kalerkantho


ঢাকার প্লেন ল্যান্ডিংয়ের সূত্র নেপালে চলে না

ক্যাপ্টেন সাহাবউদ্দিন আহমেদ বীর-উত্তম

১৫ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ঢাকার প্লেন ল্যান্ডিংয়ের সূত্র নেপালে চলে না

প্রথমেই আমি ব্যক্তিগতভাবে আমার আন্তরিক শোক প্রকাশ করি—নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় নিরীহ মানুষগুলো এমন অসহায়ভাবে মারা গেল। এটি কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। কেউই এমনটি আশা করেনি। এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা। দুর্ঘটনায় নিহতদের আত্মার শান্তি কামনার্থে সারা দেশে আজ রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের মানুষ বিমান দুর্ঘটনার বিষয়টির সঙ্গে বলা যেতে পারে কম পরিচিত। ১৯৮৪ সালে একবার ল্যান্ড করার সময় ঢাকা বিমানবন্দরে দুর্ঘটনা ঘটেছিল এবং তাতে অনেক মানুষ নিহত হয়েছিল। সম্প্রতি নেপালে ইউএস-বাংলার যে বিমানটি দুর্ঘটনায় পতিত হলো, এখানে অনেক মানুষ প্রাণ হারাল। এতে পুরো বাংলাদেশের মানুষ স্তম্ভিত হয়ে গেছে। প্রিয়জন হারানোর পর অনুভূতি প্রকাশেরও ভাষা হারিয়ে ফেলেছে অনেকে। নেপালের এ দুর্ঘটনার সঙ্গে তখনকার দুর্ঘটনার বড় একটা পার্থক্য আছে। নেপালের সঙ্গে অন্য বিমানবন্দরের পার্থক্য হচ্ছে, সেখানে দুটি উঁচু পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বিমানকে ল্যান্ড করতে হয়। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া। আমাদের ঢাকা এয়ারপোর্ট যেমন সমতল ও লম্বা—নেপালের বিমানবন্দর ঠিক তা নয়, বরং উল্টো। আর ঢাকার দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল—বিমান ল্যান্ড করার সময় প্রচণ্ড ঝড়ের কবলে পড়েছিল; এটিকে বলা হয় ঝোড়ো মেঘ, যেটি বিদ্যুৎ তৈরি করে এবং সে সময় ঝড়ের গতি এত বেশি ছিল যে মেঘের ভেতরে ছিল বিধ্বংসী এয়ারক্রাফট, যা জাহাজটিকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিল।

দুর্ঘটনার কথা তো আগে থেকে বলা যায় না। কিন্তু এভিয়েশনে বিমান দুর্ঘটনার কতগুলো কারণ চিহ্নিত করা যায়। প্রথমত আবহাওয়ার প্রতিকূলতা, দ্বিতীয়ত এয়ারক্রাফটের টেকনিক্যাল প্রবলেম এবং তিন নম্বর কারণ পাইলটের সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়া। এই তিনটি কারণে সাধারণত বিমান দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এখন বিশেষ করে সমস্যা যদি টেকনিক্যাল হয় তখন পাইলট দক্ষ হলে—যদি ইঞ্জনে আগুন লাগে, ইঞ্জিন ফল করে বা কেবিনে ফায়ার হয়, তার এক ধরনের প্রস্তুতি থাকে। ফলে এসব তিনি এড়াতে পারেন। এখানে যেটি হয়েছে, ল্যান্ডিংয়ের সময় দুর্ঘনাটি ঘটেছে। কেন পাইলট এটিকে মোকাবেলা করতে পারলেন না, সেটি ব্ল্যাক বক্সের রেকর্ড দেখে বলতে হবে।

