kalerkantho


মালয়েশিয়ার আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের সম্ভাব্য চিত্র

এ কে এম আতিকুর রহমান

৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মালয়েশিয়ার আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের সম্ভাব্য চিত্র

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে যে দুটি দেশ সর্বপ্রথম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল মালয়েশিয়া তার একটি। সেই থেকেই মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া সেখানে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত রয়েছে প্রায় সাত-আট লাখ বাংলাদেশি। কয়েক হাজার বাংলাদেশি ‘মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোম’-এর আওতায় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাও গ্রহণ করে আসছে। এরই মধ্যে কয়েক শ বাংলাদেশি আবার সে দেশের নাগরিকত্বও পেয়ে গেছে। সেই মালয়েশিয়ায় এ বছরের যেকোনো সময় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সাধারণ নির্বাচন। আসন্ন এ নির্বাচনের ফলাফল কেমন হতে পারে তা নিয়ে এরই মধ্যে নানা কল্পনা-জল্পনা শুরু হয়ে গেছে। তার হাওয়া এসে পৌঁছেছে বাংলাদেশেও।

মালয়েশিয়ার জাতীয় এবং স্টেটগুলোর সংসদীয় নির্বাচন সাধারণত প্রতি পাঁচ বছর পর হয়ে থাকে। গত জাতীয় নির্বাচন হয়েছিল ২০১৩ সালের মে মাসে। যদিও এখনো নির্বাচনের কোনো তারিখ ঘোষণা করা হয়নি, তবে মালয়েশিয়ার আগামী অর্থাৎ ১৪তম সাধারণ নির্বাচন এ বছরের ২৪ আগস্ট তারিখের মধ্যে অনুষ্ঠানের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কারণ বর্তমান সংসদ ২০১৮ সালের ২৪ জুন তারিখে স্বাভাবিকভাবেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আর সংসদ ভেঙে যাওয়ার দুই মাসের মধ্যে নির্বাচন দিতে হবে। শোনা যায়, চায়নিজ নতুন বছরের পর আর রোজা শুরু হওয়ার আগে একটি সুবিধাজনক দিনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। বিশেষ কোনো ব্যতিক্রম না ঘটলে স্টেটগুলোর নির্বাচনও ওই তারিখে হওয়ার কথা।

১৯৫৭ সালের ৩১ আগস্ট তারিখে ইউনাইটেড মালয় ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের (ইউএমএনও) নেতৃত্বে মালয়েশিয়া স্বাধীনতা লাভ করে। এর আগেই ১৯৫৫ সালে কয়েকটি রাজনৈতিক দল মিলিত হয়ে বারিসান ন্যাশনাল (বিএন) নামে একটি রাজনৈতিক জোট গঠন করেছিল। ওই জোটের অন্যতম শরিক মালয়েশিয়ান চায়নিজ অ্যাসোসিয়েশন (এমসিএ) এবং মালয়েশিয়ান ইন্ডিয়ান কংগ্রেসকে (এমআইসি) নিয়ে ইউএমএনও অদ্যাবধি মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় রয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর জোট পাকাতান রাকিয়েতের (পিআর) জন্ম ১২তম সাধারণ নির্বাচনের পরপরই ২০০৮ সালের এপ্রিল মাসে। ওই জোটের প্রধান দলগুলো হচ্ছে—প্যান ইসলামিক দল পাস (পিএএস), চায়নিজদের ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন পার্টি (ডিএপি) এবং পিপলস জাস্টিস পার্টি (পিকেআর)।

