kalerkantho


মশার উপদ্রব থেকে রক্ষা করুন

ড. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন খান

১৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



মশার উপদ্রব থেকে রক্ষা করুন

এখন বসন্ত। এরপর গ্রীষ্ম, তারপর বর্ষা। আর এ সময়গুলো ভালো সংবাদের পাশাপাশি নিয়ে আসে কিছু আতঙ্কের খবর। চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু হচ্ছে এই আতঙ্কের নাম। একটু গরম পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মশায় ভরে গেছে রাজধানী ঢাকাসহ গোটা বাংলাদেশ। এত দিন আমরা জেনে এসেছি মশার কামড়ে ফাইলেরিয়া, ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু জাতীয় রোগ হয়। ইদানীং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকুনগুনিয়া। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ডেঙ্গু প্রায় মহামারি আকার ধারণ করেছে রাজধানী ঢাকা শহরে। এর সঙ্গে ২০১৭ সালে যুক্ত হয়েছে চিকুনগুনিয়া। একটি বেসরকারি সংস্থার হিসাব মতে, সারা দেশে ১২ লক্ষাধিক মানুষ চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু নির্মূলের এখনই উপযুক্ত সময়। কালক্ষেপণ না করে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। এ প্রসঙ্গে সাম্প্রতিককালের আমাদের একটি গবেষণার আংশিক ফলাফল পাঠকদের উদ্দেশে নিবেদন করছি। আমাদের এই গবেষণায় চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তদের জিজ্ঞাসাবাদে আমরা এ রোগের মোট ১৯টি লক্ষণের সন্ধান পেয়েছি। এতে দেখা যাচ্ছে যে ১৯টির মধ্যে ছয়টি লক্ষণ সবার মধ্যেই ছিল (১০০.০)। এগুলো হচ্ছে যথাক্রমে ১০৩হ্ন-১০৫হ্ন জ্বর, হাত-পাসহ গোটা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা, হাত-পা ফোলা, গিরায় গিরায় ব্যথা, খাবারে অরুচি ও ভয়ানক ক্লান্তি। বাকিগুলো কারো হয়েছে, কারো হয়নি। প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে যে রোগীদের রোগের লক্ষণগুলোর বিভিন্নতা রয়েছে। মাত্র ছয়টি লক্ষণ সবার মধ্যে ছিল (কমন লক্ষণ)। বাকি লক্ষণগুলো কারো মধ্যে ছিল, কারো মধ্যে ছিল না।

রোগের ওপরে বর্ণিত লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্য থেকে সহজেই বোধগম্য যে রোগটি অনেকটা প্রাণঘাতী না হলেও যন্ত্রণায় শীর্ষে, নিঃসন্দেহে। ভোগান্তির চিত্র আরো স্পষ্ট হবে রোগের স্থায়িত্ব বিশ্লেষণে। স্থায়িত্ব বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে যে ৩০.০ শতাংশ রোগী এক থেকে দুই মাস পর্যন্ত শয্যাশায়ী ছিল, ৬০.০ শতাংশ এক সপ্তাহ থেকে এক মাস পর্যন্ত। বর্তমানে ১৫.০ শতাংশ সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছে আর ৮৫.০ শতাংশ আংশিকভাবে সুস্থ আছে, অর্থাৎ তাদের কোনো না কোনো সমস্যা আছে। যেমন ৮৫.০ শতাংশ বলেছে শারীরিকভাবে দুর্বলতার কথা, ৫০.০ শতাংশ চলাফেরা করলেও হাত-পা ফোলা ও ব্যথার কথা বলেছে এবং ১৫.০ শতাংশ বলেছে হাত-পা ফোলে এবং হাত-পা ও কোমরে ব্যথা হয়।

