kalerkantho


মূল হোতা টিটুর ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি

ভুয়া ওয়েবসাইট খুলে জালিয়াতির কথা স্বীকার

এস এম আজাদ   

১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ভুয়া ওয়েবসাইট খুলে জালিয়াতির কথা স্বীকার

সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাব এলাকায় ঘুরে বেড়াত তিনজনের একটি দল। তাঁদের একজন নারী আর দুজন পুরুষ। দলের প্রধান লম্বা চুলের ‘আধ্যাতিক সাংবাদিক’ রেজাউল ইসলাম টিটু কখনো সাজতেন বাউল শিল্পী, আবার কখনো মাইজভাণ্ডারীর পীরের মুরিদ। টিটুর সহযোগীরা হলেন ফয়েজ আহম্মেদ ও সুমী। মূলত বেকার তরুণদের টার্গেট করে তাঁরা সম্পর্ক গড়তেন। এরপর ওপর মহলে তাঁদের সম্পর্ক থাকার কথা জানিয়ে সরকারি ব্যাংকে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিতেন। এরপর প্রতি চাকরিপ্রত্যাশীর কাছ থেকে দুই থেকে ১০ লাখ টাকা নিয়ে বাসা ও অফিস বদল করে সটকে পড়তেন তাঁরা। এই প্রতারণার মূল হাতিয়ার সরকারি ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানের নামে খোলা ছয়টি ভুয়া ওয়েবসাইট। আইটি প্রকৌশলী মাহমুদুল হক মিঠুনের মাধ্যমে তৈরি করা ওয়েবসাইটগুলোতে নিয়োগের ভুয়া তালিকা প্রকাশ করে বিভ্রান্ত করা হতো চাকরিপ্রার্থীদের। ফেসবুকে টিটুর রয়েছে ছয়টি আইডি, বাসার ঠিকানাও ছয়টি। রয়েছে অনেক মোবাইল ফোন নম্বর।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এই জালিয়াতচক্রটি শনাক্ত করেছে। মিঠুনকে গ্রেপ্তার করার পর তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত শুক্রবার রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে চক্রের হোতা টিটুকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। রিমান্ড শেষে গতকাল রবিবার ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন টিটু। ফয়েজ ও সুমী এখনো পলাতক। জবানবন্দিতে টিটু দাবি করেন, সহজেই কোটিপতি হওয়ার আশায় গত এক বছর ধরে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছিলেন তিনি। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ভুয়া ওয়েবসাইটের মাধ্যমে চাকরি দেওয়ার কথা বলে তাঁরা অনেক মানুষকে প্রতারিত করেছেন।

সিআইডির কর্মকর্তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত সাত-আটজন ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে চারটি মামলা করার তথ্য পাওয়া গেছে। একটি প্রতারণার ঘটনায় গত ফেব্রুয়ারি মাসে টিটু, ফয়েজ ও সুমী র‍্যাবের হাতে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। এরপর জামিনে ছাড়া পেয়ে আবার জালিয়াতি শুরু করেন।

সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল কাহার আকন্দ কালের কণ্ঠকে বলেন, সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে চক্রটি প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতারণা করছিল। এই চক্রের হোতা ধরা পড়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তার করার চেষ্টা চলছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, সিআইডির এসআই কামাল হোসেন জানান, ভুয়া ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নিয়োগের নামে জালিয়াতির ঘটনায় সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ মতিঝিল থানায় দুটি মামলা করে। ওই মামলার তদন্তভার পাওয়ার পর সিআইডি সরকারি ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া ওয়েবসাইটচক্রটি শনাক্ত করে। গত ২০ নভেম্বর রাজধানীর রায়েরবাজার থেকে কম্পিউটার প্রকৌশলী মিঠুনকে গ্রেপ্তার করার পর হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। দেখা যায়, সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের ওয়েবসাইটের গভ-এর স্থানে ইনফো দিয়ে, অর্থাৎ ‘সোনালী ব্যাংক ইনফো ডটকম’ নামে সাইট তৈরি করেন মিঠুন। একইভাবে ইনফো যোগ করে অগ্রণী, রূপালী, জনতা ও পুবালী ব্যাংকের ওয়েবসাইটও বানান তিনি। আর বাংলাদেশ আর্মির স্থানে ‘বিডি আর্মি’ লিখেও একটি ভুয়া সাইট বানানো হয়। এসব সাইটে ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, চাকরিপ্রার্থীদের তালিকা এবং নির্বাচিত প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করে প্রতারণা করা হতো। ওই তালিকা দেখেই টিটু ও তাঁর সহযোগীদের হাতে তিন থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত তুলে দিয়েছেন অনেকে।