একটি বিশেষ তহবিলের বিপুল পরিমাণ আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নাজিবকে সরানোর উদ্দেশ্যে সম্প্রতি মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে বর্তমান সরকারবিরোধী ভূমিকায় নেমেছেন বিএন জোটের দীর্ঘ সময়ের প্রধানমন্ত্রী তুন ড. মাহাথির মোহাম্মদ। তিনি বিরোধী কয়েকটি দল নিয়ে ‘পাকাতান হারাপান’ (প্যাক্ট অব হোপ) নামে একটি রাজনৈতিক মোর্চাও গঠন করেছেন। ওই জোটে তাঁর নিজের মালয়েশিয়ান ইউনাইটেড ইন্ডিজেনাস পার্টি (পিপিবিএম) ছাড়াও রয়েছে ড্যাপ ও জাস্টিস পার্টি, যে দুটি দল বিরোধী জোটে (পিআর) থেকে গত সাধারণ নির্বাচনে জোটের প্রাপ্ত ৮৯টি আসনের মধ্যে ৭১টি পেয়েছিল। উল্লেখ্য, ড. মাহাথিরের সঙ্গে তাঁর ছেলে কেদাহ স্টেটের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মুখরিজ মাহাথির এবং মালয়েশিয়ার সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী মহিউদ্দিন ইয়াসিনও রয়েছেন।

১৪তম সাধারণ নির্বাচন কেমন হতে পারে, অর্থাৎ সরকারি ও বিরোধী জোটের অবস্থান কোথায় দাঁড়াতে পারে, তা বুঝতে হলে গত নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে একটু আলোকপাত করা প্রয়োজন বলে মনে হয়। ২০১৩ সালের ৫ মে তারিখে ১৩তম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিন নির্ধারণের পরিপ্রেক্ষিতে ৩ এপ্রিল জাতীয় সংসদ (দেওয়ান রাকিয়েত) ভেঙে দেওয়া হয়। ৫ মে খুবই শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ শেষ হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে সুদূর গ্রামাঞ্চলের কয়েকটি নির্বাচনী এলাকা পরিদর্শন করেছি এবং ভোটারদের সুশৃঙ্খলভাবে ভোট দিতে দেখেছি। রাতের মধ্যেই টেলিভিশনে সব আসনের ফলাফল জানা গেল। মোট ২২২টি আসনের মধ্যে সরকারি দলের নেতৃত্বাধীন জোট (বিএন) ১৩৩টি আসন পায় আর বিরোধী জোট ৮৯টি আসন লাভ করে। ১২তম নির্বাচনে প্রাপ্ত আসন থেকে এবার বিএন সাতটি আসন কম পায়। ওই হারানো আসনগুলো ছিল মূলত জোটের অন্যতম শরিক এমসিএর। উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের নির্বাচন থেকেই বিএন দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়ে আসছে।

আগের নির্বাচনগুলোর মতোই ওই নির্বাচনে গ্রামাঞ্চল বিশেষ করে মালয় অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বিএন বেশি ভোট পায় আর শহরাঞ্চলে ভোট বেশি পায় বিরোধী জোট। বিএন যে ১৩৩টি আসন পেয়েছিল, তার মধ্যে ১০৮টিই ছিল গ্রামাঞ্চলের আসন। বিরোধী জোটের ৮৯টির মধ্যে ৭২টি আসনই ছিল উপশহর বা শহর এলাকার। বলতে গেলে ওই নির্বাচনটি ছিল শহর আর গ্রামের ভোটারদের মধ্যে যুদ্ধ। বেশি শিক্ষিত বনাম কম শিক্ষিত ভোটারের লড়াই। চায়নিজ আধিক্য এলাকার ৩০টি আসনই বিরোধী দল পেয়েছিল। মালয় অধ্যুষিত এলাকা হলেও শহর বা উপশহর হওয়ার কারণে সেখানেও বিরোধী দলের আসন সংখ্যা বেশি দেখা গেছে। তাই আগের মতো মালয় অধ্যুষিত এলাকা আর বিএনের দুর্গ হিসেবে থাকেনি। সম্ভবত শিক্ষা আর শহুরে আধুনিক জীবনের প্রভাব এ পরিবর্তনের পেছনে কাজ করেছে।

