kalerkantho


পবিত্র কোরআনের আলো । ধারাবাহিক

প্রাণ বাঁচাতে নিষিদ্ধ কাজ করার বৈধতা ও অবৈধতা

১৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



প্রাণ বাঁচাতে নিষিদ্ধ কাজ করার বৈধতা ও অবৈধতা

১০৬. কেউ ঈমান আনার পর আল্লাহকে অস্বীকার করলে এবং কুফরির জন্য হৃদয় উন্মুক্ত রাখলে তার ওপর আল্লাহর আজাব পতিত হবে। আর তার জন্য রয়েছে মহাশাস্তি। তবে ওই ব্যক্তির জন্য নয়, যাকে কুফরি করতে বাধ্য করা হয়েছে; কিন্তু তার অন্তর ঈমানে অবিচল। [সুরা : নাহল, আয়াত : ১০৬ (ষষ্ঠ পর্ব)]

তাফসির : জোরজবরদস্তির মুখে প্রাণভয়ে ঈমানবিরোধী কথা বলার বিধান সম্পর্কে আলোচ্য আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। জোরজবরদস্তি বোঝাতে এ আয়াতে ‘আল ইকরাহ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। পরিভাষায় ‘আল ইকরাহ’ হলো, জোরপূর্বক কারো ওপর এমন কিছু চাপিয়ে দেওয়া, যা পালনে সে রাজি নয়। জোরজবরদস্তি তিন ধরনের। এক. প্রাণনাশ বা অঙ্গহানির হুমকি দিয়ে কাউকে কোনো কিছু করতে বাধ্য করা। এটা চূড়ান্ত জবরদস্তি। দুই. প্রাণনাশ বা অঙ্গহানির হুমকি না দিয়ে শুধু বন্দি রাখা, জেলে দেওয়া বা প্রহার করার হুমকি দিয়ে কাউকে কোনো কাজ করতে বাধ্য করা। তিন. ব্যক্তির ক্ষতি না করে নিকটাত্মীয়কে বন্দি বা গুম করার হুমকি দিয়ে কাউকে কোনো কাজে বাধ্য করা। (কাশফুল আসরার : ৪/৩৮৩; আল ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু : ৬/৪৪৩৩)

আলোচ্য আয়াতে চূড়ান্ত পর্যায়ের জুলুম ও জবরদস্তির সামনে অন্তরে ঈমান থাকার শর্তে মুখে ঈমানবিরোধী কথা প্রকাশের অবকাশ রাখা হয়েছে। ইমাম কুরতুবি (রহ.) লিখেছেন, ইসলামের সব ব্যাখ্যাদাতা এ বিধানে ঐকমত্য রয়েছেন যে প্রাণনাশের ভয়ে যে ব্যক্তি কুফরিমূলক বাক্য উচ্চারণে বাধ্য হয়েছে, সে গুনাহগার হবে না, যদি তার অন্তর ঈমানে অবিচল থাকে। তার স্ত্রীও তালাক হবে না। কুফরের বিধান তার জন্য প্রযোজ্য নয়। কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ের জুলুম ও জবরদস্তির সম্মুখীন হলেও কাউকে হত্যা করা যাবে না। অর্থাৎ কেউ যদি কাউকে হত্যার ভয় দেখিয়ে অন্য কাউকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়, সে ক্ষেত্রে কোনো অবস্থায়ই হুমকিদাতার হুকুম তামিল করা যাবে না। বরং প্রয়োজনে নিজের জীবন দিয়ে হলেও অন্যের জীবন বাঁচাবে। (আল জামে লি আহকামিল কোরআন : ১০/১৬৬)

এ আয়াত সামনে রেখে তাফসিরবিদরা জবরদস্তিমূলক বিভিন্ন কাজের বিধান বর্ণনা করেছেন। আল্লামা ওহবা জুহাইলি (রহ.) লিখেছেন, ধর্ষিত নারীর ওপর ব্যভিচারের শাস্তি প্রযোজ্য নয়। কেননা এ কাজে তাকে জোরপূর্বক বাধ্য করা হয়েছে। এতে সে সম্পূর্ণ নির্দোষ। এ বিধানের ব্যাপারে সব আলেম একমত। (আততাফসিরুল মুনির : ১৪/৫৬৯)

এ বিষয়ে কোরআনের বক্তব্য রয়েছে অন্য আয়াতে। ইরশাদ হয়েছে, ‘...তোমাদের দাসীরা সতীত্ব রক্ষা করতে চাইলে পার্থিব জীবনের ধন-লালসায় তাদের ব্যভিচারিণী হতে বাধ্য কোরো না...।’ (সুরা : নূর, আয়াত : ৩৩)

এ প্রসঙ্গে ইমাম তিরমিজি (রহ.) একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন। মহানবী (সা.)-এর যুগে এক নারী ধর্ষিত হয়। মহানবী (সা.) তার ওপর শাস্তি প্রয়োগ করেননি; কিন্তু তিনি ধর্ষণকারীর ওপর ‘হদ’ (ব্যভিচারের দণ্ড) জারি করেন। (তিরমিজি শরিফ, কিতাবুল হুদুদ)

ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি (রহ.) লিখেছেন, জবরদস্তির তিনটি স্তর আছে। এক. জুলুম ও জবরদস্তির সম্মুখীন হলে কাজটি করা ওয়াজিব বা অত্যাবশ্যকীয়। যেমন—প্রাণ বাঁচাতে মদ পান, শূকরের গোশত ইত্যাদি খেতে বাধ্য হলে কিংবা মৃত জন্তু খেতে বাধ্য হলে তা খাওয়া ওয়াজিব। দুই. কাজটি করা বৈধ, তবে ওয়াজিব বা অত্যাবশ্যকীয় নয়। যেমন—প্রাণ বাঁচাতে ঈমানবিরোধী বাক্য উচ্চারণ। তিন. শত হুমকি ও নির্যাতন সত্ত্বেও কাজটি করা হারাম। যেমন—কোনো মানুষকে হত্যা বা অঙ্গহানি করা। (আততাফসিরুল কাবির : ২০/১২২)

গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ


মন্তব্য