kalerkantho


ব্ল্যাক বক্সই বলে দেবে দুর্ঘটনার কারণ

আলমগীর সাত্তার

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ব্ল্যাক বক্সই বলে দেবে দুর্ঘটনার কারণ

নেপালে ইউএস-বাংলার বিমান দুর্ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার পর অনেক কথাই শুনতে পাচ্ছি চারপাশে এবং টেলিভিশনে। কিন্তু আমার পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, এসব কথার বেশির ভাগই অনুমাননির্ভর; টেলিভিশনে ঘটনার ছবি ও খবর প্রচার করা হচ্ছে, অনেকের মতামতও দেখতে পেলাম, মানুষ অনেক কিছু জানতে পারছে—এসব কথা ও বিবেচনা অনুমানের ওপর বলা হচ্ছে। যাঁরা এসব বলছেন, ভেতরের খবর ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে অনেকেরই সুস্পষ্ট কোনো ধারণা নেই। তবে তাঁদের কথা শুনে মনে হচ্ছে তাঁরা অনেক জানেন। প্রকৃত খবর বা তথ্য জানতে হলে আমাদের আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। এসব অনুমানভিত্তিক কথা শুনে কিছু বলা ঠিক হবে না কিংবা কিছু বলা অত্যন্ত কঠিন কাজ।

বাংলাদেশের এয়ারলাইনস তো ১৯৬০ সাল থেকে বিমান উড়িয়ে আসছে। আমি ১৯৬৮ সাল থেকে বিমানে কাজ করেছি, ফকার প্লেনে। অনেক রকম কাজ করেছি, গোয়িং ফ্লাই করেছি ৭২৭। তারপর আমি ভিজিটিং ফ্লাই করেছি। তখন তো রানওয়ে ছোট ছিল। এ বিষয়ে অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। অ্যাকসিডেন্ট খুব একটা হয়নি। তখন তো সুযোগ-সুবিধা অনেক কম ছিল এবং সেই সময়ও দুর্ঘটনা তেমন ঘটেনি। কেন ঘটেনি? এখন অনেক কিছুর উন্নতি হয়েছে। সুবিধা বেড়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনা এড়ানো যাচ্ছে না। এটা কাঙ্ক্ষিত নয়। যা হোক, এখন তো দুর্ঘটনার ব্ল্যাক বক্স ও ভয়েস বক্স পাওয়া গেছে। এসব পেলেই তো হবে না, এটাকে পরীক্ষা করার জন্য সঠিক জায়গায় নিতে হবে।

কী কারণে এটা ঘটল, ইউএস-বাংলা যেটা দাবি করছে, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার তাদের ভুল তথ্য দিয়েছে; কিন্তু তারা আবার সেটা সাপোর্ট করছে না। তারা বলছে, এটা পাইলট এরর, কিংবা বিমানেরও ত্রুটি থাকতে পারে। ওখানে রানওয়ে যেটা আছে—টু জিরো। টু জিরোতে বিমান সরাসরি ল্যান্ড করে। আর ওই দিকে হচ্ছে টু জিরো জিরো। টু জিরো জিরোর চারপাশে কিন্তু পাহাড়। অনেক উঁচু পাহাড়। সাড়ে আট হাজার, ৯ হাজার ফিট উঁচু পাহাড়। সেখান থেকে ফল করলে আমাদের যে পাইলট, সে যদি জিরো টু বা টু জিরো নিয়ে ভুল করে তাহলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ওখানে ল্যান্ড করতে গেলে খুব স্ট্রিট টার্ন করতে হয়। সেটা একটি সমস্যা। এখন জানতে হবে, সেটা কিভাবে হয়েছে। বিষয়গুলো অস্পষ্ট থাকার ফলে এখন পরস্পর পরস্পরকে দোষারোপ করছে। দোষারোপ করে তো লাভ নেই। এখন কাজ হচ্ছে মূল ঘটনাটা উদ্ঘাটন করা। সেটা করতে হলে ব্ল্যাক বক্স ও ভয়েস বক্স চেক করে ক্লু বের করতে হবে। ভয়েস বক্স পাওয়া গেছে। এটার কাজ হচ্ছে সব ইনফরমেশন কন্টিনিউ রেকর্ড হতে থাকে, কিন্তু ১৫ মিনিট পর আগের সব কিছু মুছে যায়। অর্থাৎ দুর্ঘটনা ঘটার ১৫ মিনিট আগের সব রেকর্ড ওখানে আছে। কী ঘটেছিল তা পরীক্ষা করলেই বেরিয়ে আসবে। এখান থেকে প্রকৃত তথ্য বের হলেই শুধু আসল ঘটনা বলা সম্ভব হবে।

বিমান সম্পর্কে অনেকের নানা কথা ও বিতর্ক আছে। কিন্তু এই বিমানটি যথেষ্ট ভালো। এটা লো কস্টের কারণে বেশ জনপ্রিয়। আর আমাদের ডমেস্টিকের জন্য খুব ভালো প্লেন। অনেকে বিমান পরিচালনায় এটাকে অগ্রাধিকার দেন। জ্বালানি কম পোড়ে এবং এটা সুলভ। ফলে ডিমান্ডও বেশ ভালো। কানাডিয়ান কম্পানি এবং সার্ভিসও ভালো। যাঁরা বেশি কথা বলছেন, তাঁরা প্লেন সম্পর্কে বেশি জানেন না।