কাঠমাণ্ডুর বিমানবন্দর একটু আলাদা। ঢাকার বিমানবন্দর যেমন সমতল এবং সুন্দর, ওখানে তা নয়। নেপালের বিমানবন্দরে যেখান থেকে রানওয়েটি শুরু হয়েছে, দেখা যাচ্ছে মাঝপথে গিয়ে রানওয়েটি আবার ওপরে উঠে গেছে। ফলে ঢাকার প্লেন ল্যান্ডিংয়ের সূত্র নেপালে অ্যাপ্লাই করা সম্ভব হয় না। সেখানে ল্যান্ডিংয়ে আলাদা ধরনের কৌশল ও দক্ষতা লাগে। পাহাড়ের কারণে উচ্চতার জটিলতা আছে। কাজেই এখানে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ল্যান্ড করার সময় চাকা ভেঙে গিয়ে আগুন লাগতে পারে।

নেপালে বলেই নয়, পাহাড়ি এলাকায় প্লেন ল্যান্ড করার এক ধরনের আলাদা টেকনিক ও ঝুঁকি থাকে। এ বিষয়ে পাইলটদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং সতর্ক করা হয়। আমরা যখন বিমানে কাজ করেছি, আমাদের সেসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। সে কারণে এ বিষয়ে কিছুটা ধারণা আমরা আগে থেকেই পেয়েছিলাম বলে মনে হয়। সেখান থেকে বলতে পারি—ল্যান্ড করার সময় প্লেনটি যে দুর্ঘটনার মুখে পড়েছে, সেটি কী কারণে হয়েছে তা তো জানা যাবে ব্ল্যাক বক্সের ডাটা পরীক্ষা করে। সব কিছুই জানা সম্ভব ডাটা রিডিং করলে। কারণ সব ধরনের ইনফরমেশন ডাটায় জমা থাকে। তবে আমরা যখন কাজ করেছি, অত্যন্ত দক্ষ না হলে এমন ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় কোনো পাইলটকে পাঠানো হতো না। এখানে সেই নীতি অবলম্বন করা হয়েছে কি না, তা বলতে পারছি না।

ইউএস-বাংলার টেকনিক্যাল কোনো প্রবলেম ছিল কি না, ইঞ্জিন ফল করেছে কি না, প্লেনের গতি ও অবস্থান কেমন ছিল, প্লেনটি সোজা হয়ে ছিল, নাকি কাত হয়ে গিয়েছিল—এসব জানা যাবে ব্ল্যাক বক্সের ডাটা রিডিংয়ের পর। আবার এটি একটি সমস্যাও। পরীক্ষার জন্য কানাডা বা অন্য কোথাও পাঠানো হবে ব্ল্যাক বক্স। তখন জানা যাবে বিস্তারিত বিবরণটি। সেটির জন্য আমাদের কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।

এখন আমি নিজেও দেখলাম, প্লেনটি দুর্ঘটনায় পড়ার পর পত্রিকা ও টেলিভিশনে নানা রকম কথা বলছেন অনেকে। কিন্তু অনেকেরই এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা আছে বলে আমার মনে হয়নি। একটি প্লেন যখন ফ্লাই করে, সে কোন পথে যাবে, সেই পথে আর কোনো প্লেন আছে কি না, থাকলে সেটার গতি ও অবস্থান কী রকম, কোনো সাংঘর্ষিক আশঙ্কা আছে কি না, তা এভিয়েশন কন্ট্রোলার ঠিক করে দেন। তাঁদের কাছে এসবের রেকর্ড থাকে। পাইলট ও প্যাসেঞ্জারের নিরাপত্তার বিষয়টি পৃথিবীর সব দেশেই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশ তো এর বাইরে যেতে পারে না।

হংকংয়ের রানওয়ের সঙ্গেই পাহাড় ছিল। ফলে একটি বিমানবন্দরের সঙ্গে আরেকটি বিমানবন্দরের কিছু পার্থক্য আছে। তবে নেপালের এয়ারপোর্টটি যেভাবে ক্রিটিক্যাল, তেমনটি খুব কমই আছে। আর অন্য পরিবহন বা এভিয়েশনের থেকে বিমানে কিন্তু বিষয়গুলো সম্পূর্ণ আলাদা। দুর্ঘটনার পর আর্থিক ক্ষতি ও জীবন চলে যাওয়ার মতো বড় বিপর্যয় যা হওয়ার তা তো হয়েছেই। বিমানে কিন্তু এসবের পরিষ্কার ডাটা আছে। দুর্ঘটনার সময় বিমানটি কী অবস্থায় ছিল, এটির গতি ও মেইনটেন্যান্স কেমন ছিল তার রেকর্ড আছে। সেটি পরীক্ষা করলেই জানা যাবে আসলে কী ঘটেছিল। কারণ বিমানটি কোন এলাকা দিয়ে যাবে, কতটা উচ্চতায় সে ফ্লাই করবে এবং প্লেনের গতি কেমন হবে—এসব আগে থেকেই ঠিক করে দেওয়া হয়।

