kalerkantho


আগরতলা-চট্টগ্রাম বাস রুটের অর্থনৈতিক গুরুত্ব

মো. রুহুল আমীন

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতাসংগ্রাম ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি হিসেবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিবিজড়িত আগরতলা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী। আগরতলা থেকে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম পর্যন্ত বাস সার্ভিস চালুকরণের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিলোনিয়া স্থলবন্দরে গতিশীলতা আনয়নসহ বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের বিকাশে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার উন্মোচিত হবে।

ত্রিপুরা উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি রাজ্য; উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমে বাংলাদেশ রাষ্ট্র কর্তৃক বেষ্টিত।  ত্রিপুরা আসামের পরই উত্তর-পূর্ব ভারতের দ্বিতীয় জনবহুল রাজ্য। এ বিশাল জনসংখ্যার ভ্রমণপিপাসু পর্যটকরা ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সমুদ্র দর্শনের নিমিত্তে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে আসামের মধ্য দিয়ে ৪৪তম জাতীয় সড়ক ও লুমডিং ও শিলচর পর্যন্ত বিস্মৃত ব্রডগেজ রেলওয়ে লাইন দ্বারা চলাচল করে থাকে। এ ছাড়া আগরতলা বিমানবন্দর থেকে কলকাতা, গুয়াহাটি, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, দিল্লি ও শিলচরের উদ্দেশে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়। সে ক্ষেত্রে এ অঞ্চলের মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা, ভ্রমণপিপাসা নিবারণ ও সমুদ্র দর্শন ব্যাপকভাবে সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুলও বটে। অন্যদিকে ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলা থেকে বাংলাদেশের বিলোনিয়া স্থলবন্দর পর্যন্ত দূরত্ব মাত্র ৯০ কিলোমিটার। পরশুরামের বিলোনিয়া থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব প্রায় (৮৭+৩০)=১১৭ কিলোমিটার। সর্বসাকুল্যে আগরতলা থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব মাত্র (৯০+১১৭)=২০৭ কিলোমিটার, যা বাসযোগে তিন-চার ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছানো সম্ভব। অর্থাৎ অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও পর্যটনের বিকাশ তথা বিশ্বায়নের যুগে ত্রিপুরার আগরতলা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বাস সার্ভিস চালুকরণের মাধ্যমে উভয় দেশের জনগণের লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এই বাস সার্ভিসে বাংলাদেশের লাভের পাল্লাটাই ভারী বেশি। কী কী লাভ বা সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে এ সার্ভিস চালু হলে—ক. বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন তথা এ অঞ্চলের উন্নয়নে ত্রিপুরার আগরতলা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বাস সার্ভিস চালু করলে বাংলাদেশের GDP খাতে বিশাল ভূমিকা রাখবে। উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের সমুদ্রবন্দর থেকে মাত্র ৬৭ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রামের মিরসরাই ও ফেনীর সোনাগাজী অঞ্চলে সাত হাজার ৬১৬ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। এই বিশেষ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, হোটেল, পর্যটনকেন্দ্র, ইকো পার্ক ও সুপ্রশস্ত রাস্তা। মিরসরাই-সোনাগাজী বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের উত্পাদিত পণ্য মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে বিলোনিয়া স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো যেমন ত্রিপুরা, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, মিজোরামসহ আসামের বাজারে পৌঁছতে পারলে বাংলাদেশে GDP নিঃসন্দেহে প্রত্যাশার মাত্রা ছাড়িয়ে ২০৪১ সালের রূপকল্প বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে; খ. ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় ত্রিপুরা, আসাম, মিজোরামসহ অন্যান্য অঞ্চলে ২০০৯ সালে বিলোনিয়া স্থলবন্দর দিয়ে সিমেন্ট, ইট, পাথর ও শুঁটকি রপ্তানির মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বর্তমানে নতুন করে ঢেউটিন, খৈল, স্টিল বার, মশারি ও চুন রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিলোনিয়া স্থল শুল্ক স্টেশন দিয়ে প্রায় ৫২,১৩,৪৫,৭৫৮.৬৬১ টাকা আয় হয়েছে, যেখানে বিগত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আয়ের পরিমাণ ছিল ৪০,৩৪,১২০৬৮.০০ টাকা। অর্থাৎ ক্রমে এ স্থলবন্দরের ভূমিকা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্ব বহন করছে। অন্যদিকে বিলোনিয়া স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে গবাদি পশু, মাছের পোনা, তাজা ফলমূল, গাছগাছালির বীজ, কয়লা, গম, চুনা, পেঁয়াজ, মরিচ, হলুদ ও আদা আমদানির অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও অদ্যাবধি বাংলাদেশ কোনো ধরনের পণ্য আমদানি করতে পারেনি। মূলত একমুখী রপ্তানি বাণিজ্য দিয়ে চলছে এই স্থলবন্দর; গ. ২০০৯ সালের ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি সম্পর্ক বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বিলোনিয়া স্থলবন্দরের কার্যক্রম শুরু হয়। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, লোকবল, গুদাম ও মালামাল পরিমাপের যন্ত্র সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাণিজ্যিক কার্যক্রম নিয়ে তেমন আগ্রহ সৃষ্টি হয়নি। উভয় দেশের জোরালো ভূমিকার অভাবে বিলোনিয়া মূল বন্দর দিয়ে শুধু রপ্তানি কার্যক্রম চলছে। ব্যাপক পণ্য আমদানির সুযোগ ও চাহিদা থাকলেও বিভিন্ন সমস্যার কারণে ভারত থেকে কোনো ধরনের পণ্য আমদানি করা যাচ্ছে না। বন্দর চালু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৮০-৯০ লাখ টাকার মতো ভ্রমণ কর আদায় হয়েছে। সে ক্ষেত্রে আগরতলা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বাস সার্ভিস চালু করলে এই বিলোনিয়া স্থলবন্দর গতিশীল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরো বেশি ভ্রমণ কর আদায়ের অফুরন্ত সুযোগ রয়েছে এবং ঘ. ত্রিপুরার আগরতলা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাস সার্ভিস নিয়মিত চালু থাকলে বাংলাদেশের পর্যটন বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, ইনানী সি বিচ, সেন্ট মার্টিনস, রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়িসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন পর্যটনশিল্পের বিকাশে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর পর্যটকদের আকর্ষণ করার অফুরন্ত সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। ভারতীয় পর্যটকদের এ দেশে আগমনের ফলে বাংলাদেশের উত্পাদিত বিভিন্ন পণ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ বৃদ্ধি পাবে, যা পণ্যের ব্র্যান্ডিং হিসেবে কাজ করবে এবং পরে ভারতীয় পর্যটকদের এ দেশের পণ্যের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করবে।