চিকিৎসকরা বলছেন, এ রোগের তেমন কোনো চিকিৎসা নেই। জ্বর নামানোর জন্য প্যারাসিটামলজাতীয় স্বল্প মাত্রার ওষুধ খেলেই চলবে। যাদের অন্যান্য সমস্যা রয়েছে তাদের ডাক্তারি পরামর্শ মোতাবেক ওষুধ সেবন ও ফিজিওথেরাপি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে চিকিৎসকদের মধ্যেও এর চিকিৎসা নিয়ে মতভেদ আছে। কেউ কেউ ওষুধ সেবন করতে একেবারেই নিষেধ করেন এবং কেউ কেউ খেতে বলেন যন্ত্রণা উপশমের জন্য। শারীরিক ক্ষতি ছাড়াও তার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। দেখা যাচ্ছে যে অর্ধেকের মতো রোগী একাধিক ডাক্তারের পরামর্শে ওষুধ সেবন করেছে; কিন্তু কোনো উপকার হয়নি। অনেকের ক্ষতি হয়েছে। ৪০ শতাংশ বলেছে যে তাদের স্বাস্থ্যহানি ঘটেছে এবং মানসিকভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব।

আমাদের দেশ ঘনবসতির দেশ। আর চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু হচ্ছে ভাইরাসবাহী রোগ। এডিস মশা এই ভাইরাস বহন করে একজন থেকে আরেকজনকে কামড়িয়ে এই রোগ ছড়িয়ে দেয় সর্বত্র। কাজেই প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে না তুললে এ রোগ দুটি এখানে মহামারি আকার ধারণ করতে পারে অতি সহজেই। আর এ রোগ দুটি নির্মূল করতে হলে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। ১. যেহেতু আপাতত ঢাকা শহর থেকেই রোগটি ছড়াচ্ছে, সেহেতু ঢাকার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশন উভয়কেই দায়িত্ব নিতে হবে সমঝোতার ভিত্তিতে। এটা নৈতিকতার প্রশ্ন। চিকিৎসকরাও দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। তাঁরাই সিটি করপোরেশনকে সুপরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতে পারেন। পাড়ায়, মহল্লায় ও ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে প্রতিনিয়ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে। ২. সরকার একটি আইনগত ভিত্তি দিয়ে পৃথক একটি কর্তৃপক্ষ বা টাস্কফোর্স গঠন করতে পারে, যাদের জন্য পৃথক বরাদ্দ দিতে হবে। জনস্বাস্থ্য বলে কথা। বিপুলসংখ্যক মানুষ স্বাস্থ্যহানির ঝুঁকিতে, মানসিক ক্ষতির শিকার, লাখ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট ইত্যাদি বিষয় গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। ৩. সর্বব্যাপী প্রচার চালাতে হবে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়। যেকোনো মশাবাহিত রোগের বিরুদ্ধে মানুষকে সতর্ক করতে এটা হবে গুরুত্বপূর্ণ উপায়। ৪. ইদানীং ছাদে বাগান করা উৎসাহিত করা হচ্ছে। মশাবাহিত রোগের কারণ হয়ে উঠতে পারে এই ছাদের বাগান। এ ব্যাপারে মানুষকে ভালোভাবে সতর্ক করতে হবে, যাতে ছাদে কোথাও পরিষ্কার পানি জমে না থাকে।

ভগ্ন স্বাস্থ্যের জাতির উন্নতি বা অগ্রযাত্রা ব্যাহত হতে বাধ্য। আমাদের দেশ বেশ জনবহুল দেশ। ঢাকা শহরে প্রায় দেড় কোটি মানুষের বাস। আরো এক কোটি মানুষ সারা দেশ থেকে প্রতিদিন ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা কাজে ঢাকায় আসে-যায়। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে রাষ্ট্র তথা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে ভাবতেই হবে। এটা তাদের নৈতিক দায়িত্ব। অবহেলার সুযোগ নেই। অতএব, মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সব প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ অতি উত্তম। স্বাস্থ্যবান জাতির জন্য চাই সুস্বাস্থ্যের অধিকারী মানুষ।

লেখক : অধ্যাপক, সাবেক সভাপতি, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য