গত নির্বাচনে সরকারি ও বিরোধী জোটের ভোটযুদ্ধে কেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল, সে চিত্রটিও একটু দেখে নেওয়া যায়। মোট আসন ২২২টির মধ্যে ৯৮টি আসনে ক্ষমতাসীন জোট এবং বিরোধী জোটের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতা হয়, যার ৬০টিতে সরকারি এবং ৩৮টিতে বিরোধী জোট সামান্য কয়েকটি ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করে। ৫২টি আসনে মাঝামাঝি পর্যায়ের ভোট ব্যবধানে প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতা হলেও ৭৭টি আসনে দুই জোটের প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান ছিল অনেক বেশি। ওই ব্যাপক ভোট ব্যবধানে সরকারি জোট ৪৪টি আসনে জয়লাভ করে আর বিরোধী জোট জয়ী হয় ৩৩টি আসনে। অর্থাৎ বিরোধী জোটের চেয়ে মাত্র ১১টি আসন নিশ্চিন্তভাবে বেশি পেয়েছিল সরকারি জোট।

জনপ্রিয়তার বিচারে বিএন পেয়েছিল গ্রাম এলাকার ৫৭ শতাংশ ভোট, উপশহর এলাকার ৪৭ শতাংশ এবং শহর এলাকার ৩৬ শতাংশ ভোট। উল্লেখ্য, শহর এলাকার ফলাফলে এটি স্পষ্ট ছিল যে দিন দিন সরকারি মোর্চার জনপ্রিয়তা হ্রাস পাচ্ছিল। ভূমিপুত্র অধ্যুষিত সাবাহ ও সারওয়াক স্টেট দুটিতেও বরাবরের মতো বিএন ছিল খুবই শক্তিশালী আর বিরোধী জোট অত্যন্ত দুর্বল। নির্বাচনের ফলাফলে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট ছিল যে বিএন গ্রাম এলাকায় বেশি আসন পেয়ে ক্ষমতায় থাকতে পেরেছে। এ ছাড়া ওই নির্বাচনে বিরোধী জোটের দুর্বল এলাকাগুলোও চিহ্নিত করা গেছে (সরকারি জোটের ভোট ব্যাংক হিসেবে খ্যাত সাবাহ, সারওয়াকসহ)। বলতে গেলে গত নির্বাচনের ফলাফল একটি সমাজের বিভক্তিকরণ ছাড়াও শহুরে ও গ্রামীণ জনগণের বিভাজনকে প্রতিফলিত করেছে।

এবারের নির্বাচনের ফলাফল অনেকটাই গতবারের ধারাবাহিকতায় থাকবে বলে মনে হয়। যদিও বিরোধী জোটে প্যান ইসলামী দল পাস নেই। কিন্তু তার পরিবর্তে মাহাথির যোগ হয়েছে। সে হিসেবে বর্তমান বিরোধী জোট আগের জোটের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হবে বলে বিশ্বাস। প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অর্থ কেলেঙ্কারির যে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে, সে কারণে সরকারি জোটের ভোটে কোনো বিরূপ প্রভাব না পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ মালয়েশিয়ায় এ ধরনের আর্থিক অনিয়মের অনেক ঘটনাই ঘটে থাকে, কয়েকজনে উচ্চবাচ্য করে, জনগণ খুব একটা মাথা ঘামায় না। তবে বিরোধী জোট যদি গ্রামাঞ্চলের ভোট বেশি টানতে পারে, তাহলে নির্বাচনের ফলাফল অন্য রকম হতে পারে। তবে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে মালয়েশিয়ার মোট জনসংখ্যার ৬৯ শতাংশ মালয়। চায়নিজ আর ইন্ডিয়ানরা মিলে ৩০ শতাংশ এবং তাদের  বেশির ভাগই শহর বা শহরতলিতে বাস করে থাকে। উল্লেখ্য, অন্য গোষ্ঠীর চেয়ে মালয়রা, বিশেষ করে ভূমিপুত্ররা অনেক বেশি সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে। সব কথার শেষ কথা—স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ইউএমএনও নেতৃত্বাধীন জোটই (বিএন) সরকার গঠন করে আসছে, সে ক্ষেত্রে ড. মাহাথিরের এই জোট নির্বাচনী ফলাফল ওল্টাতে পারবে কি না সন্দেহ। আর পারলে সেটি হবে মালয়েশিয়ার ইতিহাসে নতুন সংযোজন।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

 


মন্তব্য