kalerkantho


রাজশাহীতে স্কুলে স্কুলে অতিরিক্ত ভর্তি ফির গ্যাঁড়াকলে পিষ্ট অভিভাবকরা

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আসাদুজ্জামান শামীম। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পিয়ন পদে চাকরি করেন। তাঁর এক ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে রাহাত শাহরিয়ার এবার অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হবে। আর ছোট মেয়ে রায়সাকে ভর্তি করানো হবে তৃতীয় শ্রেণিতে। কিন্তু দুই ছেলে-মেয়ের ভর্তি করাতে তাঁকে গুনতে হবে প্রায় সাড়ে আট হাজার টাকা। এরপর রয়েছে স্কুলের পোশাক থেকে শুরু করে নতুন বছরের জন্য আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র কেনা। সঙ্গে নোট বই তো আছেই। সব মিলিয়ে পিয়ন পদে চাকরি করা শামীমকে বছরের শুরুতেই দুই ছেলে-মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করানো ও আনুষঙ্গিক খরচের জন্য অন্তত ১৫ হাজার টাকা সংগ্রহ করতে হবে। অথচ তিনি যে বেতন পান তাতে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে। উপায়ান্তর না দেখে এরই মধ্যে হাজার দশেক টাকা ধারও করেছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু আসাদুজ্জামান শামীমই নন, তাঁর মতো রাজশাহী নগরীতে বসবাসকারী নিম্ন আয়ের মানুষেরা চলতি নতুন বছরে তাঁদের ছেলে-মেয়েদের স্কুলে ভর্তি করাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। বলা যায়, রাজশাহী নগরীর বেসরকারি স্কুলগুলোর ভর্তি ফির গ্যাঁড়াকলে পিষ্ট হচ্ছেন এসব পরিবারের অভিভাবকরা।

অন্যদিকে সরকারি ঘোষণার পরও রাজশাহীর দুটি মডেল স্কুলেও আদায় করা হচ্ছে অতিরিক্ত ভর্তি ফি। দুটি স্কুলে নগরীর অন্যান্য স্কুলের চেয়ে ভর্তি ফি আদায় করা হচ্ছে ব্যাপক হারে। এর মধ্যে নতুন শিক্ষার্থীদের ভর্তি করাতে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও রাজশাহী মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে আদায় করা হচ্ছে ১১ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। পুরনোদের ক্ষেত্রেও পাঁচ হাজার টাকার নিচে ভর্তি করানো হচ্ছে না। নগরীর এই স্কুলগুলোতে ভর্তি বাণিজ্য নিয়ে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে নিম্ন ও মধ্য আয়ের অভিভাবকদের। কিন্তু তার পরও ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে নীরবে এ অন্যায় সহ্য করে যাচ্ছেন মা-বাবারা। নানা কষ্টে বা ধার-দেনা করে ছেলে-মেয়েদের স্কুলে ভর্তি করানোর অর্থ সংগ্রহ করছেন অভিভাবকরা।

আসাদুজ্জামান শামীম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যে টাকা বেতন পাই তা দিয়ে তো সংসার চালানোই যায় না। তার ওপর স্কুলগুলোতে হাজার হাজার টাকা অতিরিক্ত ভর্তি ফি আদায়ের কারণে বছরের শুরুতেই দেনার মধ্যে পড়ে যেতে হচ্ছে। কিন্তু উপায় তো নাই। ছেলে-মেয়ে পড়াতে হলে ভর্তি ফি দিতেই হবে। না হলে ভর্তি করানোও যাবে না কোথাও।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড মডেল স্কুলটি সম্প্রতি সরকারি করা হয়। কিন্তু সরকারি ঘোষণার পরপরই বছর শুরু না হতেই ওই স্কুলের অধ্যক্ষ অন্তত ৭০ জন শিক্ষার্থীকে গোপনে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে ভর্তি করানোর ব্যবস্থা করেন। একেকজন শিক্ষার্থীর অভিভাবকের কাছ থেকে ২০-৩০ হাজার টাকা করে আদায় করে ৩১ গত নভেম্বর ওইসব শিক্ষার্থীকে ভর্তি করানোর বন্দোবস্ত করা হয়। এখন নতুন বছরের ভর্তি শুরু হওয়ার পরও এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে নতুন শিক্ষার্থীদের ভর্তি বাবদ আদায় করা হচ্ছে ১১ হাজার ৫৬৫ টাকা করে। দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত এখানে শিক্ষার্থী ভর্তি চলছে। আবার পুরনো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাঁচ থেকে শুরু করে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে বিভিন্ন অজুহাতে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ তায়েফুর রহমানকে গতকাল বারবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

