kalerkantho


সিভিল সার্ভিসে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয় কার স্বার্থে?

এ কে এম আতিকুর রহমান

১২ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



সিভিল সার্ভিসে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয় কার স্বার্থে?

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশের জন্মলগ্নে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার যথেষ্ট কারণ ও প্রয়োজন ছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের পুনর্গঠন এবং অর্থনীতিকে সচল করার জন্য তেমন লোকবল বাংলাদেশের ছিল না। দক্ষ জনবল তৈরি করার সময় কোথায়? দক্ষ-অদক্ষ যে লোকবলই তখন পাওয়া গেছে, তাদেরই ডেকে এনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন। নবীন আর প্রবীণের যৌথ পরিশ্রমে দেশকে দাঁড় করাতে হয়েছে। সে ছিল এক ভিন্ন প্রেক্ষিত।

কিন্তু স্বাধীনতার এতগুলো বছর পার হয়ে গেলেও চুক্তিভিত্তিক বা পুনর্নিয়োগ বেড়েছে বৈ কমেনি। তাহলে এত দিনেও কি আমাদের আমলাতন্ত্রের ভিত শক্ত হতে পারেনি? আসলে এর পেছনে রয়েছে অন্য কারণ। আর সে কারণটি কমবেশি সবারই জানা। সরকারি বিধি-বিধানে হয়তো এ ধরনের নিয়োগে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। অর্থাৎ সরকার ইচ্ছা করলেই সরকারের যেকোনো অফিসে একজনকে যেকোনো পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে পারে। তা ওই ব্যক্তি যেকোনো পেশায় থাকুক বা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীই হোক। এ ক্ষেত্রে সরকারের ইচ্ছাই শেষ কথা। বিষয়টি কে কিভাবে দেখল, তা বিবেচ্য নয়।

সম্প্রতি পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীকে পুনর্নিয়োগ দেওয়া সংক্রান্ত একটি মামলার পর্যবেক্ষণে এ ধরনের নিয়োগকে আইনের ব্যত্যয় বলে আখ্যায়িত করেন। এ ছাড়া আদালত পুনর্নিয়োগ কাঙ্ক্ষিত কর্মচারীদের পদোন্নতিকে রুদ্ধ করার শামিল এবং সুশাসনের জন্য সহায়ক নয় বলে উল্লেখ করেন। সুপ্রিম কোর্টের ওই বেঞ্চ আইন লঙ্ঘন করে কাউকে যেন চুক্তিতে নিয়োগ না দেয় সে জন্য সরকারকে নির্দেশনা প্রদান করেন। বিশেষ করে অবসরে যাওয়া কোনো সরকারি কর্মচারীকে পুনর্নিয়োগের অভ্যাসকে নিরুৎসাহ করতে হবে। আদালতের ভাষায়, in terms of the definitions of section 2(1) (b) (ii) of the Civil Servants Act 1973, a person who is employed on contract does not even fall within the definition of a civil servant, so his authority to command and maintain discipline can well be imagined from the fact that if a person himself is not a civil servant, he is considered only bound by the terms and conditions of his contract and not by the statutory law, because if any condition laid down in the contract is violative to statutory law, he would only be subject to action under the said contract.  ওই নির্দেশে আদালত আরো উল্লেখ করেছেন যে সরকারের স্বার্থেই, অপরিহার্য না হলে চুক্তিতে কোনো ব্যক্তিকে নিয়োগ না দিয়ে  কনিষ্ঠদের পদোন্নতি দেওয়া দরকার।