কামাল হোসেন আরো জানান, মিঠুনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত শুক্রবার রায়েরবাজার থেকে গ্রেপ্তার করা হয় টিটুকে। পরে আদালতের নির্দেশে তাঁকে এক দিনের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রিমান্ড শেষে গতকাল ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন টিটু। এসআই কামাল বলেন, ‘মূল হোতা টিটু একই অনলাইন টিভি চালু করে সাংবাদিক পরিচয়ে এসব প্রতারণা করছিলেন। এখন পর্যন্ত চারটি মামলা পাওয়া গেছে। প্রতারিতরা অনেকেই হয়তো তার হদিস পায়নি। জানাজানি হলে আরো অভিযোগ পাওয়া যাবে।’ সিআইডি সূত্রে জানা যায়, টিটু তাঁর জবানবন্দিতে দাবি করেছেন, এক বছর ধরে তিনি প্রতারণা করছেন। অল্প পুঁজি ব্যবহার করে দ্রুত কোটিপতি হওয়ার জন্যই ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে নিয়োগের নামে প্রতারণা শুরু করেন টিটু। তিনি ওয়েবসাইট খুলে ‘এলটিভি’ নামে একটি অনলাইন টেলিভিশনও চালু করেন। ফয়েজ ও সুমীকে নিয়ে তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাব এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন। সেখানে বিভিন্ন কাজে আসা বেকার তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে তাঁরা সাংবাদিক পরিচয়ে সখ্য গড়ে তোলেন। এরপর চাকরি দেওয়ার কথা বলে প্রতারণা করেন। তাঁরা ভুয়া নিয়োগপত্র দেওয়ার পর যোগদানের আগের দিন পর্যন্ত কোনো একসময় চাকরিপ্রার্থীকে ফোন করে জানাতেন যে তারিখ পরিবর্তন করা হয়েছে। একটি ঘটনায় তাঁরা কাজটি করতে ভুলে যান। সে কারণেই ধরা পড়ে যান।

জানা যায়, টিটুর জন্ম হাজারীবাগ এলাকায়। তাঁর গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সাতরশিয়ায়। টিটুর দুই স্ত্রী, দুই ভাই ও মা  রয়েছেন। তাঁরা রায়েরবাজারের শেরেবাংলা রোডের ৭/সি মাকামে ইব্রাহীম এলাকায় থাকেন। তবে প্রতারণায় জড়ানোর পরই টিটু ভাসমান জীবন যাপন শুরু করেন।

সূত্র মতে, টিটু ও তাঁর সহযোগীরা বিলাসী জীবন যাপন করেন। ধরা পড়ার আশঙ্কায় তিন মাস পর পর বাসা পরিবর্তন করেন। সিআইডি তদন্তে নেমে টিটুর ছয়টি বাসার ঠিকানা পায়। ভুয়া মালিক সেজে একটি ফ্ল্যাট বিক্রির চেষ্টাও করেন টিটু। 

জানা গেছে, আসমা আক্তার নামে এক নারীকে অগ্রণী ব্যাংকে চাকরি দেওয়ার নাম করে ছয় লাখ টাকা হাতানোর অভিযোগে রাজধানীর শাহজাহানপুর থানায় মামলা হয়। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি টিটু, ফয়েজ ও সুমীকে গ্রেপ্তারও করেছিল র‍্যাব।


মন্তব্য