kalerkantho


বিশ্ব নদী দিবস আজ

ভারতের সঙ্গে আরো ১৬ আন্তর্দেশীয় নদী চিহ্নিত

আরিফুর রহমান    

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ভারতের সঙ্গে আরো ১৬ আন্তর্দেশীয় নদী চিহ্নিত

বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে গতকাল রাজধানীর বাহাদুর শাহ পার্ক থেকে পদযাত্রা বের করে বিশ্ব নদী দিবস সমন্বয় পরিষদ। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৫৪টি আন্তর্দেশীয় নদী থাকলেও পানিবণ্টন চুক্তি আছে শুধু গঙ্গা নিয়ে। ৫৩টি নদী নিয়েই দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো পানিবণ্টন চুক্তি কিংবা ব্যবস্থাপনা নেই।

পানি বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, যে একটি নদী নিয়ে (গঙ্গা) ভারতের সঙ্গে পানিচুক্তি হয়েছিল, সেটিও সঠিকভাবে মানা হচ্ছে না। আরেক নদী তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে জল অনেক ঘোলা হলেও সেটি এখনো অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে।

আন্তর্দেশীয় নদীর পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের সঙ্গে চলমান অচল অবস্থার মধ্যেই সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) নতুন একটি গবেষণা করে দেখিয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ১৬টি অভিন্ন নদী আছে, যেগুলো স্বীকৃত নয়। অবশ্য এই নদীগুলোর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ কিংবা পানির প্রবাহ কোনোটাই গঙ্গা, তিস্তার মতো নয়।

সিইজিআইএস বলছে, ভবিষ্যতে যদি কখনো বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) সভা হয়, তখন ১৬টি আন্তর্দেশীয় নদীর বিষয়ে তাদের সামনে তুলে ধরা হবে।

ভারতের সঙ্গে যে ১৬টি আন্তর্দেশীয় নদী চিহ্নিত করেছে সেগুলো হলো মহারশী, গঙ্গাধর, কর্নাজোহরা, হাড়িয়াভাঙ্গা, রাঙ্গাবালী, লোহার, কর্ণফুলী, লুবা, জালিয়াচারা, চেলা, কাশিমারা, শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতি, গণেশ্বরী, মঙ্গলেশ্বরী, সোমেশ্বরী নদী ও মাহাদেও নদী।

সিইজিআইএসের উপনির্বাহী পরিচালক মালিক ফিদা এ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা গবেষণা করে ১৬টি নদী পেয়েছি, যেগুলো ভারতের সঙ্গে অভিন্ন নদী। যদিও এসব নদী আন্তর্দেশীয় হিসেবে স্বীকৃত নয়। এসব নদীর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ্যসহ সব ধরনের তথ্য গবেষণা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

জানতে চাইলে যৌথ নদী কমিশনের সদস্য মোফাজ্জল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আন্তর্দেশীয় নদী নিয়ে সিইজিআইএস থেকে একটি প্রতিবেদনে আমরা পেয়েছি; যেখানে তারা নতুন করে আরো ১৬টি নদীকে আন্তর্দেশীয় নদী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আমরা সেগুলো পর্যালোচনা করছি। ’

ভারতের সঙ্গে ৫৪টি নদীর পানি বণ্টন চুক্তি প্রসঙ্গে মোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘একটি নদী গঙ্গা চুক্তি সইয়ের বিষয়টি সবাই অবগত আছে। তিস্তা ও ফেনী নদীর পানিবণ্টন চুক্তি দুই সরকারের বিশেষ বিবেচনায় রয়েছে। আর ছয়টি নদীর পানিবণ্টন বিষয়ে দুই দেশ একে অপরের সঙ্গে তথ্য-উপাত্ত আদান-প্রদান করছে। অন্য নদীগুলোর পানিবণ্টন দুই সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়। ’

মোট ৫৭টি আন্তর্দেশীয় নদীর মধ্যে ভারতের সঙ্গে ৫৪টি আর বাকি তিনটি নদী মিয়ানমারের সঙ্গে। বাংলাদেশ থেকে একটি নদী ভারতে ঢুকেছে, সেটি হলো কুলীক নদী। কুলীক নদী বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রবেশ করেছে ঠাকুরগাঁও দিয়ে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অভিন্ন ৫৪টি নদী নিয়ে আলাদা চুক্তি না করে একসঙ্গে করার পক্ষে মত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় তিনি বলেন, আলাদা পানিবণ্টন চুক্তি করতে গেলে অনেক সময় অপচয় হবে। একসঙ্গে চুক্তি হলে সময় কম লাগবে।

আন্তর্দেশীয় নদীগুলোর যখন এই অবস্থা, দেশীয় নদীর অবস্থা আরো করুণ। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান তাঁর জীবনের বড় একটি সময় চলাচল করেছেন কিশোরগঞ্জের নরসুন্দা নদী দিয়ে। নৌকায় করে ভৈরবের নিজ বাড়ি থেকে কিশোরগঞ্জ শহরে যেতেন তিনি। কিশোরগঞ্জের বুক চিরে প্রবাহিত এই নদী নিয়ে বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদেরও রয়েছে অনেক স্মৃতি। এই নদী দিয়ে তিনিও আসা-যাওয়া করতেন। নদীটি নিয়ে তিনি অনেক কথা বলেছেন তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মীদের সঙ্গে। কালের সাক্ষী সেই নদী আজ মৃতপ্রায়। প্রভাবশালীরা যে যার মতো দখলে নিয়ে প্রায় ভরাট করে ফেলেছে নরসুন্দাকে। নদীটি এখন কচুরিপানা আর আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত কপোতাক্ষ নদেরও একই হাল। এটিও দখল হয়ে গেছে। অথচ এই নদের কথা সুদূর বিলেতে বসেও স্মরণ করেছিলেন কবি। সরকার ২০১০ সালে এই নদ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিলেও তাতে কোনো কাজ হয়নি। সরকার যে টাকা বরাদ্দ দিয়েছে, তার পুরোটাই জলে গেছে। কপোতাক্ষ নদ পুনরুদ্ধার করতে এলাকাবাসী আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

নরসুন্দা, কপোতাক্ষের মতো বাংলাদেশের নদীগুলো দখল দূষণে দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে। ঢাকার চারপাশের চারটি নদী বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগেরও বেহাল দশা। দখল দূষণে মরতে বসেছে এ চারটি নদী।

এমন বাস্তবতায় বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও আজ রবিবার বিশ্ব নদী দিবস পালিত হচ্ছে। নদী সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ রবিবার পালন করা হয় বিশ্ব নদী দিবস। ১৯৮০ সাল থেকে বিশ্ব নদী দিবস পালন করতে শুরু করে কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি। দেশটির খ্যাতনামা নদীবিষয়ক আইনজীবী মার্ক অ্যাঞ্জেলো সেপ্টেম্বর মাসের শেষ রবিবার ‘নদী দিবস’ হিসেবে পালনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ২০০৫ সালে জাতিসংঘ নদী রক্ষায় জনসচেতনতা তৈরি করতে ‘জীবনের জন্য জল দশক’ ঘোষণা করে। সে সময়ই জাতিসংঘ দিবসটি অনুসমর্থন করে। এরপর থেকেই জাতিসংঘের বিভিন্ন সহযোগী সংস্থা দিবসটি পালন করছে, যা দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে আজ।


মন্তব্য