kalerkantho


শুভ জন্মদিন

একজন শিক্ষাবিদ ও কথাশিল্পী

জুরানা আজিজ

১৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



একজন শিক্ষাবিদ ও কথাশিল্পী

ভীষণ হতাশাগ্রস্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে ক্লাস করতে ঢুকেছি। ক্লাসে যিনি পড়াচ্ছেন, তিনি সযত্নে তাঁর শেকসপিয়ারের সনেটের বইটি খুলে পড়াচ্ছেন, কখনো মনোযোগ দিয়ে আমাদের প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে দেখছেন। হঠাৎ করে স্যার বললেন, ‘জীবনে কখনোই আমরা পরাজিত হই না।  মৃত্যু বরং  পরাজিত হয় আমাদের কাছে বারবার। মানুষ  হয়ে জন্মেছি বলেই আমরা এগিয়ে যাই। সত্যি কথা কি জানো, জীবনে  আসলে কোনোই দুঃখ নেই। দুঃখ বা দুঃখের সমান যা আছে, মানুষের জীবন তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’ এই কথাগুলো শুনে হঠাৎ আমি থেমে গিয়েছিলাম। এত চমৎকার করে যিনি আমাদের মাঝে সেদিন কথাগুলো বলছিলেন, তিনি আর কেউ নন, আমাদের অতি প্রিয় শ্রদ্ধেয় এস এম আই (সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম) স্যার। স্যার সেদিন ছিলেন ব্যথিত। কারণ তার আগের রাতেই তাঁর এক প্রিয় ছাত্রী আত্মহত্যা করেছিল। আমার মন সঙ্গে সঙ্গেই ভালো হয়ে গেল। শুধু এ কথাগুলোই আমার জন্য বা আমাদের জন্য কতটা দরকার ছিল সেটি আমরা দ্রুতই বুঝতে পারলাম।  শুধু আমি একাই নয়, একজন শিক্ষক তাঁর সব শিক্ষার্থীর প্রতিই এমন মমতাময় ছিলেন। স্যারকে আমরা খুব ভোরে বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে হেঁটে আসতে দেখতাম। স্যার সব সময় থেমে যেতেন তাদের জন্য, যাদের জীবনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য একটুখানি  অনুপ্রেরণা প্রয়োজন ছিল। ইংরেজি সাহিত্য আমরা ভালোবেসেছিলামই তাঁর জন্য। তিনি যখন পড়াতেন, সনেট কিংবা  ওরিয়েন্টালিজম অথবা রোমান্টিসিজম কিংবা কাঠখোট্টা পোস্টমডার্নিজম— মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতাম আমরা। আমাদের মধ্যে কিছু সময়ের জন্য সব হতাশা, ক্লান্তি দূর হয়ে যেত। কিছু সময়ের মধ্যেই আমাদের স্বপ্ন দেখানোর কঠিন কাজটি খুব সহজেই করতেন আমাদের প্রিয় এস এম আই স্যার। আজ স্যারের জন্মবার্ষিকী। ১৯৫১ সালের এই দিনে সিলেট জেলায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। সাহিত্যের সব শাখায় তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এরই মধ্যে  তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারে (১৯৯৬ সাল) ভূষিত হয়েছেন। ২০০৫ সালে তিনি অর্জন করেছেন তাঁর ‘প্রেম ও প্রার্থনার গল্প’ বইয়ের জন্য প্রথম আলোর বর্ষসেরা পুরস্কার। শুধু সাহিত্যিক ও শিক্ষকই তিনি নন, তাঁর আরো অনেক পরিচয়ের মধ্যে রয়েছে সাহিত্য সমালোচক, চিত্র সমালোচক। চিত্রকলা, নন্দনতত্ত্ব—এ বিষয়ের ওপর তাঁর অগাধ জ্ঞান আমাদের সব সময় মুগ্ধ করেছে।

