kalerkantho


মেধাবী সাধনার পাশে আদ-দ্বীন

ফখরে আলম, যশোর   

২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মেধাবী সাধনার পাশে আদ-দ্বীন

সাধনা বিশ্বাস

পড়ার একটি চেয়ারও নেই সাধনার। দুটির বেশি তিনটি জামা নেই। বাবা নেই, ভাইও নেই। সাধনার মনের মধ্যে আছে কেবল সাধনা। এই সাধনার কারণে কিষানি সাধনা সবজি ক্ষেত নিড়িয়ে, ধান কেটে, মাঠে কাজ করে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ পান। কিন্তু অভাবের মধ্যে যাঁর বসবাস, তিনি কিভাবে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হবেন; কে তাঁর এমবিবিএস পড়ার খরচ জোগাবে? এই চিন্তায় তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত কিষানি সাধনার চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। আর বিনা মূল্যে তাঁকে এই সুযোগ করে দিয়েছে খুলনার আদ-দ্বীন আকিজ মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ।

যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার বাকড়ি গ্রামে বাড়ি সাধনা বিশ্বাসের। বাবা লক্ষণ বিশ্বাস ২০১৫ সালে মারা গেছেন। মা উল্লাসী বিশ্বাস ছাড়া সাধনার কেউ নেই। সম্পদ বলতে কেবল অভাব। একটি কাঁচাঘর আর সামান্য ডোবা জমি রেখে বাবা মারা যান। নিরুপায় হয়ে মা উল্লাসী মাঠে দিনমজুরের কাজ শুরু করেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কাজ করে যে শ দেড়েক টাকা পান, তাই দিয়ে চলে সংসার। মেয়ের লেখাপড়ার খরচও চলে এর মধ্যে। নিজের সামান্য জমিতে সবজি, ধান চাষ করেন। মাকে সাহায্য করার জন্য সাধনাও নিড়ানি, কোদাল নিয়ে কৃষিকাজ শুরু করে। রাতারাতি পাকা কিষানি বনে যায়। এভাবেই সে কাজ করার পাশাপাশি হারিকেনের আলোয় রাত জেগে লেখাপড়া করে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পায়। জিপিএ ৫ পায় এসএসসি ও এইচএসসিতে। মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ২৬৪ মার্কস পেয়ে ৬৪৫৪ সিরিয়াল অর্জন করেন তিনি।

সরেজমিনে বাঘারপাড়া উপজেলা থেকে ১৮ কিলোমিটার দূর দুর্গম রাস্তা পেরিয়ে বাকড়ি বিলের পাশে সাধনাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সাধনা সবজি ক্ষেতে নিড়ানি দিচ্ছেন। তাঁর মা বিচলির গাদা দিচ্ছেন। সাধনা বললেন, ‘মায়ের সঙ্গে মাঠে কাজ করে হাঁস-মুরগি পুষে বই খাতা কিনেছি। রাত জেগে হারিকেনের আলোয় ভাঙা ঘরে বসে পড়েছি। আমার সাধনাই ছিল ডাক্তার হওয়ার। সুযোগ হলো। কিন্তু ডাক্তারি পড়ার খরচ কে দেবে? এই চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারিনি। আমার মা আদ-দ্বীন সমিতির সদস্য। সমিতির স্যারদের কাছে তিনি আমার কষ্টের কথা জানান। তাদের কথা মতো দরখাস্ত করি। আমাদের অবস্থা দেখে আমাকে আদ-দ্বীন আকিজ মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ দিয়েছে। আগামী ১০ জানুয়ারি থেকে ক্লাস শুরু হবে। পড়ার খরচ  ১৩ লাখ  ৯০ হাজার টাকার পাশাপাশি প্রতি মাসের খরচ আট হাজার টাকাও দিতে হবে না।’

সাধনা বলতে থাকেন, ‘এই সুযোগ পেয়ে আমি যারপরনাই খুশি হয়েছি। আমিও চিকিৎসক হয়ে অসহায় গরিব মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে এই দায় শোধ করব।’

সাধনার মা উল্লাসী বিশ্বাস বললেন, ‘মাঠে কাজ করে ১৫০ টাকা দিনে আয় করে তা দিয়ে সাধনার লেখাপড়ার খরচ চালিয়েছি। ওর খুব ইচ্ছা ডাক্তার হওয়ার। আদ-দ্বীন সেই আশা পূরণ করেছে। এ জন্য আদ-দ্বীনকে ধন্যবাদ জানাই। ভগবানকে স্মরণ করি।’

বাকড়ি বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক সুকুমার সরকার বললেন, ‘সাধনা খুবই মেধাবী। ওর স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে, এ জন্য আমরা সবাই খুশি।’

স্থানীয় জামদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আশিষ কুমার বললেন, ‘মেয়েটি খুবই গরিব। ওর বাবা নেই। ওকে সব ধরনের সহযোগিতা করা উচিত।’

উল্লেখ্য, সাধনার পাশাপাশি খুলনার রুপসা এলাকার হতদরিদ্র পারভীন বেগমের মেয়ে শারমিন আক্তার ও সাতক্ষীরার তালা এলাকার রিকশাচালক মহিউদ্দিনের ছেলে সাব্বির হোসেন ছাড়াও আরো কয়েকজন গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীকে আদ-দ্বীন কর্তৃপক্ষ বিনা মূল্যে মেডিক্যালে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

এ ব্যাপারে আদ-দ্বীনের নির্বাহী পরিচালক ড. শেখ মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমরা কঠিন দরিদ্রতা অতিক্রম করে লেখাপড়া শিখেছি। আমার মা গৃহস্থ বাড়ি ঢেঁকি পাড় দিয়ে আমাদের মুখে খুদের ভাত তুলে দিয়েছেন। আমরা এই স্মৃতি মনে রেখেছি। এ জন্য অসহায় গরিব শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন পূরণে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।’


মন্তব্য