kalerkantho


চট্টগ্রামে গৃহকর্মীর কাজ পেতে মরিয়া রোহিঙ্গারা

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



রোহিঙ্গাদের একটি অংশ চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগরীতে এসে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ পাওয়ার চেষ্টা করছে। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা।

তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কক্সবাজার ছেড়ে চট্টগ্রামে আসা রোহিঙ্গাদের শনাক্ত করে তালিকা তৈরির জন্য জেলার সব থানার অফিসার ইনচার্জদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা নিতেও বলা হয়েছে। ’ আর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) তানভীর মো. সাহেল জানিয়েছেন, নগরীতে প্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের এক স্থানে জড়ো করার পর পুনরায় পুলিশের তত্ত্বাবধানে কক্সবাজারে ফেরত পাঠানো হবে।

গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১১টায় নগরীর পাঁচলাইশ থানার হামজারবাগ ফুলেশ্বরী আবাসিক এলাকার একটি বাসায় যান আনুমানিক ৩০ বছর বয়স্ক এক নারী। কলিংবেল শুনে দরজা খোলেন বাড়ির বাসিন্দা এনামুল হক। তাঁর কাছে আগন্তুক নারী গৃহকর্মী লাগবে কি না জানতে চান। পরিচয় জানতে চাইলে ওই নারী নিজেকে কক্সবাজারের বাসিন্দা বলে দাবি করেন। কিন্তু তাঁর কথা শুনে এনাম বুঝতে পারেন, তিনি রোহিঙ্গা। কক্সবাজারের ঠিকানা জানতে চাইলে ওই নারী টেকনাফ শব্দটি উচ্চারণ করেন।

আর কোনো এলাকার নাম বলতে পারেননি তিনি।

এর আধা ঘণ্টা পর গলির মুখে দেখা যায় আরো দুই নারী ও দুই শিশুসহ চারজনকে। তাঁদের মধ্যে একজন সালেহা বেগম পরিচয় দিয়ে জানান, দুই সপ্তাহ আগে জীবন বাঁচাতে তাঁরা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। কয়েক দিন কক্সবাজারের উখিয়া কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশের সড়কে একটি ঝুপড়িতে ছিলেন। পরে দুই সন্তান ও বোনকে নিয়ে চট্টগ্রামে চলে আসেন। তিনি গৃহকর্মীর কাজ চান।

কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপকালে সালেহা জানান, তাঁদের বাড়ি রাখাইনের বুচিডং এলাকায়। তাঁর স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। রাখাইনে তাঁরা মোটামুটি সচ্ছল ছিলেন। আসার সময় মিয়ানমারের মুদ্রা কিয়েট নিয়ে এসেছিলেন। টেকনাফে পৌঁছে কিয়েট ভাঙিয়ে ছয় হাজার ৮৫০ টাকা পেয়েছিলেন। এখন যা আছে তাতে আর দুই দিন চলবে।

সালেহার বোন রাবেয়া বেগম ঘর পুড়িয়ে দেওয়ার পর বোনের সঙ্গে বাংলাদেশে চলে আসেন। এখনো স্বামী-সন্তানের খোঁজ জানেন না। তাঁরা জীবিত নাকি মারা গেছেন বলতে পারেন না তিনি। কথা বলার সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন ১০ বছরের ছেলে আরাফাত হোসেনের জন্য। রাখাইনে তাঁর স্বামীর একটি মুদি দোকান ছিল।

চট্টগ্রাম নগরে তিন দিন আগে পৌঁছেছেন উল্লেখ করে সালেহা বেগম জানান, উখিয়া থেকে অটোরিকশা নিয়ে তাঁরা কক্সবাজার সদরে আসেন। তারপর বাসে চড়ে আসেন চকরিয়ায়। সেখানে এক রাত একটি বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছিলেন। পরে আরেকটি বাসে উঠে নগরীতে চলে আসেন। এখানে তাঁদের পরিচিত কেউ নেই। তবে একটি বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছেন। ওই বাড়ির ঠিকানা তিনি স্পষ্ট বলতে পারলেন না। বর্ণনা অনুযায়ী, ওই রোহিঙ্গা পরিবারটি পাঁচলাইশ থানার মুরাদপুর বা মোহাম্মদপুর এলাকার আশপাশে কোনো বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছে। সেখান থেকেই চারজনের মধ্যে তিনজনই গৃহকর্মী হিসেবে বাসাবাড়িতে নিয়োগ পাওয়ার চেষ্টা করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগরীতে অনেক রোহিঙ্গা পরিবার চলে আসছে। এর আগে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর কক্সবাজার থেকে দলবদ্ধভাবে রোহিঙ্গারা চট্টগ্রাম নগরীতে চলে এসেছিল। তখন আন্দরকিল্লা শাহি জামে মসজিদ চত্বরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের পুলিশ কৌশলে সরিয়ে দিয়েছিল। এরপর তাদের আর হদিস পাওয়া যায়নি।

এবারও রোহিঙ্গারা কক্সবাজার ছাড়িয়ে চট্টগ্রামমুখী।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামে চলে আসছেন। কয়েকজনকে পুলিশ শনাক্ত করে কক্সবাজারে ফেরত পাঠিয়েছে। রোহিঙ্গারা চট্টগ্রামে এসে কার তত্ত্বাবধানে আছে, সেই তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ’

চট্টগ্রাম মহানগরীতে রোহিঙ্গাদের প্রবেশ ও বাসাবাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার চেষ্টা বিষয়ে জানতে চাইলে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (বন্দর) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ জানান, গোয়েন্দা পুলিশ এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ

করছে।

একই বিষয়ে মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) তানভীর মোহাম্মদ সালেহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কিছু রোহিঙ্গা কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামে আসছে বলে শোনা যাচ্ছে। এ কারণে চট্টগ্রামের প্রবেশমুখের সব চেকপোস্টকে ভালোভাবে গাড়ি তল্লাশির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো গাড়িতে রোহিঙ্গা পাওয়া যায়, তাহলে তাদের নামিয়ে এক স্থানে জড়ো করা হবে। তারপর মহানগর পুলিশের তত্ত্বাবধানে সবাইকে কক্সবাজারের ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হবে। ’


মন্তব্য