প্লেনের দুর্ঘটনার আরেকটি কারণ হচ্ছে ভাষা সমস্যা, যদিও বাংলাদেশে এ সমস্যা নেই। কারণ এখানে নির্দেশনাগুলো ইংরেজিতে দেওয়া হয় এবং এসব বোঝা একেবারেই জটিল নয়। আবার কন্ট্রোলার যদি ভুল তথ্য দেন অথবা পাইলট যদি নির্দেশনা রিড করতে না পারেন, তিনি পাল্টা প্রশ্ন ও সূত্র অ্যাপ্লাই করতে পারেন। রাশিয়ায় ভাষা সমস্যার কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে, এমনটি দেখা গেছে। নেপালে বিমান ল্যান্ড করার জন্য আগে থেকেই সেখানকার রানওয়ে ও সিগন্যাল পদ্ধতি ভালোমতো জেনে নেওয়াটাও দরকার। কারণ বাড়তি দক্ষতা না থাকলে সেখানে ঠিকমতো অবতরণ করাটা কঠিন হয়। আর একটি ব্যাপার, সিভিল এভিয়েশনের দায়িত্ব হচ্ছে একটি বিমানকে যখন ডিপারচারের অনুমতি দেওয়া হয়, প্লেনটি কোন পথে যাবে, কতটা ওপরে সে অবস্থান করবে, সেই একই সময়ে আর কোনো প্লেন যাচ্ছে কি না, কী গতি ও মেইনটেন্যান্স নিয়ে যাচ্ছে—এসব ইনফরমেশন লিপিবদ্ধ থাকে। ফলে বিমানে এক হিসাবে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা কমই থাকে। কিন্তু যে তিনটি কারণের কথা আমি উল্লেখ করেছি, সেসব ফল করলে দুর্ঘটনা এড়ানো যায় না।

এখন কাজের কথা হচ্ছে, অন্য সেক্টরের পরিবহনের মতো বিমানের নিরাপত্তা ও সতর্কতা এক রকম নয়। সিভিল এভিয়েশন বিমানের যাবতীয় মেইনটেন্যান্স নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা এড়াতে পরামর্শ দেওয়ার অবকাশ কম। ল্যান্ডিংয়ের পদ্ধতিগত তারতম্যের কারণে কিছু সমস্যা তৈরি হয়। যেমন রেঙ্গুনে এক রকম পদ্ধতি আছে ল্যান্ডিংয়ের, হংকংয়ে তা থেকে আরেকটু আলাদা। কিন্তু নেপালের মতো জটিল রানওয়ে ও অবতরণ কৌশল কোথাও দরকার হয় না। পাইলট দক্ষ হলে কিছু সমস্যা নিজেই রিকভার করতে পারেন। বিশ্বের অনেক জায়গায় ভাষার সমস্যার কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে আগের মতো জটিল পরিস্থিতিতে এখন আর কেউ পড়ে না। কারণ সবাই এখন সতর্ক হয়ে গেছে। অনেক সময় এভিয়েশনের কন্ট্রোলাররা নির্দেশনা দিলেও পাইলট বুঝতে পারছেন না বা সেভাবে কাজ হচ্ছে না—এমন অবস্থায় পাইলট নিজের অভিজ্ঞতা ও বিচক্ষণ বুদ্ধি দিয়ে নিরাপদে ল্যান্ড করতে পারেন।

 

লেখক : সাবেক বৈমানিক

অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ


মন্তব্য