আমাদের দেশেও চুক্তি ভিত্তিতে বা অবসরগ্রহণের পর পুনর্নিয়োগের বিষয়ে সরকারি কর্মচারী বিধিতে বলা হয়েছে, ‘যে সকল ক্ষেত্রে তুলনীয় যোগ্যতম ও দক্ষতাসম্পন্ন টেকনিক্যাল বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পাওয়া দুষ্কর, শুধু সেই সকল ক্ষেত্রেই চুক্তির ভিত্তিতে অবসরগ্রহণের পরও তাহাদিগকে নিয়োগ করা যাইতে পারে। অন্যান্য ক্ষেত্রে অর্থাৎ যেখানে তুলনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন লোক পাওয়া সম্ভব এই নীতির উদার প্রয়োগ বাঞ্ছনীয় নহে।’ আরেকটি বিষয়ও বিধিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘যে সকল ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়/বিভাগ/পরিদপ্তর/সংস্থাসমূহ তুলনীয় যোগ্যতম ও দক্ষতাসম্পন্ন টেকনিক্যাল বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পাওয়া দুষ্কর বলিয়া মনে করেন, সেই সকল ক্ষেত্রে নবীন অফিসারদিগকে প্রবীণ বিশেষজ্ঞদের স্থলাভিষিক্তকরণের জন্য পূর্ব থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’ অর্থাৎ চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া যাবে না কথাটি না বললেও এ ধরনের নিয়োগকে নিরুৎসাহ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি একেবারেই বিপরীত।

ভারত বা পাকিস্তানের মতোই বাংলাদেশে চুক্তিতে নিয়োগে জনস্বার্থের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিধি-বিধান মতে, একমাত্র জনস্বার্থেই পুনর্নিয়োগ বা চুক্তিতে নিয়োগ বিবেচনা করা যাবে। অথচ ‘জনস্বার্থ’-এর খোলসে অন্য স্বার্থ বা উদ্দেশ্যকে প্রাধান্য দিয়েই চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। বাংলাদেশে সামরিক শাসন শুরু হওয়ার পর থেকে এ ধরনের নিয়োগের প্রচলন চলে আসছে। কখনো কোনো সরকার এ শ্রেণির নিয়োগ বন্ধের দুঃসাহস দেখায়নি। তবে কখনো চুক্তিতে নিয়োগের হার কমিয়েছে আবার বাড়িয়েছে। এই কমানো বা বাড়ানো কিন্তু জনস্বার্থে বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দেশের জন্য অপরিহার্য বলে করা হয় না। কেন বা কী কার্যকারণে এ ধরনের নিয়োগ হয়ে থাকে সেটি সবার কাছেই অত্যন্ত সহজভাবে বোধগম্য। সবচেয়ে বেশি চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয় রাজনৈতিক বিবেচনায় এবং তারপর দেওয়া হয় নিয়োগদান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রের নিয়োগে সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানকে সম্মত করাতে সক্ষম এমন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেই হলো। প্রার্থীর নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন তা ওই সরকারের রাজনৈতিক দর্শনের বিরোধী হলেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় না, নিয়োগদাতার অজান্তেই মূল কাজটি হয়ে যায়।

একসময়, বিশেষ করে সামরিক শাসনামলে, বাংলাদেশে পার্শ্ব-প্রবেশ (lateral entry) নামক এক উদ্ভট পদ্ধতিতে ক্যাডার সার্ভিসের বিভিন্ন পদে চাকরির সংস্থান করা হয়েছিল। সবচেয়ে গর্হিত ঘটনাটি ছিল জাতির জনকের হত্যাকারীদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকরি দিয়ে তড়িঘড়ি করে কূটনৈতিক দায়িত্বে বিদেশস্থ বাংলাদেশের দূতাবাসে প্রেরণ করা। এ ক্ষেত্রে হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনা তো দূরের কথা, বরং চুক্তিতে নিয়োগ দিয়ে এসংক্রান্ত সরকারি বিধির চরম অপপ্রয়োগ করা হয়। এ ছাড়া ‘পারসোনাল পোস্ট’ সৃষ্টি করেও নিয়মিত কর্মচারীদের মতো সুযোগ-সুবিধা দিয়ে অনেক অবসরে যাওয়া ব্যক্তিকে সরকারি চাকরিতে বহাল করা হয়েছিল। সিভিল সার্ভিসের ন্যূনতম যোগ্যতাও, বিশেষ করে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বয়স, সে ক্ষেত্রে বিচার্য ছিল না। কেউ ইচ্ছা করলেন এবং তা হয়ে গেল। অর্থাৎ ওই নিয়োগে কোনো স্বচ্ছতা বা প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকার আবশ্যকতার বিষয়টি উত্থাপিত হয়নি। দুঃখজনক হলেও সত্য যে ওই প্রক্রিয়ায় নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কিন্তু ক্যাডারের নিয়মিত কর্মচারীদের মতোই পদোন্নতি পেয়ে শীর্ষ অবস্থানেও যেতে পেরেছিলেন। তবে এখন আর ওই ধরনের কোনো নিয়োগ দেওয়ার প্রচলন লক্ষ করা যায় না।

