক্তিশালী হয়েছে। চলতি বছরও এই প্রবণতা অব্যাহত থাকবে। এটা সত্য, বিজেপির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ছিল। নোট বাতিল, জিএসটি, গোরক্ষাসহ একাধিক ইস্যু; অন্যদিকে দলিত সম্প্রদায়ের একটি অংশ নানা কারণে বিজেপি সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। কিন্তু দেখা গেল গুজরাট ও হিমাচলের বিধানসভা নির্বাচনে এসব ইস্যু আদৌ ভোটারদের ওপর কোনো প্রভাব ফেলেনি। চলতি বছর কর্ণাটক, রাজস্থান, ছত্তিশগড় ও মধ্য প্রদেশে বিধানসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তখন দেখতে হবে বিজেপি গুজরাট ও হিমাচলের নির্বাচনের ফলাফল (২০১৭) অন্য চারটি রাজ্যে নিয়ে যেতে পারে কি না। নিঃসন্দেহে রাহুল গান্ধীর জন্য আগামী দিনগুলো হবে চ্যালেঞ্জের।

চলতি বছর দুটি দেশের দিকে লক্ষ থাকবে অনেকের। একটি হচ্ছে ভেনিজুয়েলা, অন্যটি কিউবা। ভেনিজুয়েলায় তেলের বড় রিজার্ভ (২৯৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ব্যারেল, প্রতিদিনের সরবরাহ প্রায় ২৫ লাখ ব্যারেল) থাকা সত্ত্বেও দেশটি কার্যত এখন একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্রে’ পরিণত হয়েছে। মাদুরোর অর্থনৈতিক নীতি সেখানে বড় ধরনের সংকটের সৃষ্টি করেছে। মাদুরো সংবিধান পরিবর্তন করে দিন দিন কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের যথেষ্ট অবনতি ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্র সেখানে সরকার পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে পারে! চলতি বছর সেখানে গণ-অসন্তোষ পরিস্থিতিকে কোথায় নিয়ে যায় সেদিকে লক্ষ থাকবে অনেকের। একই কথা প্রযোজ্য কিউবার ক্ষেত্রেও। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কিউবার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমলে তাতে এসেছে বড় অনিশ্চয়তা। ট্রাম্প সেখানে আরো সংস্কার চান। সুতরাং কিউবার দিকেও দৃষ্টি থাকবে অনেকের। কেননা চলতি বছরের মার্চে রাহুল কাস্ত্রো ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা স্থগিত করেছেন।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্যারিসে জলবায়ু চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ১৯৫টি দেশ এতে স্বাক্ষর করেছিল। পরে ২০১৬ সালের ২২ এপ্রিল জাতিসংঘের সদর দপ্তরে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে এটি অনুমোদিত হয়েছিল এবং আন্তর্জাতিক আইনে পরিণত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রও তখন এই চুক্তি অনুমোদন করেছিল এবং জাতিসংঘের সদর দপ্তরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাতে স্বাক্ষর করেছিল। এটা এখন বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুতরাং গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের হার কমাতে হবে। প্যারিস চুক্তিতে সেভাবেই সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এখন ট্রাম্প বলছেন, তিনি এই চুক্তি মানেন না। তিনি চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাম প্রত্যাহারের কথাও বলেছেন। ফলে সত্যি যদি যুক্তরাষ্ট্র জলবায়ু চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়, তাহলে বিশ্বের তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা আদৌ সম্ভব হবে না। ভুলে গেলে চলবে না ‘জ্বালানি’ একটা বিশাল ব্যবসা। ট্রাম্প নিজে ব্যবসায়ী। তিনি যা করছেন, তা ব্যবসায়ীদের স্বার্থেই করছেন। আজ উষ্ণতা বৃদ্ধির ব্যাপারে ট্রাম্প যেসব কথাবার্তা বলছেন, তা শুধু বিজ্ঞানীদের গবেষণাকেই অস্বীকার করছে না, বরং বিশ্বকে একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেওয়ার শামিল। চলতি বছর জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনা অব্যাহত থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা থাকবে প্রশ্নের মুখে।

বৃহৎ শক্তির মধ্যে সম্পর্ক কোন পর্যায়ে উন্নীত হয় সেদিকেও দৃষ্টি থাকবে অনেকের। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গেল বছরে চীন সফরের পরও চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়ে আছে নানা প্রশ্ন। দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে যে ‘সংকট’ তা চলতি বছরও অব্যাহত থাকবে। চীনের বাণিজ্যনীতি নিয়ে ট্রাম্প নানা কথা বললেও গেল বছর তিনি চীনা পণ্যের ওপর কোনো অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেননি, যা তিনি ওয়াদা করেছিলেন। চলতি বছর এ ব্যাপারে তাঁর ভূমিকা কী হবে, সে ব্যাপারেও লক্ষ থাকবে অনেকের। যুক্তরাষ্ট্র টিপিপি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে; কিন্তু নাফটা, কোরিয়া-যুক্তরাষ্ট্র মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কিংবা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়নি। ট্রাম্প বারবার বলে আসছেন এমন চুক্তি ও সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্র ‘উপকৃত’ হচ্ছে না। ফলে চলতি বছর ট্রাম্প এসব ক্ষেত্রে কী সিদ্ধান্ত নেন সেদিকেও দৃষ্টি থাকবে সবার। মোদ্দা কথা, ট্রাম্প চলতি বছর আরো আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারেন। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের আরো অবনতি হতে পারে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার ইঙ্গিত দিলেন ট্রাম্প। সব মিলিয়ে চলতি বছর বিশ্বরাজনীতিতে নানা উত্থান-পতন লক্ষ করা যাবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরো কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বাড়বে।

 

লেখক : অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

tsrahman09@gmail.com


মন্তব্য