kalerkantho


বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়

রফিকুল ইসলাম

১০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রি। জহুরুল হক হলসংলগ্ন শিক্ষক আবাসে পাকিস্তানি সামরিক অভিযানের ভয়াবহতার মধ্যেও পরিবার-পরিজন নিয়ে যখন মৃত্যুর প্রহর গুনছিলাম তখনো সবচেয়ে দুশ্চিন্তার কারণ ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবন নিয়ে। বারবার একটা প্রশ্ন উদয় হচ্ছিল, তিনি বেঁচে আছেন তো! এ প্রশ্নের উত্তর ২৭ মার্চ সকালের আগে পাওয়া যায়নি। ২৭ মার্চ সকালে আমরা বেঁচে আছি কি না দেখার জন্য ক্ষণিকের তরে উদয় হয়েছিলেন আলমগীর কবির ও জহির রায়হান। তাঁরা দ্রুত অদৃশ্য হওয়ার আগে জানিয়ে গেলেন যে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর হাতে বন্দি। কিন্তু জানা নেই তাঁর অবস্থান। এরপর শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তাঁর পুত্র রুমিসহ এসে আমাদের উদ্ধার করে তাঁর মায়ের বাড়িতে আশ্রয় দেওয়ার পর জেনেছিলাম, বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তখন আবার আমাদের মধ্যে নতুন এক দুশ্চিন্তা; বঙ্গবন্ধুকে ওরা কোথায় রেখেছে, তাঁকে নিয়ে ওরা কী করবে? যত দূর মনে পড়ে, পাকিস্তানি পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর একটি আলোকচিত্র প্রকাশ করা হয়েছিল, করাচি বিমানবন্দরের লাউঞ্জে সশস্ত্র প্রহরায় বন্দি বঙ্গবন্ধুর আলোকচিত্র। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার আন্তর্জাতিক গুজব নিরসনের জন্যই এ চিত্র প্রকাশ করা হয়েছিল। পরে আগস্ট মাসে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বন্দিশিবিরে আটক অবস্থায় আমাকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় বারবার প্রশ্ন করা হচ্ছিল, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের জনসভায় আমি ছিলাম কি না এবং সেই সভায় প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ভাষণের তাৎপর্য সম্পর্কে। পরে জেনেছিলাম, তারা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার মামলায় সাক্ষী দেওয়ার জন্য ঢাকা থেকে দুজন সহকর্মী অধ্যাপক ও কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মীকে পাকিস্তানে নিয়ে গিয়েছিল। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা নিয়ে নিজ দেশে পরবাসী সাত কোটি বাঙালি আশঙ্কাগ্রস্ত ছিল।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর আত্মসমর্পণ ও পরাজয়বরণের দিন থেকে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২, মোট ২৫ দিন রণক্লান্ত বাঙালি জাতি দিন গুনেছে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির এবং স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনক্ষণের জন্য। সেই মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হলো বঙ্গবন্ধু যখন করাচি থেকে লন্ডন ও নয়াদিল্লি হয়ে ১০ জানুয়ারি তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে সরাসরি রমনার জনসমুদ্রে অশ্রুসিক্ত হয়ে উপস্থিত হলেন। অবিসংবাদিত নেতা ও জনতার সেই মিলনের অভূতপূর্ব দৃশ্যটি ছিল যেমন বেদনাবিধূর, তেমনি আনন্দমুখর। ৭ মার্চ ১৯৭১ আর ১০ জানুয়ারি ১৯৭২—একই স্থানে বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতি মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল এবং বাঙালি জাতির চূড়ান্ত বিজয় সম্পূর্ণ হয়েছিল সেদিন। বস্তুতপক্ষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণ করলেও বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশে বাঙালি বিজয় উৎসব করতে পারেনি। তারা অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছিল বঙ্গবন্ধুর জন্য। মনে পড়ে, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারির আগে একদিন পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধুর বন্দিদশা থেকে মুক্তির  সংবাদে সমগ্র বাংলাদেশ বিশেষত ঢাকা নগরী প্রচণ্ড উল্লাসে ফেটে পড়েছিল; বাংলাদেশের মানুষ আশা করেছিল, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসবেন এবং তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে সরাসরি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এসে তাঁর প্রিয় দেশবাসীর সঙ্গে মিলিত হবেন। তাই সেদিন অপরাহ্নে ঢাকার সব মানুষ পথে নেমে এসেছিল। তেজগাঁও থেকে রমনা—পথজুড়ে ছিল তাদের প্রাণপ্রিয় নেতাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য। কিন্তু সেদিন তাদের নিরাশ হতে হয়েছিল। পাকিস্তান থেকে ঘোষণা এসেছিল বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশে নয়, লন্ডনে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এটা পাকিস্তানের কোনো কূটকৌশল কি না তা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিল। যা হোক শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর নিরাপদে লন্ডন পৌঁছানোর সংবাদে বাংলাদেশের মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের প্রহর গুনতে থাকে। বঙ্গবন্ধু লন্ডনে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা পেয়েছিলেন। প্রবাসী বাঙালিরাই শুধু তাঁকে সংবর্ধনা জানায়নি, তদানীন্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁকে স্বাগত জানিয়েছিলেন এবং স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের জন্য রাজকীয় বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ বিমানের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এবারও সরাসরি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নয়; মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর আমন্ত্রণে কয়েক ঘণ্টার জন্য নয়াদিল্লিতে যাত্রাবিরতি। দিল্লিতে বঙ্গবন্ধুকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান ভারতের তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। দিল্লি বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হয় এবং তাঁকে নয়াদিল্লির এক বিশাল জনসভায় ভাষণ প্রদান করতে হয়। বিশেষ অনুরোধে সেদিন বঙ্গবন্ধুকে বাংলায় ভাষণ দিতে হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সার্বিক সহায়তা, বিশেষত প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য ভারতীয় সরকার, জনসাধারণ ও বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান।

নয়াদিল্লি থেকে রাজকীয় বিমানবাহিনীর যে বিশেষ বিমানটি বঙ্গবন্ধুকে বহন করে নিয়ে আসছিল, ঢাকার আকাশে তা দৃশ্যমান হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় অপেক্ষমাণ বিশাল জনসমুদ্র উল্লাসে ফেটে পড়ে, কারণ এবার সত্য সত্যই রূপকথার মহানায়কের মতো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর প্রাণপ্রিয় স্বদেশভূমি স্বাধীন বাংলাদেশে বিজয়ীর বেশে ফিরে আসছেন। তার পরের দৃশ্যগুলো বর্ণনার ভাষা আমাদের নেই। তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে তিনি তাঁর পরিবারের কাছে না গিয়ে সোজা এলেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তাঁর প্রিয় স্বদেশবাসীর কাছে। রমনা ময়দানের যে স্থান থেকে তিনি ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন, ঘোষণা করেছিলেন মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের; যে স্থানে পরাজিত পাকিস্তান বাহিনী ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করেছিল, সেই স্থান থেকে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ বঙ্গবন্ধু তাঁর জন্য অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষারত মানুষের সঙ্গে মিলিত হলেন। এই মহামিলনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জয়যাত্রা শুরু হলো।

 

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য