kalerkantho


আবদুল মান্নান

সম্প্রীতির বাংলাদেশ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ

১৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



সম্প্রীতির বাংলাদেশ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ

এই প্রজন্মের কোনো মেধাবী তরুণের কাছে মুজিবনগর দিবস সম্পর্কে কিছু জানে কি না জানতে চাইলে আমি নিশ্চিত কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া তাদের বেশির ভাগই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবে। একসময় আমার সুযোগ হয়েছিল পাবলিক সার্ভিস কমিশনে নতুন প্রজন্মের মেধাবীদের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এ মন্তব্য করছি। এ অজ্ঞতার জন্য এককভাবে তাদের দায়ী করলে চলবে না। তাদের দেশ সম্পর্কে এ অজ্ঞতার জন্য আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক পারিপার্শ্বিক অবস্থাও খানিকটা দায়ী। এ কারণেই এখন একজন নতুন প্রজন্মের যুবক টি-শার্টে লেখে ‘আমি রাজাকার’। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখলাম একজন লিখেছে, সে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় এক মেয়ের সঙ্গে প্রেম করতে চায়। কয়েক বছর আগে স্বাধীন বাংলাদেশের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে পাকিস্তান ক্রিকেট টিম বাংলাদেশে খেলতে এসেছিল। এক বাংলাদেশি ললনা গ্যালারিতে বসে ব্যানার মেলে ধরল, যাতে লেখা Marry Me Afridi. আবার এক দল মানুষ আছে, যাদের বেশির ভাগই শিক্ষিত, তারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে বলে ‘গণ্ডগোলের বছর’। সংবাদের সম্পাদক বজলুর রহমান তখনো জীবিত। একুশে টিভিতে তিনি আরেকজন সম্পাদকের (বর্তমানে প্রয়াত) সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথগ্রহণ সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। সেই সম্পাদক খুবই তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, ‘হ্যাঁ সেদিন (১৭ এপ্রিল ১৯৭১ সাল) কিছু লোক মেহেরপুরে একসাথ হয়ে বক্তৃতা দিয়েছিলেন।’ বজলুর রহমান খুব ধীরস্থিরভাবে বললেন, ‘ওই কিছু লোক আমার-আপনার মতো ছিলেন না। তাঁরা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন। তাঁরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে একটি বৈধ সরকার গঠন করেছিলেন। সেই সরকারের অধীনেই আপনার নেতা জিয়াউর রহমান একজন বেতনভুক্ত সৈনিক হিসেবে (প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর  মর্যাদা পাওয়ার জন্য খুবই সামান্য এই বেতন দেওয়া হতো। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু ও পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এক টাকা করে বেতন নিতেন) বেতন নিতেন। আজকের লেখাটি এই সব মানুষের জন্য তা বলব না। অনেকটা নিজের জন্য, কারণ বয়সের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই মানুষ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ভুলে যায়। তবে কোনো কিছু লিখতে হলে পড়তে হয় আর পড়লে স্মৃতিটা একটু রিফ্রেশ হয়। আর লেখাটি পড়ে যে তরুণটি নিজেকে ‘রাজাকার’ বলে ঘোষণা করেছে তার যদি সামান্যতম অনুশোচনা হয়, সেটি হবে আমার জন্য বাড়তি পাওনা।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ভূমিধস বিজয় লাভের পর (৩০০ আসনের মধ্যে ১৬৭টি) এটি প্রত্যাশিত ছিল যে পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধুই ইয়াহিয়া খান-পরবর্তী সরকার গঠন করবেন। সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ছিল ছয় দফাকেন্দ্রিক আর এই ছয় দফাকে ১৯৬৬ সাল থেকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী দেখে আসছে পাকিস্তান ভাঙার একটি নীলনকশার অংশ হিসেবে। কারণ এই ছয় দফার মূল বিষয় ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে শুধু প্রতিরক্ষা ও বিদেশনীতি ছাড়া অন্য সব বিষয় পাকিস্তানের পাঁচটি প্রদেশের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। অর্থাৎ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা যে সংবিধান প্রণয়ন করবেন, তা হবে সম্পূর্ণভাবে একটি ফেডারেল রাষ্ট্রের কাঠামোভিত্তিক। এতে প্রথমে পাকিস্তানের ভাগ্যনিয়ন্তা পাঞ্জাবের আধিপত্য ক্ষুণ্ন হবে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পাঞ্জাবের সামরিক-বেসামরিক আমলারাই সেই দেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে আবির্ভূত হন এবং এখনো আছেন। পাকিস্তান যে আজ এক পতিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে তার জন্য প্রধানত পাঞ্জাবি সামরিক-বেসামরিক আমলারাই দায়ী। সত্তরের নির্বাচনের আগে জেনারেল ইয়াহিয়া খান এক ফরমান জারি করে বলেন, সংসদে গৃহীত সংবিধান যদি তার মনঃপূত না হয়, তাহলে তিনি তা বাতিল করে দেবেন, ঠিক যেমনভাবে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান বাতিল করে আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করেছিলেন। নির্বাচনের প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধুকে ইয়াহিয়ার ফরমানের কথা মনে করিয়ে দিলে তিনি বলেন, নির্বাচনের পর তিনি এই ফরমানকে ছিঁড়ে ফেলে দেবেন। বঙ্গবন্ধু আগে থেকে জানতেন তিনিই হবেন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা। নির্বাচন সম্পর্কে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা সরকারকে জানায়, আওয়ামী লীগ বড়জোর ৮০টি আসনে জয়ী হবে আর ভুট্টোর পিপলস পার্টি পাবে ৭০টির মতো আসন। তখন তারা একটি কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে বাধ্য হবে এবং শেখ মুজিবের ছয় দফার দফারফা হয়ে যাবে। নির্বাচনে এসবই যখন ভেস্তে গেল, তখনই আওয়ামী লীগ তথা বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করতে ইয়াহিয়া আর ভুট্টো মিলে ষড়যন্ত্রের জাল বোনা শুরু করলেন; যার ফলে ১৯৭১ সালের ২৫-২৬ মার্চের গণহত্যা আর বাঙালিদের দেশ স্বাধীন করার জন্য চূড়ান্ত লড়াইয়ের সূচনা।