স্যারের সাহিত্যজ্ঞান সম্পর্কে হয়তো সবাই জানেন, কিন্তু তিনি একজন  শিক্ষক ও মানুষ হিসেবে কতটা চমৎকার সেটি হয়তো অনেকেই জানেন না। শুধু পাঠদানের সময়ই নয়, তাঁর বিনয় দেখে সব সময় আমরা মুগ্ধ হয়েছি। একজন মানুষ কতটা জ্ঞানী সেটি তাঁর বিনয় দেখে উপলব্ধি করা যায়—কথাটি নিশ্চয়ই স্যারের জন্য শতভাগ খাঁটি। আমরা প্রায়ই ভাবি, কতটা বিনয়ী ও  নিরহংকার হতে পারেন একজন অসম্ভব জ্ঞানী মানুষ। আমি ছাত্রজীবনে স্যারের কাছ থেকে সব সময়ই শিখতে চেষ্টা করেছি কিভাবে জীবনে বিনয়ী হওয়া যায়। তিনি আমাদের শুধু পড়াতেনই না, আমরা জীবনের যেকোনো দুঃসময়ে নিশ্চিতভাবে জানতাম, স্যারের সদুপদেশ পাবই। ইংরেজির অধ্যাপক হওয়া সত্ত্বেও বাংলা ভাষায় তাঁর দক্ষতা বরাবর আমাদের মুগ্ধ করত। সুররিয়ালিজমের চমৎকার ভাববোধটি তাঁর বেশির ভাগ লেখনীতে স্পষ্ট। স্যারের সাহিত্যজ্ঞান বিচার করার দুঃসাহস আমার নেই, কিন্তু শিক্ষক হিসেবে তিনি কতটা চমৎকার আমি শুধু সেটিই বলতে চাই।

সত্যি কথা বলতে, শিক্ষার্থীরা শুধু একটুখানি সদুপদেশের জন্যই জীবনে অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিতে পারে। আমার নিজেকে ভাগ্যবান মনে হয়, আমরা স্যারের ছাত্র ছিলাম। তাঁর খুব কাছ থেকে কত কিছু আমরা শিখেছি! স্যার হয়তো জানেনই না, কত হতাশ মানুষকে তিনি স্বপ্ন দেখাতেন। নিজেকে যখন ক্ষুদ্র মনে হয়, তখন তাঁর দেখানো স্বপ্নগুলো কতটা বিশাল আকার ধারণ করে, আমাদের প্রত্যহ জীবনে।

আজকে আমার এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে ওঠার পেছনেও স্যারের অনুপ্রেরণা। শুধু আমিই নই, আমার মতো অজস্র  শিক্ষার্থীই স্যারের কাছ থেকে স্বপ্ন দেখতে ও স্বপ্নকে ধারণ করতে চেষ্টা করতে শিখেছিলাম। কখনোই আমরা থেমে যেতাম না, কারণ আমাদের ক্ষুদ্র জীবনে আমরা এস এম আই স্যারকে পেয়েছিলাম। আমার ইচ্ছা করত, আমি তাঁর মতো শিক্ষক হব। আমি জানি, আমি একা নই, আরো অনেকেই রয়েছে আমার দলে। স্যারকে জন্মদিনের অজস্র শুভ কামনা। ভালোবাসা ফেরত দিতে হয়। তিনি তাঁর মমতা দিয়ে আমার মতো অসংখ্য শিক্ষার্থীকে বাঁচতে শিখিয়েছিলেন, আজ এই লেখাটি জন্মদিনে স্যারের জন্য তাঁর সব শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে  সামান্য শ্রদ্ধাঞ্জলি। ভালো থাকুন, দীর্ঘজীবী হোন, আমাদের সবার খুব কাছের এস এম আই স্যার—আমরা এই প্রার্থনা করি। জীবনকে অর্থপূর্ণ করার জন্য আমাদের প্রেষণা প্রয়োজন। স্যার এই কঠিন কাজটি কতটা সহজেই করতে পারতেন! আমরা চাই তিনি বেঁচে থাকুন আমাদের সবার মাঝে। তাঁর দেখানো স্বপ্ন জয় করুক আমাদের জীবনকে।

শুভ জন্মদিন, স্যার।

 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য