kalerkantho


ইসরায়েল বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি হয়ে উঠছে

এ কে এম আতিকুর রহমান

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ইসরায়েল বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি হয়ে উঠছে

জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে ফিলিস্তিনের উন্নয়ন সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিটির জরুরি বৈঠক হয়ে গেল। বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) নতুন রাষ্ট্র গঠনে সহায়তার জন্য ফিলিস্তিনকে পাঁচ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলারের একটি তহবিল গঠনের ঘোষণা দেয়। এ ছাড়া বৈঠকে ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান ফেদেরিকা মঘেরিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ফিলিস্তিনসংক্রান্ত সব আলোচনায় অবশ্যই সব পক্ষ ও সহযোগীর অংশগ্রহণ থাকার কথা উল্লেখ করেন। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে কিছু করতে যাওয়ার অর্থ মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি আলোচনা রুদ্ধ হয়ে যাওয়া। বৈঠকের পর মঘেরিনি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন যে তহবিলটি গঠনের লক্ষ্য পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের উপস্থিতি সুসংহত করা এবং একটি গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করা। গত ডিসেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণার পর এই প্রথম এ ধরনের কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো।

ইহুদিদের জন্য একটি রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। ভালো কথা। কিন্তু সেই রাষ্ট্র গঠনের কারণে অন্য কোনো জাতির অধিকার খর্ব হবে—এটি কারো কাম্য হতে পারে না। ইহুদিদের জন্য যদি একটি রাষ্ট্র হতে পারে, তবে ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে এত টালবাহানা আর প্রতিবন্ধকতা কেন নিশ্চয়ই তা বুঝতে কারো কষ্ট হওয়ার কথা নয়। আর জেরুজালেমকে নিয়ে যে টানাটানি চলছে তার শেষ কবে আর কিভাবে হবে তা-ও কেউ জানে না। তবে ফিলিস্তিনিদের তাদের নিজস্ব ভূমি থেকে উৎখাত করার জন্যই কি যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট ইসরায়েল এসব করে যাচ্ছে? অবস্থাদৃষ্টে তো তাই মনে হয়। 

তেল আবিবকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল নামক রাষ্ট্রটি বাস্তবতা পেল। হঠাৎ এমন কী ঘটে গেল যে জেরুজালেমকে রাজধানী করতে হবে? তা-ও আবার সম্পূর্ণ জেরুজালেমে, পূর্ব ও পশ্চিম মিলিয়ে। এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েল মিলে আবার কী মতলব এঁটেছে কে জানে? তবে, এই পদক্ষেপ ওই অঞ্চলে শান্তি স্থাপন করা তো দূরের কথা, অশান্তিই ছড়িয়ে দেবে। আর সেই অশান্তির লেলিহান শিখা শুধু ফিলিস্তিনকে বা আরব অঞ্চলকেই জ্বালিয়ে দেবে না, সমগ্র বিশ্বে এর প্রভাব পড়বে।

আমরা জানি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ অবধি প্রায় ৪০০ বছর জেরুজালেম ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের একটি অংশ। এরপর এটি চলে যায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে। অতঃপর ১৯২৩ সালে ‘ম্যান্ডেট অব প্যালেস্টাইন’-এর নিয়ন্ত্রণে। ফিলিস্তিনে বসবাসরত আরব ও ইহুদিদের মধ্যে বিবাদ শুরু হলে যুক্তরাজ্য জাতিসংঘের সহযোগিতা চায়। সে পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘পার্টিশন প্ল্যান ফর প্যালেস্টাইন’ রেজল্যুশনটি গৃহীত হয়। তবে জেরুজালেম শহরকে একটি ভিন্ন সত্তা হিসেবে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে রাখে। তখন ইসরায়েল মেনে নিলেও ফিলিস্তিন ও আরব দেশগুলো ওই পরিকল্পনা মেনে নেয়নি।

১৯৪৮ সালের মে মাসে ফিলিস্তিনের ইহুদিরা ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। আমেরিকা আনুষ্ঠানিকভাবে ৩১ জানুয়ারি ১৯৪৯ ইসরায়েলকে স্বীকৃতি প্রদান করে। আমেরিকার স্বীকৃতির পরপরই মে মাসে দেশটি জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। অনেক দেশ ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও জেরুজালেমের ওপর ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের দাবিকে স্বীকৃতি দেয়নি। এদিকে ১৯৫০ সালে পূর্ব জেরুজালেম জর্দানের দখলে চলে যায়। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে জর্দান থেকে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর দুই অংশকে একীভূত করে ইসরায়েলের শাসন জারি করা হয়। অসলো চুক্তি স্বাক্ষর সত্ত্বেও ইসরায়েল সরকার সব সময়ই জেরুজালেমকে একমাত্র ইহুদিদের রাজধানী হিসেবে দাবি করে আসছে।