২৫ মার্চ মধ্যরাতের পর (২৬ তারিখ) বঙ্গবন্ধুকে তাঁর ধানমণ্ডির বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে প্রথমে সংসদ ভবন এলাকায় এবং পরে সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হয়। ইয়াহিয়া খান আর জুলফিকার আলী ভুট্টো—যাঁরা দিন দশেক ধরে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার নামে নাটক করছিলেন তাঁরা ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় ঢাকা ত্যাগ করেন (ভুট্টো পরদিন)। আওয়ামী লীগ নেতারা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে দ্রুত আত্মগোপন করেন এবং প্রথম সুযোগেই সীমান্ত পার হয়ে ভারতে চলে যান। ভারত সরকার এমন একটা কিছু ঘটতে পারে তা সম্ভবত আগেই আঁচ করতে পেরে তাদের সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের আওয়ামী লীগ নেতাদের সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করার জন্য নির্দেশ দেয়। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদসহ অন্য নেতারা হয় আগরতলা হয়ে অথবা সরাসরি কলকাতায় পৌঁছেন। প্রথম সুযোগেই ২ এপ্রিল তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম দিল্লিতে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহায়তা কামনা করেন। ইন্দিরা গান্ধী তাঁদের আশ্বাস দিয়ে বলেন, সহায়তা কাজে লাগাতে হলে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত তাদের আগে সংগঠিত করতে হবে।

