kalerkantho


রোহিঙ্গা যাবে বাড়ি!

মো. জাকির হোসেন

১৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



রোহিঙ্গা যাবে বাড়ি!

দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমারের মগ দস্যুদের উর্দিপরা ও উর্দিবিহীন বংশধরদের চরম নৃশংসতা ও নির্মমতার শিকার রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গার জীবন মানুষের জীবন নয়। মোশাররফ হোসেন খান তাঁর ‘রক্তপ্লাবিত রোহিঙ্গাদের প্রতি’ কবিতায় বলেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের মাথার ওপর কোনো ছাদ নেই/পায়ের নিচে মাটি নেই/এমনকি জঙ্গল কিংবা সাগর-নদীতেও/তাদের ঠাঁই নেই!/তারা আমূল উদ্বাস্তু/তাদের কোনো আশ্রয় নেই/নেই কোনো অভিভাবক/ মৃত্যুই যেন শুধু তাদের নিত্যসঙ্গী!’

কারণে-অকারণে জবাই, গুলি আর আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে। আগুন দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে শত শত গ্রাম। রোহিঙ্গাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ইচ্ছাখুশি কেড়ে নেওয়া হয়েছে যখন-তখন। রোহিঙ্গা নারীরা মগের বংশধরদের কাছে অঘোষিত গনিমতের মাল, কিংবা জাপানি সৈন্যদের জন্য ফিলিপাইনের নারীদের দিয়ে জবরদস্তি করে বানানো কমফোর্ট স্টেশন। ধর্ষণ রোহিঙ্গা নারীদের নিয়তি, দলবদ্ধভাবে ধর্ষিত হওয়ার জন্যই তাদের জন্ম। স্বামী, সন্তান ও মা-বাবার সামনে ধর্ষিত হওয়া রোহিঙ্গা নারীদের ললাটলিখন। রোহিঙ্গারা যেহেতু মিয়ানমার সরকার, সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরদের চোখে আদমসন্তানই নয়, তাই তাদের মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার—এসব থাকতে নেই। মিয়ানমারের জান্তা সরকার তাই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদের জন্য সব মানবাধিকার নিষিদ্ধ করেছে, তাদের দাসের জীবন যাপন করতে বাধ্য করেছে। জন্মভূমির সঙ্গে মানবসন্তানের এক রহস্যময় অতল মমতার বন্ধন। ‘জননী-জন্মভূমি স্বর্গাদপি গরীয়সী’। জন্মভূমিকে ভালোবেসে রোহিঙ্গারা তাই দাসত্বের জীবনকেই মেনে নিয়েছিল। কিন্তু মগের বংশধররা রোহিঙ্গাদের দাস হিসেবে মেনে নিতেও নারাজ। তাদের দৃষ্টিতে রোহিঙ্গারা দাসেরও অনুপযুক্ত।

রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার ফেরত প্রদানসহ কফি আনান কমিশনের সব সুপারিশ যখন রোহিঙ্গাদের পক্ষে, সেই আনান কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিনই আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির হামলা রহস্যময়। হামলার পর মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশুদের ওপর যে বর্বর, নৃশংস ও পৈশাচিক আচরণ করেছে তা গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ব্যাপকতাকেও হার মানায়। লজ্জায়, অপমানে মানবতা মিয়ানমারের ত্রিসীমানা ছেড়েছে সেই কবেই। এমন নারকীয় অবস্থা থেকে জীবন বাঁচাতে এবং পুনরায় ধর্ষিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেতে সাত লক্ষাধিক রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। আগের কয়েক লাখ মিলিয়ে ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা জবরদস্তি বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রিত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পরম মমতায় অসহায় রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা সংস্থানের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে বলিষ্ঠ কণ্ঠে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের রোডম্যাপ তুলে ধরেছেন। ভারত, চীন, রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশ বাদে সমগ্র বিশ্বমানবতা যখন মিয়ানমারের বর্বরতার বিরুদ্ধে একাট্টা, তখন মিয়ানমারের মন্ত্রী রোহিঙ্গাদের বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আসেন। প্রস্তাবের সূত্র ধরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে ২৩ নভেম্বর একটি অ্যারেঞ্জমেন্ট সম্পাদিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনে চুক্তি বোঝাতে Treaty, Convention, Covenant, Protocol, Pact, Final Act, Memorandum of Understanding (MoU), Declaration, Agreement, Charter, Resolution, Modus Vivendi ইত্যাদি কমবেশি পরিচিত হলেও চুক্তির বাধ্যবাধকতা বোঝাতে অত্ত্ধহমবসবহঃ খুব পরিচিত নয়। তবে চুক্তির নাম যা-ই হোক, দুই পক্ষের মধ্যে সম্পাদিত কোনো আন্তর্জাতিক দলিলের ভাষা থেকে বোঝা যাবে সেটি আইনগত বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করে কি না। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে অ্যারেঞ্জমেন্ট স্বাক্ষরের পর নানা তর্ক-বিতর্ক, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ চলছে। এসব তর্ক-বিতর্ক, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ধরন দেখে মনে হয়, রোহিঙ্গা সংকট সরকার সৃষ্টি করেছে, সরকার ইচ্ছা করলেই মিয়ানমার সরকারকে কান ধরে উঠবোস করাতে পারে। কিন্তু সরকার ইচ্ছাকৃতভাবেই তা করছে না। এক সাংবাদিক তো কলামই লিখেছেন, সরকার রোহিঙ্গাদের ফেরত দিতে চায় না।