বলতে দ্বিধা নেই যে চুক্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কর্তব্যকালে তাঁদের রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রভাব খাটিয়ে থাকেন। কারণ রাজনৈতিক যোগসূত্রতার ভিত্তিতেই যে তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, এর ব্যত্যয় ঘটানোর সাহস ও সাধ্য তাঁদের থাকার কথা নয়। বলা বাহুল্য, তাঁদের দাপ্তরিক কাজকর্মে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা থাকবেই। ফলে তাঁদের পক্ষে নিরপেক্ষভাবে কাজকর্ম বা দায়িত্ব পালন করা কতটুকু সম্ভব হয়, তা সবারই জানা। এ বেড়াজাল থেকে বের হতে গেলে যে মূলধনটাই খোয়াতে হবে।

সিভিল সার্ভিসকে শক্তিশালী করতে পারলে চুক্তিতে নিয়োগের অবকাশ থাকত না বলে অনেকে মনে করে। তবে কি সিভিল সার্ভিসকে দুর্বল করে রাখার জন্যই এমন গড়পড়তা চুক্তিতে নিয়োগের ব্যবস্থাটি সযত্নে রাখা হয়েছে? এ কথা সত্য যে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা প্রভাব খাটানোর প্রয়াস না থাকলে চুক্তিতে নিয়োগের প্রশ্নটিই উত্থাপিত হতো না। তাহলে এ ধরনের নিয়োগ কি আসলেই আমলাতন্ত্রকে দুর্বল করে রাখার জন্য নয়? নাকি এর পেছনে অন্য উদ্দেশ্য আছে? অর্থাৎ পছন্দের কিছু ব্যক্তিকে সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা?

আমলাতন্ত্রকে দুর্বল করা বা না করা, যে জন্যই অহরহ চুক্তিতে নিয়োগ প্রদান করা হোক না কেন, এ ধরনের নিয়োগে অনেকেই যে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে এ কথা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। আসলে সিভিল সার্ভিসের প্রতিটি ক্যাডারকেই কর্মক্ষেত্রের যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য নিয়মিতভাবে দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমান বিশ্বের একই পেশায় নিয়োজিতদের মতোই কর্মদক্ষতা অর্জন করতে হবে। উচ্চতর পদ খালি হওয়া মাত্রই যেন ওই পদে পদোন্নতি দেওয়ার উপযুক্ত কর্মচারীর সামান্যতম অভাব না থাকে। কাজটি করতে পারলে হয়তো চুক্তিতে নিয়োগের হার কিছুটা হ্রাস পেতে পারে। আর এসব পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকেই।   

পুনর্নিয়োগ বা চুক্তিতে নিয়োগ যে একেবারেই দেওয়া যাবে না, তেমন নয়। তবে সে ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তিকে হতে হবে ওই পদের জন্য অপরিহার্য এবং নিয়োগটি হতে হবে বাস্তবিক অর্থেই জনস্বার্থে। এ ছাড়া রাজনৈতিক যোগসূত্রতায় বা ব্যক্তিগত স্বার্থে যাকে খুশি তাকে নিয়োগ না দিয়ে প্রার্থীকে বাছাই করতে হবে মেধার ভিত্তিতে, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার অনুসরণে এবং সমতার ভিত্তিতে। একটি বিষয় না বললেই নয় যে এ ধরনের নিয়োগের কারণে যেন কর্মরত কর্মচারীদের পদোন্নতি বিঘ্নিত না হয়, তাঁদের প্রতি অবিচার করা না হয়। এ কারণে সামান্য হলেও কর্মরতদের মাঝে যেন কোনো ক্ষোভ বা অসন্তোষের সৃষ্টি না হয় সেদিকে অবশ্যই লক্ষ রাখতে হবে। সর্বোপরি, নিয়োগদাতারই উচিত হবে সিভিল সার্ভিসকে দেশের সেবায় সর্বোচ্চ মাত্রায় ব্যবহার করার উপযুক্ত করে প্রস্তুত রাখা।

 

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব



মন্তব্য