দলের সিনিয়র নেতাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বাংলাদেশের চলমান মুক্তিযুদ্ধ কিভাবে সংগঠিত ও পরিচালিত হবে তা নির্ধারণ করা। এই সময় মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা অংশগ্রহণ করেছেন, তাঁদের মোটা দাগে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমে আছেন সিনিয়র রাজনৈতিক নেতারা। এরপর আছেন তরুণ ছাত্রনেতারা, যাঁদের অনেকেই আবার জাতীয় সংসদে বা গণপরিষদে নির্বাচিত হয়েছেন। আর আছে সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ ও আনসার বাহিনী যারা এই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে। এর বাইরে আছে সাধারণ ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতৃত্বে তাদের বিরাট কর্মীবাহিনী ও সাধারণ জনগণ। প্রথম তিন ভাগের যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে কিছুটা মতপার্থক্যও ছিল। সিনিয়র নেতারা মনে করতেন এই যুদ্ধ পরিচালনার জন্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নিয়ে একটি রাজনৈতিক সরকার গঠন করা উচিত। তাহলে এটা হবে একটি জনযুদ্ধ। তরুণ ছাত্রনেতাদের ধারণা ছিল, সবাইকে নিয়ে একটি বিপ্লবী কাউন্সিল গঠন করা হলে ভালো হয়। আর সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য মনে করতেন, সেনাবাহিনীর সদস্যদের দিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন কমান্ড কাউন্সিল গঠন করা যেতে পারে। তবে সেনাবাহিনীর সদস্যরা তখনো অনেকটা ছত্রভঙ্গ অবস্থায় থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আর এটাও সত্য যে সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে কমান্ড কাউন্সিল গঠন করা হলে বিশ্ব মনে করত এটি একটি সেনা অভ্যুত্থান—কোনো মুক্তিযুদ্ধ নয়। এপ্রিল মাসের ৮ তারিখ কলকাতার লর্ড সিনহা অতিথি ভবনে এই বিষয়গুলো নিয়ে নিজেদের মধ্যে অনেক আলোচনা হয়। একপর্যায়ে তাজউদ্দীন বলেন, এটি ভুললে চলবে না যে বাংলাদেশ হচ্ছে বারো ভুঁইয়ার দেশ। এখানে কেউ হলফ করে বলতে পারে না আজ একটি বিপ্লবী কাউন্সিল গঠন হলো, কাল যে অন্য আরেকটি হবে না তার কী নিশ্চয়তা আছে? তা যদি হয়, পুরো মুক্তিযুদ্ধটাই অসংগঠিত হয়ে যাবে এবং বহির্বিশ্বে বিভ্রান্তি ছড়াবে আর ভুল বার্তা পাঠাবে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে ভারত সরকার বা অন্য কারো সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন পড়লে তা করা কঠিন হবে। তাজউদ্দীন আরো বললেন, যুদ্ধ পরিচালনায় ভুল হলে তখন বহির্বিশ্ব এই যুদ্ধকে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে দেখবে, মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে নয়। তিনি শ্রীলঙ্কার তামিল টাইগার আর কাশ্মীরের মুজাহিদ বাহিনীর উদাহরণ তুলে ধরলেন। (২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে একটি ইংরেজি দৈনিকে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের দেওয়া সাক্ষাৎকার)। একই যুক্তি দিলেন ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলাম। সবাই তাঁদের যুক্তি মেনে নিলেন। সিদ্ধান্ত হলো সত্তরের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সরকার গঠন করা হবে এবং তাঁদের অধীনেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হবে। একই সঙ্গে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুলে ধরার জন্য এ সরকার কাজ করে যাবে। এ সরকারই হবে জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত বৈধ সাংবিধানিক সরকার। সেই রাতেই ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র তৈরি করে ফেললেন। এটি ছিল তাঁর মতো অনেকের জন্য নির্ঘুম রাত। ঘোষণাপত্রের মূল ভিত্তি ছিল ‘সাম্য, মানবিক মূল্যবোধ আর সামাজিক ন্যায়পরায়ণতা।’ দুই পৃষ্ঠার ঘোষণাপত্রে বিস্তারিতভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়। ১০ এপ্রিল যেসব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে জোগাড় করা সম্ভব ছিল তাঁদের নিয়ে তিস্তা নদীর উজানে জঙ্গলের মধ্যে একটি তাঁবুতে বাংলাদেশের প্রথম সংসদ অধিবেশন বসে এবং সবার মতামতের ভিত্তিতে ছয় সদস্যের একটি সরকার গঠন করা হয়। রাষ্ট্রপতি হিসেবে যার প্রধান ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। এও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, তাঁর অবর্তমানে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। সরকার গঠনের সংবাদটি স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র আর ভারতের আকাশবাণী থেকে প্রচার করা হয়। সংসদ সদস্য কর্নেল এম এ জি ওসমানীকে করা হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি। সরকার তো গঠন করা হলো, পরবর্তী চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মন্ত্রিপরিষদের শপথবাক্য পাঠ এবং সিদ্ধান্ত হলো, তা হবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রকাশ্যে এবং বিশ্ব মিডিয়ার সামনে করতে হবে।