যা হোক, সব কুতর্কের অবসান ঘটিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনসংক্রান্ত যেসব চুক্তি ও দলিল স্বাক্ষর করা দরকার, তার সবই সম্পন্ন হয়েছে। গত ২৩ নভেম্বর প্রথম বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনসংক্রান্ত অ্যারেঞ্জমেন্ট স্বাক্ষর করেন। ১৯ ডিসেম্বর যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন ও এর কার্যপ্রণালী ঠিক করা হয় এবং সর্বশেষ ১৬ জানুয়ারি মাঠপর্যায়ের চুক্তি ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট চূড়ান্ত ও স্বাক্ষরিত হয়। এর অর্থ হলো, প্রত্যাবাসনসংক্রান্ত সব ধরনের আইনগত প্রক্রিয়া শেষ। এখন কি রোহিঙ্গারা বাড়ি যেতে শুরু করবে? এ নিয়ে রয়েছে নানা সংশয়। কেউ কেউ মনে করছেন, অ্যারেঞ্জমেন্টের আওতায় রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন হবে বিবাহিত কন্যার বাপের বাড়িতে নাইয়র যাওয়ার মতো সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য। এরপর স্থায়ী বসবাসের জন্য স্বামীর বাড়ি ফেরত আসার মতো রোহিঙ্গারাও বাংলাদেশে ফেরত আসবে। মিয়ানমারকে কিভাবে আমরা বিশ্বাস করব? তারা ধারাবাহিকভাবে আমাদের বিশ্বাস ভঙ্গ করছে। ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনসংক্রান্ত চুক্তির মূল একটি বিবেচ্য বিষয় ছিল, রোহিঙ্গারা যাতে আর আসতে বাধ্য না হয় সে জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেবে মিয়ানমার। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৯৭৮, ১৯৯২, ২০১২, ২০১৬ এবং সর্বশেষ ২০১৭ সালের আগস্ট পর্যন্ত বারবার রোহিঙ্গা নির্যাতনের একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। আরেকটি মত হচ্ছে, মিয়ানমার আদতে রোহিঙ্গাদের নেবে না, নিলেও অল্প কিছু ফেরত নেওয়ার পর নানা অজুহাতে প্রত্যাবাসন বন্ধ করে দেবে। অ্যারেঞ্জমেন্ট আসলে আইওয়াশ, সময়ক্ষেপণ করে আন্তর্জাতিক চাপ প্রশমনের কৌশল এটি। এসব অনুমান একেবারে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, বাসস্থান ও জীবিকার ব্যবস্থা এবং জবরদস্তি কেড়ে নেওয়া সম্পদ-ভূমি ফেরতদানের ব্যবস্থা করা না হলে রোহিঙ্গাদের আবারও শরণার্থী হিসেবে ফিরে আসার আশঙ্কাই বেশি। মিয়ানমারের সরকার ও সেনাবাহিনী শুধু দুর্বৃত্ত ও বর্ব নয়, এরা মিথ্যুক ও প্রতারকও বটে। তাই অ্যারেঞ্জমেন্টের শর্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা কৌশল ও অজুহাত অবলম্বন করে প্রত্যাবাসনে নানা অজুহাতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে তারা কসুর করবে না। এ ছাড়া জ্বলন্ত ঘরবাড়ি থেকে প্রাণ হাতে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আসা রোহিঙ্গাদের কাছে মিয়ানমারের অধিবাসী প্রমাণের দালিলিক বাধ্যবাধকতা, প্রত্যাবাসনের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকার সুযোগ নিয়ে মিয়ানমার প্রত্যাবাসন ঝুলিয়ে রাখতে পারে।

ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট চুক্তির যে বিষয়গুলো প্রত্যাবাসনকে বিলম্বিত ও অকার্যকর করতে পারে তা হলো : এক. ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্টে রোহিঙ্গাদের ‘ইন্টারনালি ডিসপ্লেসড পারসন’ (আইডিপি) বা বাস্তুচ্যুত ক্যাম্পে রাখা যাবে না উল্লেখ থাকলেও রোহিঙ্গারা ফেরত গেলে তাদের স্ট্যাটাস কী হবে, তাদের জাতীয়তা কী হবে, আদৌ তারা নাগরিকত্ব ফিরে পাবে কি না, কত দিনের মধ্যে নাগরিকত্বের বিষয়ে সুরাহা হবে তার উল্লেখ না থাকায় রোহিঙ্গাদের ফেরত যেতে  আত্মবিশ্বাসী হওয়ার ক্ষেত্রে টানাপড়েনের সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা বেশি। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজ কথা বলেছে বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গার সঙ্গে। খুব অল্পসংখ্যক রোহিঙ্গাই দেশে ফিরতে চেয়েছে। ইসলাম হুসেন নামের এক রোহিঙ্গা বলেন, ‘এখানে থাকা হয়তো সত্যি কঠিন; কিন্তু আমাদের কেউ ধর্ষণের শিকার হচ্ছে না। হত্যার আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে না আমাদের।’ দুই. যেসব রোহিঙ্গা ফেরত যাবে তাদের একটি ফরম পূরণ করতে হবে। একটি পরিবারের জন্য একটি ফরম ব্যবহার করা হবে। এই ফরমে একটি পরিবারের সব সদস্যের তথ্য থাকবে। মিয়ানমার এ ধরনের ফরম যাচাই-বাছাই করে দেখবে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে নিবন্ধিত নাম ও মিয়ানমারের রেকর্ডে মিয়ানমারের ভাষায় নামে গরমিল হতে বাধ্য। এ অবস্থায় প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিন. ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট অনুযায়ী মিয়ানমার দুটি রিসেপশন সেন্টার স্থাপন করবে রাখাইনে। যেসব রোহিঙ্গা স্থলপথে ফেরত যাবে, তাদের তং পিউ লেতওয়ে রিসেপশন সেন্টারে রাখা হবে। যারা নদীপথে যাবে, তাদের নগয়া খো ইয়া রিসেপশন সেন্টারে রাখা হবে। রিসেপশন সেন্টার থেকে কত দিনের মধ্যে রোহিঙ্গাদের নিজ গৃহে ফেরত পাঠানো হবে তা উল্লেখ না থাকায় এটি ছদ্ম বাস্তুচ্যুত ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। চার. বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রস্তাব ছিল সপ্তাহে পাঁচ দিন করে প্রতি সপ্তাহে ১৫ হাজার রোহিঙ্গা ফেরত যাবে। কিন্তু মিয়ানমার অভ্যন্তরীণ আয়োজন বিবেচনায় বাংলাদেশের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট চুক্তিতে প্রতি সপ্তাহে ১৫০০ করে রোহিঙ্গা ফেরত নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এই সংখ্যা তিন মাস পর পুনর্বিবেচনা করে বাড়ানো হবে। এটি শুধুই আশ্বাস। এ সংখ্যা বাড়ানো না হলে, সপ্তাহে ১৫০০ জন করে ফেরত নিলে প্রায় ১২ লাখ আশ্রিত রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে আনুমানিক ১৭ বছর সময়ের প্রয়োজন হবে। এই ১৭ বছরে নতুন জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গা সন্তানের হিসাব করলে তার যে সংখ্যা দাঁড়াবে তার কী হবে? পাঁচ. প্রত্যাবাসন চুক্তিতে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে জাতিসংঘের ভূমিকা খুবই অপ্রতুল ও অস্পষ্ট। ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্টে উল্লেখ করা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের আত্মবিশ্বাসী করার জন্য জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থাকে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়েই জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। শরণার্থী যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায়, বিশেষ করে কোনো আশ্রিত মিয়ানমারের অধিবাসী কি না এ প্রক্রিয়ায় শরণার্থী সংস্থাকে যুক্ত করা হলে তারা কার্যকর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে পারত। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকার করায় তাদের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই। ২০১২ সালে রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হোয়াইট কার্ড দেওয়া হয়েছিল। ২০১৫ সালে গণতান্ত্রিক সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্যেই তা আবার প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়। সে সময় প্রেসিডেন্ট দপ্তরের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ওই কার্ড মার্চ থেকে আপনাআপনিই বাতিল হয়ে যাবে। সে সময় নাগরিকত্ব না থাকা ব্যক্তিদের এনভিসি (ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড) করার প্রস্তাব দেয় প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের দপ্তর। তবে ফ্রন্টিয়ার মিয়ানমারের সেই সময়ের এক প্রতিবেদন বলছে, শুধু ৩৫ হাজার ৯৪২ জন ওই আবেদন করে। আর গোটা রাখাইন রাজ্যে নাগরিকত্বহীন ১০ লাখ মানুষের মধ্যে ওই কার্ড দেওয়া হয় সাত হাজার ৫৪৮ জনকে। তার মানে এই সাড়ে সাত হাজার মানুষের বাইরে আর কোনো রোহিঙ্গার বৈধ কোনো কাগজপত্র নেই। ছয়. রাখাইন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশ সরকার, এমনকি মিডিয়ারও দেখার বিষয়টি সংযুক্ত করা হয়েছে। এটি খুব ভালো ফল বয়ে আনবে বলে মনে হয় না। মিয়ানমার যেখানে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, সেখানে বাংলাদেশের পর্যবেক্ষণের বিষয়টি খুব সম্ভাবনাময় বলে প্রতীয়মান হয় না।

