kalerkantho


প্রজন্মের ধারাবাহিকতায় আস্থা রাহুলেই

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

১৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



প্রজন্মের ধারাবাহিকতায় আস্থা রাহুলেই

ভারতীয় রাজনীতিতে একবিংশ শতাব্দীর পাঁচ প্রজন্মের প্রতি আস্থা জানাল ১৩২ বছরের পার্টি কংগ্রেস। দেশের লোকসংখ্যাও প্রায় ১৩০ কোটি। আগের চার প্রজন্ম থেকে পঞ্চম প্রজন্মের রাহুল গান্ধীর ওপরে এসে পড়েছে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। দাদামশাই মতিলাল নেহরুকে বাদ দিলেও জওয়াহেরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী-সোনিয়া গান্ধী—শতাধিক বছরের প্রাচীন দলটি ভারতকে গড়ে তুলেছে। রাহুলকে একদিকে যেমন গেরুয়া বাহিনীর মোকাবেলা করতে হবে, অন্যদিকে দেশ গঠনের কাজও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

রাহুল যে পারবেন তার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে মোদির খাসতালুক গুজরাটের নির্বাচনে। ভোটের হিসাবে রাহুল এগিয়ে। আসনসংখ্যার হিসাবে পিছিয়ে গেলেও রাহুল তাঁর প্রথম চ্যালেঞ্জ গ্রহণে সাফল্য দেখিয়েছেন। অক্সফোর্ডের কৃতী ছাত্র রাহুলের ধ্যান-জ্ঞান হলো গ্রামীণ উন্নয়ন। এ কথা কিছুদিন আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন স্বয়ং অমর্ত্য সেন।

বিগত শতকের ১৯৭০ সালে রাহুল গান্ধী যেদিন জন্মান, সেদিন ঠাকুরমা ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলায় নির্বাচনী সফরে। খবরটি যখন এলো, তিনি তখন বক্তৃতা করছিলেন। বক্তৃতা শেষে সার্কিট হাউসে ঢুকেই খবরটি পেয়ে পশ্চিমবঙ্গের বাকি নির্বাচনী সফর বাতিল করে দিল্লি রওনা হয়ে গেলেন। আমরা সেখানে চারজন রিপোর্টার ছিলাম। তিনি আমাদের লাড্ডু খাইয়েছিলেন।

ইন্দিরার সেই নাতিই এখন শতবর্ষ প্রাচীন কংগ্রেসের কর্ণধার। পরদিন আনন্দবাজারে হেডিং হয়েছিল—ইন্দিরা ঠাকুমা হলেন। ছেলেবেলায় তিনি দেখেছেন বাড়ির মধ্যেই ঠাকুমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। স্কুলে পড়ার সময় তিনি দেখেছেন বাবার খণ্ডবিখণ্ড দেহ। তিরুঅনন্তপুরমে বক্তৃতা করার সময় সন্ত্রাসবাদীরা রাজীব গান্ধীকে উড়িয়ে দিয়েছিল। রাজীব হত্যার পর কংগ্রেস দল কার্যত অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছিল। কংগ্রেস নেতারা সেদিনই সোনিয়া গান্ধীর কাছে গিয়ে কংগ্রেসের দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। সোনিয়া তৎক্ষণাৎ তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরে শোনা যায়, রাহুল ও তাঁর বোন প্রিয়াঙ্কা মাকে রাজনীতিতে যেতে বাধা দিয়েছিলেন।

আট বছর ধরে কাশ্মীর হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের কাছে হিন্দি শেখেন সোনিয়া। ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস যখন ভরাডুবির মুখে, তখন সোনিয়া গান্ধী দলের রাশ টেনে ধরেন। ১৯৯৮ সালেই অটল বিহারি বাজপেয়ি সরকার গঠন করেছিলেন। যাকে বলা হতো এনডিএ। কিন্তু পাঁচ বছরের মাথায় বিজেপির ‘ইন্ডিয়া শাইনিং’ স্লোগানকে মুছে দিয়ে বিরোধীদের সঙ্গে নিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। কিন্তু তখন ছেলে-মেয়ের কথা শুনে তিনি প্রধানমন্ত্রী হননি। প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসান প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. মনমোহন সিংকে। মনমোহন সিংয়ের নিজের ভাষায়, তিনি নিজেও প্রধানমন্ত্রী হতে চাননি। কিন্তু একদিন রাহুল প্রিয়াঙ্কাকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর বাড়িতে এসে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ করেন। ড. সিং সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারেননি। ইউপিএ-১-এর ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে সরকার ফেলে দেওয়ার জন্য বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল বামপন্থীরা। রাহুল উত্তর প্রদেশের আমেথি কেন্দ্র থেকে তিনবারের সংসদ সদস্য। তিনি প্রচণ্ডভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন দেশের গরিব, বেকার ও কৃষকদের সমস্যা তুলে ধরে। দুর্ভাগ্যবশত, ভারতের বিশেষ করে দিল্লির মিডিয়া রাহুলকে সমর্থন করেনি। কিন্তু মানুষ তাঁকে সমর্থন করেছে। ঠাকুরমা ইন্দিরা গান্ধী দেশের গরিবি হঠাও স্লোগান দিয়ে দুই দফায় ১৪ বছর শাসন করেছিলেন। আর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর অবদান পৃথিবীতে স্বীকৃত। কিন্তু তা মেনে নিতে পারেনি পাকিস্তান ও আমেরিকা।

