kalerkantho


শতবর্ষী বিদ্যাপীঠ ও সেকালের শিক্ষকেরা

এস এম মুজিবুর রহমান

১৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



১৯১৮ সাল। সুসভ্য ইউরোপে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অসভ্যপনা তখনো শেষ হয়নি। পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুরের শেখরনগরে রায়বাহাদুর শ্রীনাথ রায় তখন প্রতিষ্ঠা করেছেন শিক্ষা-শান্তি-সভ্যতার লক্ষ্যে একটি বিদ্যালয়, যার নাম রায়বাহাদুর শ্রীনাথ রায় ইনস্টিটিউশন। এলাকার প্রাচীন এই বিদ্যাপীঠ ১০০ বছর ধরে এলাকায় আলোকবর্তিকা হিসেবে বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছে। সৃষ্টিকালে শেখরনগর শ্রীনগর উপজেলার অন্তর্গত হলেও পরবর্তী সময়ে তা সিরাজদিখান উপজেলার অংশ এবং বলতে গেলে প্রাণকেন্দ্র।

১৯১৮ সালের ১ জানুয়ারি সেই বিদ্যালয়ের শ্রেণি পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয়েছিল তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনক্রমে। কিন্তু যত দূর জানা যায়, প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন এই বিদ্যাপীঠে পাঠদান শুরু হয় ১৯১৭ সালের গোড়ার দিকেই। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন আসে তারও এক বছর পরে।

ভারতবর্ষের অতি প্রাচীন ইতিহাসে যে জনপদের উল্লেখ আছে, তিন হাজার বছর ধরে সেই বিক্রমপুরেরই এক বর্ধিষ্ণু এলাকা হলো শেখরনগর, যার চারপাশের গ্রামগুলোও এই ইতিহাস বহন করে। মৌর্যবংশের সম্রাট অশোক যখন প্রাচীন ভারতবর্ষ শাসন করেছেন, খ্রিস্টপূর্ব ২৬৯ থেকে ২৩২ পর্যন্ত, তখন তাঁর সাম্রাজ্যের পূর্ব পাশের এক বর্ধিঞ্চু জনপদের নামই বিক্রমপুর, যার সাদামাটা বাংলা অনুবাদ হলো ‘মৌর্যের জনপদ’। আর শেখরনগর ভৌগোলিক কারণেই গড়ে ওঠে বিক্রমপুরের অন্যতম শিক্ষা-সংস্কৃতির উজ্জ্বল জনপদ হিসেবে। তারপর বাংলার শাসনক্ষমতায় পালবংশ, চন্দ্রবংশ, সেনবংশ এসেছে, আবার চলেও গেছে। কিন্তু শেখরনগরের মান রেখে চলেছে এই জনপদ। আর রায়বাহাদুরের অম্লান সৃষ্টি আরবিএস ইনস্টিটিউশন এই মান ধরে রেখেছে ১০০ বছর ধরে।

আবার ফিরে আসি গোড়ার কথায়। বহু প্রতিভার সূতিকাগার এই জনপদে জন্ম নিয়েছেন বহু সমাজসেবক ও জ্ঞানী ব্যক্তিত্ব। রায়বাহাদুর শ্রীনাথ রায় তাঁদের একজন। শেখরনগরের ঐতিহ্যবাহী রায় পরিবারে তাঁর জন্ম; পিতার নাম শ্রী পূর্ণ রায়। ১৮৫৯ সালের ২৬ জুন জন্ম নেওয়া শ্রীনাথ রায় পরবর্তী সময়ে সারা বিক্রমপুরেই খ্যাতি লাভ করেন তাঁর শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জনহিতকর কার্যক্রমের জন্য। বিক্রমপুর অনেক এলাকা থেকে এগিয়ে থাকলেও কলকাতার আশপাশের এলাকা থেকে বলতে গেলে বিক্রমপুর অনেকটা পিছিয়েই ছিল। পিছিয়ে পড়া এই জনপদে স্কুল তৈরির পরও ছাত্র জোগাড় করা অতটা সহজ ছিল না। পাড়ার টোল থেকে পড়ুয়া শিশুদের তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করা হতো এই স্কুলে। শিক্ষার আলোবঞ্চিত মাতা-পিতা-অভিভাবকদের বসিয়ে বুঝিয়ে তাঁদের ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর জন্য তখন যেসব আলোকিত মানুষ নিরলসভাবে কাজ করেছেন, তাঁদের মধ্যে প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী, শ্রী মতিলাল দেবু, শ্রী শশীভূষণ পৈত, কৃষ্ণ কুমার বাড়ই, শ্রী পার্বতী চরণ দে সরকার, শ্রী কালীমোহন দে সরকার উল্লেখযোগ্য। তাঁদের অক্লান্ত চেষ্টায় এবং শিক্ষকদের নিরলস প্রচেষ্টায় ১৯১৮ সালের ১ জানুয়ারি পাওয়া গিয়েছিল শুধু মানবিক (কলা) বিভাগের অনুমোদন। ১৯৩২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর পাওয়া গেল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী স্বীকৃতি, যা এই বিদ্যাপীঠের একটি মাইলফলক।