নিজ বাড়ি যাবে রোহিঙ্গারা—এই খবর শুনে তো তাদের হৃদয় আনন্দনৃত্যে মেতে ওঠার কথা। কিন্তু হয়নি। রোহিঙ্গা গণহত্যা ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট, ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে কিংবা ২০১২ সালের জুন মাসে শুরু হয়নি। এটি বেশ কয়েক দশক ধরেই চলছে। মিয়ানমার ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে আসছে। তাদের জাতীয়তা অস্বীকার, নিদারুণ বঞ্চনা, তাদের ইতিহাস ও পরিচয় অস্বীকার, বিয়ে বা শিশু জন্মদানে নিষেধাজ্ঞা,  জবরদস্তি শ্রম, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টির অধিকার অস্বীকার, চলাচলে বলপূর্বক নিষেধাজ্ঞা, নির্বিচারে গ্রেপ্তার, হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, রাষ্ট্রীয় জীবনে রোহিঙ্গাদের ন্যূনতম অংশগ্রহণ অস্বীকার করা, রোহিঙ্গাবিরোধী রাষ্ট্রীয় প্রচারণা, রাষ্ট্র ও অ-রাষ্ট্রীয় কুশীলবদের সম্মিলিত, পদ্ধতিগত ও কাঠামোগত নিপীড়ন ও তীব্র সহিংসতা রোহিঙ্গাদের বাড়ি ফিরে যেতে স্বপ্নবাজ করে তোলে না।

বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের দূরদর্শিতায় অবশেষে দুনিয়াবাসী রোহিঙ্গা মানবতার প্রতি সহমর্মী হয়েছে। আন্তর্জাতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে হলেও রোহিঙ্গাদের বাড়ি ফিরিয়ে নেওয়ার চুক্তি করেছে মিয়ানমার। এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে—প্রথমত, মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখা এবং দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা, যাতে তারা ফেরত যেতে রাজি হয়। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে চলমান আন্তর্জাতিক চাপ হ্রাস পেলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অবস্থার চাপে পড়ে সৃষ্ট মিয়ানমারের আগ্রহ উবে যাওয়ার আশঙ্কাই প্রবল।

 

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

zhossain@justice.com


মন্তব্য