রাজশাহী মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজও সরকারি ঘোষণা করা হয় একই সঙ্গে। সরকারি ঘোষণা হওয়ার পর এই প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ভর্তি শুরু হওয়ার আগেই শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর নামে হাজার হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ ওঠে। এখনো একইভাবে নতুন ও পুরনো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভর্তি ফি আদায় করা হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিতে।

এই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বাবা অভিযোগ করে বলেন, তিনি ছোট একটি ব্যবসা করে ছেলে-মেয়ে পড়াশোনা করাচ্ছেন। এরই মধ্যে স্কুল থেকে ভর্তি ফির জন্য ছয় হাজার টাকা ধার্য করা হয়েছে। ফলে ছেলেকে ভর্তি করাতে গিয়ে তিনি হিমশিম খাচ্ছেন।

তবে সরকারি ঘোষণা হলেও এখনো কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় আগের নিয়মেই ভর্তি ফি আদায় করা হচ্ছে বলে দাবি করেন এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাবিবুর রহমান। তবে ভর্তি নিয়ে কোনো বাড়তি অর্থ আদায় ও অগ্রিম শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর কথা অস্বীকার করেন তিনি।

রাজশাহী নগরীর নজমুল হক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কাশেম জানান, তাঁর বিদ্যালয়ে এবার প্রথম থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তি ফি আদায় করা হচ্ছে দুই হাজার ৪৮০ থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। তবে পুরনোদের ক্ষেত্রে আদায় করা হচ্ছে এক হাজার ৬০০ টাকা করে। স্কুলের নানা খাতে অর্থ ব্যয়সহ এই অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

এর বাইরে রাজশাহীর মসজিদ মিশন একাডেমি, রিভার ভিউ উচ্চ বিদ্যালয়, রাজশাহী মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়, লোকনাথ স্কুল, রাজশাহী গার্লস স্কুল, লক্ষ্মীপুর গার্লস স্কুলসহ প্রত্যেকটি বিদ্যালয়েই শিক্ষার্থী ভর্তিতে বাড়তি বা অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা সর্বশেষ (গত বছরের) পরিপত্র অনুযায়ী, মফস্বল এলাকায়, জেলা শহর বা অন্যান্য মেট্রোপলিটন এলাকায় (ঢাকা নগরী বাদে) বেসরকারি স্কুল, স্কুল অ্যান্ড কলেজে মাধ্যমিক/নিম্ন মাধ্যমিক ও সংযুক্তি প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থী ভর্তি নীতিমালা অনুযায়ী ভর্তি ফি ও সেশন চার্জসহ ৫০০ থেকে শুরু করে সর্বসাকুল্যে তিন হাজার টাকা আদায় করা যাবে। রাজশাহী মহানগরী হওয়ায় সে ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা যাবে। কিন্তু এখানকার স্কুলগুলোতে সেই নীতিমালা লঙ্ঘন করে ইচ্ছামতো অর্থ আদায় করা হচ্ছে। অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হলে সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. শরমিন ফেরদৌস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা কোনো স্কুলের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ পেলেই সে স্কুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’

 


মন্তব্য