kalerkantho


সাত পর্যবেক্ষণসহ রায় হাইকোর্টের

বিচারপতি জয়নুল আবেদীন বিষয়ে চিঠি প্রশাসনিক

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



হাইকোর্ট বলেছেন, সাবেক বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান বন্ধ করতে দুদককে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া চিঠি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি খর্ব করেছে। ওই চিঠি জনগণের মধ্যে বার্তা দিয়েছে যে ফৌজদারি অপরাধে সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিচারের ক্ষেত্রে দায়মুক্ত।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রপতি ছাড়া আর কেউ দায়মুক্তি পেতে পারেন না। আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে সাত বছর ধরে দুদক অনুসন্ধান চালানোয় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আদালত।  

দুদককে দেওয়া সুপ্রিম কোর্টের চিঠি কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে জারি করা রুল নিষ্পত্তি করে দেওয়া রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল মঙ্গলবার সাতটি পর্যবেক্ষণ দিয়ে রুল নিষ্পত্তি করে রায় দেন।

রায়ের পর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান সাংবাদিকদের বলেন, এ রায়ে প্রমাণিত হয়েছে বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান বন্ধ করতে সুপ্রিম কোর্টে দেওয়া চিঠি অবৈধ। ওই চিঠির আইনগত কোনো ভিত্তি নেই। ফলে বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালাতে কোনো বাধা নেই।

বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের আইনজীবী ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ রায়কে ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। ’ তিনি আরো বলেন, একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের বিরুদ্ধে সাত বছরেও অনুসন্ধান কার্যক্রম সম্পন্ন করতে না পারায় দুদকের সমালোচনা করেছেন আদালত।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, এ রায়ের ফলে অনেক বিতর্কের অবসান হবে। এ রায় অত্যন্ত ভালো রায়।

আদালত রায়ে বলেন, এটা বিবেচনার বিষয় যে এরই মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বা তথ্য দুদককে সরবরাহ করেছে। দুদক অনুসন্ধান প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে।

আদালতের দেওয়া সাতটি পর্যবেক্ষণ হলো—(১) আপিল বিভাগের প্রশাসনিক ক্ষমতায় দেওয়া আলোচিত চিঠি দেওয়া যথাযথ হয়েছে কি না সে বিষয়ে জারি করা রুলের বিচার চলতে পারে। (২) এ চিঠি দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কিছু অপ্রাসঙ্গিক ও নিজ এখতিয়ারবহির্ভূত যুক্তি গ্রহণ করেছে, যা কর্তৃপক্ষকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। (৩) এ চিঠি আপিল বিভাগ তার প্রশাসনিক ক্ষমতায় দিয়েছে। এটা কোনোভাবেই সুপ্রিম কোর্টের মতামত হিসেবে বলার সুযোগ নেই। (৪) এ চিঠি জনগণের কাছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের মর্যাদা ও ভাবমূর্তিকে খর্ব করেছে। (৫) ওই চিঠি জনগণের মধ্যে বার্তা দিয়েছে যে সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ফৌজদারি বিচারের ক্ষেত্রে দায়মুক্ত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ছাড়া আর কেউ দায়মুক্তি পেতে পারে না। তবে রাষ্ট্রপতি শুধু তাঁর পদে বহাল থাকা অবস্থায় এ দায়মুক্তি পাবেন। (৬) সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে সাত বছর ধরে অনুসন্ধান কার্যক্রম সম্পন্ন করতে ব্যর্থতা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। (৭) ভবিষ্যতে সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারকের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান বা তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থা বা কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই বিশেষ নজর রাখতে হবে, যাতে অকারণে তাঁদের মর্যাদাহানি না ঘটে বা হয়রানির শিকার না হন। মনে রাখতে হবে, এর সঙ্গে বিচার বিভাগের মর্যাদা ও গৌরব জড়িত।   

বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে জানা আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। এ কারণে তাঁর বিষয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেয়ে গত ২ মার্চ সুপ্রিম কোর্টকে চিঠি দেয় দুদক। এর জবাবে তদন্ত না করতে গত ২৮ মার্চ দুদককে পাল্টা চিঠি দেয় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন।

ওই চিঠি নিয়ে জাতীয় সংসদেও আলোচনা হয়। কয়েক দিন আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সরকার সমর্থক আইনজীবীরাও প্রতিক্রিয়া জানানোর পর গত ৩১ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিষয়ে মোট ২৩ ফর্দ নথি দুদকের কাছে সরবরাহ করে। এরপর থেকে দুদক জোরেশোরেই অনুসন্ধান কার্যক্রম চালাচ্ছে।

এ অবস্থায় দুদককে দেওয়া চিঠি গত ৯ অক্টোবর আদালতের নজরে আনেন অ্যাডভোকেট বদিউজ্জামান তরফদার। ওই দিন শুনানি শেষে আদালত রুল জারি করেন।

বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীন ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। পরে ২০০৯ সালে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে অবসরে যান তিনি।


মন্তব্য