সর্বোপরি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের চৌত্তখোলায় স্থাপিত বাংলাদেশের স্মৃতিসৌধ, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য, মেলাঘর, দেরাদুন শরণার্থী শিবিরসহ বঙ্গবন্ধুর বিশেষ স্মৃতিবিজড়িত আগরতলা (যে স্থানের নামে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সৃষ্টি করা হয়েছিল) ভ্রমণের অবাধ সুযোগ সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে ভারত সরকারের এ উদ্যোগ সমর্থন করে বিশেষভাবে উপকৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। যেমন ক. খুব অল্প সময়ে ও অল্প খরচে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত ভ্রমণের সুযোগ; খ. খুব অল্প খরচে বাংলাদেশে উত্পাদিত আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন পণ্য আমদানির সুযোগ; গ. ত্রিপুরা রাজ্যের বাসিন্দারা যে পণ্য ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহরগুলো থেকে এনে থাকে অধিক খরচ ও সময় ব্যয় করে, সেখানে খুব অল্প খরচে বাংলাদেশ থেকে এসব পণ্য আমদানি করতে পারবে।

ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বাসিন্দাদের ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিভিন্ন পণ্যের ব্যবহার ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। অধিকন্তু ভারত সরকার তাদের বিদেশ থেকে আমদানীকৃত পণ্য কলকাতার হলদিয়া বন্দরের মাধ্যমে আমদানি কার্যক্রম সম্পন্ন করে থাকে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিলোনিয়া স্থলবন্দর ব্যবহার করে ৬৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের সুযোগ পেলে উভয় দেশ বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হবে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

উভয় দেশের সরকারের উচিত উভয় দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে ও পর্যটনের বিকাশের নিমিত্তে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলা থেকে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাস সার্ভিস চালু করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

লেখক : সিনিয়র সহকারী সচিব

(বর্তমানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা)


মন্তব্য