কংগ্রেস সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার আগে আমেরিকার বিভিন্ন শহরে বণিক সভাগুলোতে বক্তৃতা করে ভারতের সমস্যা ও তা কিভাবে মোকাবেলা করা যায় সে ব্যাপারে বক্তব্য দেন। ওয়াশিংটন পোস্ট, নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো কাগজ তার ব্যাপক প্রশংসা করেছিল। দেশের ভেতরে রাজ্যে রাজ্যে এখন একটাই আওয়াজ। মোদির হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে রাহুল নেতৃত্ব দিন। রাহুল সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন। যে বামপন্থীরা একসময় সমর্থন প্রত্যাহার করেছিল, তারাও এখন চাইছে রাহুলের নেতৃত্ব। চাইছে দু-একটি ছোটখাটো দল এবং তৃণমূল কংগ্রেস ছাড়া সব অবিজেপি দলই চাইছে তৃণমূল, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রাহুলই নেতৃত্ব দিন।

মোদি সাড়ে তিন বছর আগে ক্ষমতায় এসে ঘোষণা করেছিলেন—কংগ্রেসমুক্ত ভারত গড়বেন। কিন্তু সাড়ে তিন বছরের মাথায় দেখা যাচ্ছে, মোদির সেই আশা বিশ বাঁও জলের তলায়।

১৯-এর লোকসভা নির্বাচনেই হবে রাহুল গান্ধীর অগ্নিপরীক্ষা। রাহুল মোদিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছেন, বছরে দুই কোটি লোকের চাকরি দেওয়া, কৃষকদের উন্নতি করা এবং ভারতের বিদেশনীতি নিয়ে নিজস্ব অবস্থান থেকে বারবার নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন মোদি। এর কোনোটাই তিনি করেননি। রাহুল এখানেই তাঁকে চেপে ধরে প্রশ্ন তুলেছেন, বেকার সমস্যা সমাধানের কী হলো। উল্টোদিকে নরেন্দ্র মোদিরা বলছেন, অযোধ্যায় রামমন্দির বানাব। দেশে গোহত্যা বন্ধ করব। ভারতের মানুষের খাওয়া-পরার সমস্যা ভুলে মোদির মাথায় শুধু হিন্দু-ভারত তৈরি করার চিন্তা।

রাহুলের কর্মসূচির মধ্যে আছে পরিবর্তন। বিজেপিকে সরিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে ক্ষমতায় আনা। ধর্মনিরপেক্ষতাই হলো ভারতের মূল আদর্শ। বিদেশের মাটিতে গিয়েও রাহুল স্পষ্ট করে দিয়েছেন, নরেন্দ্র মোদির ‘আচ্ছে দিন’-এর ফানুস চুপসে গেছে। সম্প্রতি বাহরাইনে গিয়ে রাহুল বলেছেন, ভারতের সরকার বদলের প্রশ্নে অনাবাসী ভারতীয়দেরও সক্রিয় হতে হবে। তিনি অভিযোগ করেছেন, মোদির নেতৃত্বে সরকার কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না। ফলে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। সেই ব্যর্থতা চাপা দিতে মানুষের ক্ষোভকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় পরিণত করতে চাইছে বিজেপি সরকার। কে কী খাবে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জন্য মানুষ খুন করা হচ্ছে। এমনকি স্পর্শকাতর মামলার বিচারের পরে বিচারপতির রহস্য-মৃত্যু ঘটছে।

রাহুলের অভিযোগগুলো সম্পর্কে বিজেপি নেতারা মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছেন। সম্প্রতি মধ্যপ্রদেশে বিজেপির এক সংসদ সদস্য হুমকি দিয়েছেন, যদি তাঁদের মুখ্যমন্ত্রীকে নিন্দা করা হয়, তাহলে কংগ্রেস নেতা জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিরার হাত কেটে নেওয়া হবে, আর জিব কেটে নেওয়া হবে। বিজেপি-আরএসএসের হিংসা ছড়ানোর বহর এ রকমই।

রাহুল খুব দ্রুত কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির রদবদল করবেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, রাহুল যেভাবে এগোচ্ছেন, তাতে মোদিরা মন্দির-মসজিদ ইস্যু করে আর বেশি দূর এগোতে পারবে না। ভারতের মানুষ চায় চাকরি, চাকরি। কৃষকদের উন্নয়ন। আর্থিক সংস্থান। দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের হ্রাস। জোটবন্দি এবং জিএসটি চালু করায় ভারত সরকারের আর্থিক অবস্থা তলানিতে ঠেকেছে। যার ফলে সাধারণ মানুষ নিম্নবিত্ত, গরিব থেকে আরো গরিব হয়ে যাচ্ছে। দুই বেলা খেতেও পারছে না। রাহুল ঠিক এ জায়গাটায় ধরেছেন।

কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বলা হচ্ছে, মোদির সব স্লোগান রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে একের পর এক ধূলিসাৎ করে দেওয়া হবে। কংগ্রেস ২০১৯ সালেই আবার ক্ষমতায় ফিরে আসবে। ভারতের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা এরই মধ্যে বলতে শুরু করেছেন, মন্দির-মসজিদ ইস্যুই নয়। ইস্যু হলো, মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার। মানুষ সব বুঝতে পারছে।

 

লেখক : কলকাতার প্রবীণ সাংবাদিক


মন্তব্য