এদিকে ফিলিস্তিনিরা সব সময়ই পূর্ব জেরুজালেমকে তাদের রাজধানী হিসেবে দাবি করে আসছে। ২০০২ সালে ইয়াসির আরাফাত পিএলও চেয়ারম্যান থাকাকালে ২০০০ সালে জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী হিসেবে প্রণীত আইনটি অনুস্বাক্ষরিত হয়। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন জেরুজালেমের ব্যাপারে জাতিসংঘ গৃহীত প্রস্তাবকেই সমর্থন করে। তাদের মতে, জেরুজালেম ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন উভয়ের রাজধানী হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। পৃথিবীর অনেক দেশই বাংলাদেশের মতো পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। 

৬ এপ্রিল ২০১৭ তারিখে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের গৃহীত এসংক্রান্ত নীতির প্রতি তাদের অঙ্গীকার আবার ব্যক্ত করে পূর্ব জেরুজালেমকে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনের রাজধানী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। রাশিয়া পশ্চিম জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবেও গণ্য করে। উল্লেখ্য, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি নিশ্চিত করে ২০১১ সালের জানুয়ারিতে এক বক্তব্যে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পেতে ফিলিস্তিনিদের অবিভেদ্য অধিকারকে রাশিয়া আগের মতো ভবিষ্যতেও সমর্থন করে যাবে বলে উল্লেখ করেন।

যুক্তরাষ্ট্র ৬ ডিসেম্বর ২০১৭ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষণার আগে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে কখনো স্বীকৃতি দেয়নি। বরং ১৯৪৯ সালে ইসরায়েলের এ ধরনের ঘোষণার এবং ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর পূর্ব জেরুজালেমকে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতা করেছিল। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসটিও রয়েছে তেল আবিবে এবং জেরুজালেমে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেট ইসরায়েল সরকারের সঙ্গে নয়, বরং ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে থাকে। ইসরায়েলে বিদেশি কোনো দূতাবাসই জেরুজালেমে অবস্থিত নয়।       

জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানসংক্রান্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত পৃথিবীর প্রায় সব দেশের নেতারাই প্রত্যাখ্যান করেছেন। গত বছরের ৭ ডিসেম্বর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের প্রতি ১৫ সদস্যের মধ্যে ১৪ সদস্যই নিন্দা প্রকাশ করে। ট্রাম্পের ওই সিদ্ধান্তকে নিরাপত্তা পরিষদ জাতিসংঘের রেজল্যুশনের এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রকে সরে আসার জন্য আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ একটি প্রস্তাবও পাস করে। তবে সাতটি দেশ ওই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভয়ে। কারণ ওই ভোটাভুটির আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ভোট দিলে তাদের দেওয়া আমেরিকার অর্থনৈতিক সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।

ট্রাম্পের ওই ঘোষণা শুধু জাতিসংঘের সিদ্ধান্তের পরিপন্থীই নয়, বলতে গেলে সারা বিশ্ব এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এর মধ্যেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অবস্থিত আমেরিকার দূতাবাসগুলোর সামনে বিক্ষোভ, মিছিল আর প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। এদিকে ফিলিস্তিনকে সমর্থন করে মালয়েশিয়া পূর্ব জেরুজালেমে সে দেশের দূতাবাস খোলার ঘোষণা দিয়েছে। অনেক দেশই পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী হিসেবে গণ্য করে থাকে। সে ক্ষেত্রে তারাও যে মালয়েশিয়াকে অনুসরণ করবে না, তা কেউ হলফ করে বলতে পারে না।   

জেরুজালেম নিয়ে ট্রাম্প যা করছেন তা ফিলিস্তিনিদেরসহ মধ্যপ্রাচ্যের সব আরবের জন্য যেন একটি অশান্তির বিষবৃক্ষ রোপণ। ইসরায়েল আর ফিলিস্তিনের মধ্যে শান্তি স্থাপন করার জন্য যখন সমগ্র বিশ্ব দীর্ঘদিন যাবৎ বিরামহীন চেষ্টা করে আসছে, সেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষণা মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো। বলতে গেলে ইসরায়েলের উত্তপ্ত কড়াইয়ে যেন ঘি ঢেলে দিলেন ট্রাম্প। জানি না এ ব্যাপারে আমেরিকার সাধারণ জনগণ ট্রাম্পকে বিন্দুমাত্র সমর্থন করবে কি না। মানবতার প্রতি তাদের সামান্যতম শ্রদ্ধাবোধ থাকলেও ট্রাম্পের এ পদক্ষেপে সমর্থন না করারই কথা। তাদের সমর্থন থাকলে সেটি হবে বিশ্বশান্তি বিনষ্টের অনুপ্রেরণা আর পৃষ্ঠপোষকতা। এককথায় বলতে হয়, ট্রাম্পের এই গোঁয়ার্তুমি শুধু মধ্যপ্রাচ্যেরই নয়, বিশ্বশান্তি বিঘ্নিত করার অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে জেরুজালেম নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গির অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে। তবে ট্রাম্পের ওই ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বনেতারা যে পদক্ষেপ নিচ্ছেন তাতে হয়তো পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে ফিলিস্তিনিদের জন্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের গতিই ত্বরান্বিত হবে। যত তাড়াতাড়ি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিশ্ব বাস্তবতা বুঝতে পারবেন ততই মঙ্গল।   

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব


মন্তব্য