ভারত বিভক্তির পর তৎকালীন পূর্ববাংলার অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো এই বিদ্যালয়ও শিক্ষক সংকটে পড়ে। তবে এই পর্যায়ে যেসব ত্যাগী শিক্ষক তাঁদের সব কিছু দিয়ে আজকের এই বিদ্যাপীঠকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, তাঁদের মধ্যে হেমচন্দ্র গাঙ্গুলী, সুধীর চন্দ্র গাঙ্গুলী, আবদুল হালিম, আজিজুল হক, মো. আফসার উদ্দিন, শ্রীরাম চন্দ্র মণ্ডল, মো. নুরুল ইসলাম, চিন্তাহরণ চক্রবর্তী, আবদুর রব খন্দকার, কালীপদ চক্রবর্তী কাব্যতীর্থ, হরি মাধব ঘোষ, মোসলেহ উদ্দিন খান, অমল চন্দ্র সরকার, মো. আবদুর রউফ ও আমীর আলীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নানা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও তাঁরা তাঁদের মেধা ও কর্মকাণ্ড দিয়ে মহান এই বিদ্যাপীঠকে আগলে রেখেছিলেন। তাঁদের বেশির ভাগই কোনো টাকা-পয়সা নিয়ে ছাত্রদের পড়াতেন না। মেধাবী ছাত্রদের তাঁরা বিনা পয়সায় পড়াতেন। ষাটের দশকের গোড়ার দিকে আমাকে যাঁরা শ্রেণিকক্ষের বাইরে নোট তৈরিতে সাহায্য করেছেন, তাঁরা হলেন কালীপদ চক্রবর্তী, নুরুল ইসলাম, আবদুর রব খন্দকার ও চিন্তাহরণ চক্রবর্তী। আজও আমার মনে আছে, আমের মৌসুমে তাঁদের সবাই মেধাবী ছাত্রদের বাড়িতে নিয়ে উঠানে বসিয়ে আম খাওয়াতেন, সঙ্গে দিতেন অমূল্য উপদেশ ও অসীম স্নেহ।

গেল ১০০ বছরে প্রাচীন এই বিদ্যাপীঠ থেকে অসংখ্য ছাত্র বেরিয়েছেন, যাঁরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন চোখে পড়ার মতো। দুই বাংলায়ই তাঁরা তাঁদের কীর্তির স্বাক্ষর রেখেছেন এবং রেখে চলেছেন। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী, পুলিশের আইজি, প্রশাসনে উচ্চপদের কর্মকর্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খ্যাতিমান শিক্ষক, গবেষণাগারের সফল গবেষক, চিকিৎসার ক্ষেত্রে ভালো ডাক্তার, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ জীবনের প্রথম পর্যায়ে শিক্ষা পেয়েছেন এখানে। সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের নামকরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন কেউ কেউ, যেখানে স্থানীয় ও অস্থানীয় লোকবল নিয়োগ পাচ্ছে, দেশের অর্থনীতিতে চোখে পড়ার মতো অবদান রেখে চলেছেন তাঁরা। বিক্রমপুরের এই এলাকায় মেয়েরা অন্য জায়গার তুলনায় আগে থেকেই এগিয়ে ছিল। একাত্তরের পরে সেই এগিয়ে যাওয়াটা ত্বরান্বিত হয়েছে। এতেও অবদান রয়েছে আমাদের এই মহান বিদ্যাপীঠের।

সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আরবিএস ইনস্টিটিউশন যে অবদান রেখে চলেছে, তা উত্তরোত্তর আরো বৃদ্ধি পাবে, সেই আশাবাদ রেখে শতবর্ষী এই মহান প্রতিষ্ঠানকে আমার অকৃত্রিম শ্রদ্ধা জানাই।

 

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক

বর্তমানে ওমানের সুলতান কাবুস বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক


মন্তব্য