১৯৭১ সালে পাবনার জেলা প্রশাসক ছিলেন মোহাম্মদ নুরুল কাদের খান। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণকে তিনি আসন্ন মুক্তিযুদ্ধের সবুজ সংকেত হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই নুরুল কাদের খান স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও ছাত্র-জনতা নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হন। সরকার গঠনের খবর তাঁকে উজ্জীবিত করে। তখন তিনি ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি নিজে সীমান্ত অঞ্চলে গিয়ে বিএসএফের কর্মকর্তা গোলক মজুমদার ও রুস্তমজির সঙ্গে আলাপ করেন এবং বলেন, মন্ত্রিপরিষদ যদি সীমান্তবর্তী এলাকা মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলায় শপথবাক্য পাঠ করে, তাহলে তিনি তাঁদের নিরাপত্তা দেবেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে এ দুই বিএসএফ কর্মকর্তার অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কলকাতায় খবর পৌঁছল। ১৬ তারিখ নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও আবদুল মান্নান (টাঙ্গাইল)  কলকাতা প্রেস ক্লাবে গিয়ে সাংবাদিকদের খবর দিলেন পরদিন তাঁরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যাবেন এবং তাঁদেরও সঙ্গে যেতে আমন্ত্রণ জানালেন।

১৭ তারিখ সীমান্তবর্তী এলাকায় সকাল থেকে প্রাণচাঞ্চল্য। আওয়ামী লীগের কিছু নেতা আসবেন একটি সভা করতে। সকাল ১১টা নাগাদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিসভা সীমান্ত অতিক্রম করে প্রবেশ করল বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় সূচনা করতে। সঙ্গে এক দল সাংবাদিক। এরই মধ্যে চৌকি দিয়ে একটি ছোট মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। ঝিনাইদহের মহকুমা পুলিশ কর্মকর্তা মাহবুবউদ্দিন আহমদ কিছু পুলিশ আর আনসার নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিসভাকে গার্ড অব অনার জানালেন। বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা উত্তোলন করা হলো। গণপরিষদ সদস্য অধ্যাপক ইউসুফ আলী মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করালেন। মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার নতুন নামকরণ হলো মুজিবনগর। শপথবাক্য পাঠ করানোর সময় সামনে প্রায় হাজার পাঁচেক মানুষ উপস্থিত ছিল। সবার মুখে একটাই স্লোগান, ‘জয় বাংলা’। শপথ নেওয়ার পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ উপস্থিত জনগণ ও সাংবাদিকদের উদ্দেশে বেশ উদ্দীপনামূলক ও তেজোদীপ্ত বক্তব্য দেন। পুরো অনুষ্ঠান ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে শেষ হয়। এ সময় নুরুল কাদের খানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা এলাকার নিরাপত্তা বিধান করেন। তাঁদের সহায়তা করে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। নতুন শপথ নেওয়া সরকারকে যদিও প্রচলিত অর্থে মুজিবনগর বা প্রবাসী সরকার বলা হয়, বস্তুত এ সরকারই ছিল বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক সরকারের ‘মাতৃ সরকার’ (Mother Government)। আর ১০ এপ্রিল তিস্তার পারে তাঁবুর ভেতর যে সংসদ অধিবেশন বসেছিল, তা ছিল বাংলাদেশের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের প্রথম অধিবেশন। এ সরকারের অধীনেই পরবর্তী ৯ মাস বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে এবং একাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ মুক্ত হয়েছে। এই সব ইতিহাস বর্তমান প্রজন্ম জানলে সম্ভবত তাদের রাজাকার হওয়ার খায়েশ জাগত না। বাংলাদেশে নতুন করে কেউ রাজাকার হতে চায় তা জেনে ৩০ লাখ শহীদ নির্ঘাত এই নব্য রাজাকারদের অভিশাপ দেবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ১০ ও ১৭ এপ্রিল দিন দুটি অমর হয়ে থাকবে। বঙ্গবন্ধু যে সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন, সেই বাংলাদেশ বিনির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল; যে দিনটি আজ মুজিবনগর দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। একাত্তরের বীরদের অভিবাদন।

 

লেখক : বিশ্লেষক গবেষক

 


মন্তব্য