kalerkantho


বিদেশে একটি মৃত্যু এবং লাশ নিয়ে টানাহেঁচড়া, রহস্য

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



সেলিম মিয়া মারা গেছেন অন্তত ১০ দিন আগে। পাঁচ দিন পর মালয়েশিয়া থেকে লাশ এলে শুরু হয় দাফনের প্রস্তুতি।

গোসলের সময় দেহে আঘাতের চিহ্ন দেখে মৃত্যুর কারণ নিয়ে সন্দেহ ঘনীভূত হয়। ওদিকে মালয়েশিয়া প্রবাসী এক সহকর্মীর স্বজনরা চাপ দিতে থাকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফন করতে। একপর্যায়ে ওই সহকর্মীর পাওনা মিটিয়ে লাশ দাফন করতে বলা হয়। এভাবে কেটে গেছে আরো চার দিন। সর্বশেষ গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত লাশ পড়ে ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতাল মর্গে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার পানিশ্বর ইউনিয়নের টিঘর গ্রামের ফতু মিয়ার ছেলে সেলিম মিয়া ওরফে হেলিম মিয়া (৫০) গত ৪ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়াতে মারা যান বলে খবর আসে। ৯ সেপ্টেম্বর রাতে লাশ দেশে আনা হয়। পরদিন নিয়ে আসা হয় বাড়িতে।

পরিবারের অভিযোগ, মালয়েশিয়ায় সেলিমের সহকর্মী করম আলীর স্বজনরা লাশ দেশে আসার পর প্রথমে দ্রুত দাফন করতে বলে।

এমনকি গোসল না করিয়েই লাশ দাফনের জন্য চাপ দেওয়া হয়। চাপ উপেক্ষা করে সেলিমকে গোসল করাতে গেলে শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন দেখে দাফন না করে আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার কথা বলে স্বজনরা। এ অবস্থায় করম আলীর স্বজনরা দাবি তোলে, ময়নাতদন্ত করতে হলে করম আলীর পাওনা তিন লাখ টাকা মিটিয়ে দিতে হবে। বিষয়টি একপর্যায়ে সালিসে গড়ায়।

সেলিমের মেয়ে শিল্পী বেগম বলেন, ‘প্রায় ৯ বছর ধরে বাবা মালয়েশিয়ায় থাকেন। সম্পর্কে তালই করম আলীর সঙ্গেই তিনি থাকতেন। করম আলী দেশে পাকা ভবন করার সময় বাবার কাছ থেকে টাকা ধার নেন। এ নিয়ে মালয়েশিয়াতেই দুজনের মধ্যে বিরোধ চলছিল। এবার ঈদে বাড়ি আসার কথা ছিল বাবার। এরই মধ্যে করম আলী ফোন করে জানান, বাবাকে জিন/ভূতে ধরেছে। পরে আমাদেরই এক আত্মীয় সেখানে গিয়ে জানতে পারেন যে বাবা মারা গেছেন। ওই আত্মীয়সহ করম আলীর মাধ্যমে বাবার লাশ দেশে আনা হয়। লাশ দেশে পাঠাতে দুবাইয়ের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে করম আলী দুই লাখ টাকাও নেন। করম আলীই টাকার জন্য বাবাকে হত্যা করেছেন। ’

সেলিমের চাচা রহিছ আলী ও ভাতিজা মাহবুব মিয়া বলেন, ‘করম আলীর লোকজন প্রথমে দ্রুত লাশ দাফন করতে বলে। পরে লাশের ময়নাতদন্ত করার সিদ্ধান্ত জানালে তারা তিন লাখ টাকা দাবি করে। বলা হয়, লাশ পাঠাতে করম আলী তিন লাখ টাকা খরচ করেছেন। এ নিয়ে এলাকায় সালিসও হয়। কিন্তু লাশের গায়ে আঘাতের চিহ্ন থাকার কথা জেনে এলাকার অনেক সরদার পিছিয়ে যান। এ অবস্থায় চার দিন ধরে লাশটি টিঘরের বাড়িতে পড়ে থাকে। আদালতের নির্দেশে গতকাল পুলিশ লাশ এনে ময়নাতদন্ত করায়। এর আগে মঙ্গলবার রাতে পুলিশ গিয়ে দ্রুত লাশ দাফন করতে বলে। ’

পানিশ্বর ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য লায়েছ মিয়া বলেন, ‘সামাজিকভাবে বসে আমরা তাত্ক্ষণিকভাবে লাশ দাফনের সিদ্ধান্ত নেই। কিন্তু লাশের গায়ে আঘাতের চিহ্ন থাকায় সেটা আর সম্ভব হয়নি। পরে করম আলীর লোকজন লাশ দাফনের আগে টাকা দাবি করে। এ অবস্থায় সেলিম মিয়ার স্বজনরা আইনের আশ্রয় নিলে সে অনুযায়ী আজ (গতকাল) দুপুরে পুলিশ এসে লাশ নিয়ে যায়। ’

ময়না তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সেলিম মিয়ার গায়ে আঘাতের একাধিক চিহ্ন রয়েছে। শরীরে আগুনে পোড়া ক্ষত দেখা গেছে। এ ছাড়া একটি পায়ের কাছে সেলাই লক্ষ করা গেছে। লাশে পচন ধরেছে বলেও সূত্র জানায়।

সরাইল থানার ওসি রূপক কুমার সাহা বলেন, ‘আদালতের নির্দেশে আমরা লাশের ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করেছি। এ বিষয়ে আদালতে মামলা করতে হবে। আদালত থেকে নির্দেশ পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’ এ বিষয়ে পুলিশ কোনো অনুসন্ধান করেনি।


মন্তব্য