দুর্ঘটনার পর ভয়েস বক্স তো তারা হস্তান্তর করেছে, সেটা টেলিভিশনে দেখানোও হলো। দুটির সমন্বয় করতে হবে। কিন্তু সেটা পরীক্ষা করার প্রযুক্তি বাংলাদেশের নেই, নেপালেরও নেই। এটা লন্ডনে বা বাইরে কোথাও নিয়ে পরীক্ষা করতে হবে। এটার প্রিভেনশনটা দরকার। সে জন্য সময়ও লাগবে। দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য কী কী করণীয়, সেসব নিয়ে জোরালো চেষ্টা চালাতে হবে। তাহলে সব কিছু উদ্ঘাটন সম্ভব হবে। আর এসব দেখভালের দায়িত্ব সিভিল এভিয়েশনের। সিভিল এভিয়েশনে দক্ষ লোকের অভাব নেই। আমি গতকালও সেখানে কথা বলেছি। বলেছি যে তোমরা যে সকাল ১০টায় শিডিউল ডিপারচার করো, কাছাকাছি সময়ে ৭টা ফ্লাইট ডিপারচার করো—কেমন করে মেইনটেন করো? সিকিউরিটি ইত্যাদি এসব কিভাবে রক্ষা করা সম্ভব হয়? সিভিল এভিয়েশনে অভাব যেটা, মেইনটেন্যান্সের জন্য তারা অনেক সময় কনসেশন করে। কিন্তু আমি যখন ফোন করলাম, তারা বলল, উপায় নাই স্যার। ওপরের কর্তারা যেভাবে বলেন, তারা যদি কোনো সিদ্ধান্ত দেন সেসব আমাদের করতে হয়। এমনকি প্লেনের শিডিউল তারা ঠিক করে দেন, আমাদের সেভাবে না করে উপায় থাকে না। কিন্তু কথা হচ্ছে, ডিপারচারের ডিসিপ্লিন মেইনটেইন করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

এখন দুর্ঘটনা নিয়ে বেশি আলোচনা করা ঠিক হবে না, অনুমানের ওপর ভিত্তি করে। ব্ল্যাক বক্স প্লেনের পেছন দিকে থাকে। প্লেনের অ্যাটিচুড বা প্লেন কী আচরণ করছে, গতি কেমন, প্লেনের ভেতরে কী ঘটছে—এসব পর্যবেক্ষণ করে এই ব্ল্যাক বক্স। এটা পানিতে ডোবে না, আগুনেও পোড়ে না। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এটা কাজে লাগানোর প্রযুক্তি বাংলাদেশের নেই, এমনকি নেপালেরও নেই বলেই আমার ধারণা। প্লেনের প্রযুক্তি ও ডিসিপ্লিন সম্পর্কে অনেকেরই ভালো ধারণা নেই বলে নানা রকম কথা বলতে পারছে।

দুর্ঘটনা ঘটে গেছে, এখন অনেক রকম কথাই শোনা যাবে। কিন্তু আগামী দিনে আবারও এমন দুর্ঘটনা ঘটবে কি না তা আগে থেকেই বলা যায় না। আর আমাদের দেশে কয়টাই বা ফ্লাইট চলে—প্লেনের আবার ক্যাটাগরিও আছে। ক্যাটাগরি ওয়ান, ক্যাটাগরি টু। নিউ ইয়র্কে যে ক্যাটাগরিতে বিমান চলে সেটা হয়তো এক নম্বর, এখানে দ্বিতীয় ক্যাটাগরির বিমান চলে। কারণ আমাদের সার্ভিস ও  মেইনটেন্যান্স ভালো নয়। ফলে আমাদের প্লেনের ক্যাটাগরিকে টুতে রাখা হয়েছে। ক্যাটাগরি ওয়ান দিনে যত খুশি ডিপারচার করতে পারে। আর ইউএস-বাংলা তো বেশ নাম করেছে। তারা এমন একটি দুর্ঘটনা ঘটাল—অনেকে বলছে, তারা ডিপারচারের আগে অন্য আরো কাজ করেছে। কিন্তু সকালে আমি একটা গাড়ি চালালাম, বিকেলে সেই একই গাড়ি সমস্যা করতে পারবে না—এটা আগে থেকে বলা যায় না। বাংলাদেশের পাইলট সিগন্যাল পায়নি বা বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল দাবি করছে। এখন যেহেতু ভয়েস বক্স ও ব্ল্যাক বক্স পাওয়া গেছে, সেসব পরীক্ষা করলে বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা যাবে বলে আমি মনে করি।

নিজের ঘাড়ে দোষ না নেওয়ার জন্য অনেকে অনেক রকম কথা বলছেন। এটা তো বাংলাদেশ বিমান নয়—এটা সিভিল এভিয়েশন কন্ট্রোলিং এজেন্সি। তাদের কাজ হচ্ছে সব প্রাইভেট বিমানকে দেখভাল করা। এয়ারলাইনসের ডিসিপ্লিন, দেখভাল এবং নিরাপত্তার দায়িত্ব সিভিল এভিয়েশনের। তারা কোনো কিছুতেই প্রভাবিত হবে না, কনসেশন দেবে না, কাউকে আলাদা করে বিশেষ সুবিধা দেওয়া ও না দেওয়া—এসব বিষয়ে তাদের নিজস্ব নীতি আছে। সেসবের বাইরে না যাওয়াই কর্তব্য। আমরা মনে করি, সিভিল এভিয়েশনকে প্রভাবমুক্ত থাকতে হবে, যাতে তাদের ওপর থেকে মানুষের আস্থা না হারায়।

এখন এই মুহূর্তে এর বেশি বলা সমীচীন হবে বলে মনে করি না।

 

লেখক : সাবেক বৈমানিক ও লেখক

অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ


মন্তব্য