kalerkantho


সংস্কৃতি

মতিউর দেশের প্রথম সারেঙ্গীবাদক

শেখ শাফায়াত হোসেন   

৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মতিউর দেশের প্রথম সারেঙ্গীবাদক

আকাশ সংস্কৃতির কল্যাণে বিদেশি সংগীত শোনার সুযোগ এখন অবারিত। নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা যারা সংগীতে ঝুঁকছে তাদের প্রায় সবাই ব্যান্ড, পপ, জ্যাজসংগীতে জড়িয়ে ব্যবহার করছে বিদেশি বাদ্যযন্ত্র। ফলে কমে যাচ্ছে দেশীয় কিংবা এই উপমহাদেশের বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার। সংগীতের এই ক্রান্তিকালে এক দল সংগীতপ্রেমী নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন কিভাবে ধরে রাখা যায় উপমহাদেশীয় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার। তাঁদেরই একজন সারেঙ্গীবাদক মতিউর রহমান। একসময় এই উপমহাদেশে প্রায় ৬০০ ধরনের বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার ছিল। ক্রমেই সেই বাদ্যযন্ত্রগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। জীবিকার প্রয়োজনে পেশা বদল করছেন অনেক যন্ত্রী। কণ্ঠশিল্পীদের কদর কিছুটা থাকলেও প্রধান প্রধান কয়েকটি বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে ছাড়া অন্য যন্ত্রীদের সেই কদরটুকুও আর নেই। এ অবস্থায় বাদ্যযন্ত্রের সুদিন ফেরাতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজন করেছে ১০ দিনের ‘জাতীয় যন্ত্রসংগীত উৎসব ২০১৮’। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ৬৩ জেলার এক হাজার ২০০ জন যন্ত্রশিল্পী অংশ নিয়েছেন এ উৎসবে। এই উৎসবেই এবার সারেঙ্গী বাজাচ্ছেন মতিউর রহমান। প্রায় ৫০০ বছর ধরে উত্তর ভারতীয় সংগীতে এই যন্ত্রটি ব্যবহৃত হয়ে এলেও বাংলাদেশের সংগীতে এর ব্যবহার নেই। বলা চলে, স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশে প্রথম এবং একমাত্র সারেঙ্গীবাদক মতিউর রহমান। গত সোমবার শিল্পকলা একাডেমিতে শুরু হওয়া যন্ত্রসংগীত উৎসবের পঞ্চম রাত আজ শুক্রবারের প্রধান আকর্ষণ মতিউরের সারেঙ্গী বাদন। গতকাল বৃহস্পতিবার উৎসবের চতুর্থ রাতে তবলাবাদকদের সঙ্গে সারেঙ্গীতে সংগত করেছেন তিনি।

মতিউরের জন্ম মানিকগঞ্জ জেলায়। সংগীতের প্রতি তাঁর ভালোবাসা আজন্ম। সেই ভালোবাসা থেকেই মাধ্যমিক পাস করার পর ভর্তি হন রাজধানীর আগারগাঁওয়ের সরকারি সংগীত মহাবিদ্যালয়ে। সেখানে অধ্যয়ন করেন কণ্ঠসংগীত বিষয়ে। উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে তবলা শিখতে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস স্কলারশিপ (আইসিসিআর) নিয়ে চলে যান গুজরাট। সেখানকার মহারাজ সায়াজিরাও ইউনিভার্সিটি অব বরোদায় অধ্যায়নকালে ২০০০ সালে সারেঙ্গীর সঙ্গে পরিচয় ঘটে তাঁর। এরপর সারেঙ্গীর তালিম নিতে শুরু করেন ওস্তাদ ফারুক লতিফ খানের কাছে।

তবলায় স্নাতক পাস করার পর ফিরে আসেন বাংলাদেশে। এরপর বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের স্কলারশিপ নিয়ে সারেঙ্গী শিখতে ওস্তাদ গোলাম সাবির খানের কাছে যান দিল্লিতে। সেই থেকে এই বাদ্যযন্ত্রটিকে সঙ্গী করে সংগীতসাধনায় নিমগ্ন মতিউর। বলে রাখা ভালো, মতিউর ওস্তাদ গোলাম সাবির খানের গণ্ডবাঁধা শিষ্য। ঘটা করে শিষ্যত্ব গ্রহণ করার রেওয়াজকে গণ্ডাবাঁধা শিষ্যত্ব বলে।

সারেঙ্গী শেখার পাশাপাশি মতিউর দিল্লির শ্রীরাম ভারতীয় কলাকেন্দ্রে সোনিয়া রায়ের কাছে কণ্ঠসংগীতের ওপর তালিম নেন। পরে বাংলাদেশে এসে সারেঙ্গীচর্চা অব্যাহত রেখে রাগ-রাগিণীর গায়কি অঙ্গের তালিম নিতে শুরু করেন পণ্ডিত সুনীল কুমার মণ্ডল ও সংগীতাচার্য রেজওয়ান আলী লাভলুর কাছে।

মতিউর বলেন, ‘শ্রদ্ধার সঙ্গেই বলতে হয়, বেশ কজন গুরুর কাছে আমি তালিম নিয়েছি। তাঁদের আশীর্বাদে সারেঙ্গী বাজিয়ে চলছি। সারেঙ্গীই আমার ধ্যানজ্ঞান।’

ভারত ও বাংলাদেশে বড় বড় ধ্রুপদি সংগীত উৎসবে সারেঙ্গী বাজিয়েছেন তরুণ এই যন্ত্রী। ভারতের পাঞ্জাবে পাতিয়ালা হেরিটেজ ফেস্টিভাল, ঢাকায় বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়জিত উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসব এর মধ্যে অন্যতম। একক বাদনের পাশাপাশি মতিউর রহমান ওস্তাদ ইয়াসিন খান, পণ্ডিত সুনীল কুমার মণ্ডল, পণ্ডিত অনিল কুমার সাহা, রেজওয়ান আলী লাভলু, মুনমুন আহাম্মেদ (কত্থক),  বিদ্যা সাহা (দিল্লি), সালমান আমজাদ আমানত আলী (পাকিস্তান) প্রমুখ ধ্রুপদি সংগীতশিল্পীর সঙ্গে সংগত করে সুখ্যাতি অর্জন  করেছেন।

মতিউর বাংলাদেশ বেতারের স্টাফ শিল্পী এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত যন্ত্রসংগীত শিল্পী। সরকারি সংগীত মহাবিদ্যালয়ের প্রভাষক সাইফুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশে মতিউরই প্রথম সারেঙ্গী বাজান। এর বাইরে কোনো শিল্পীকে আনুষ্ঠানিকভাবে সারেঙ্গী বাজাতে দেখা যায়নি।

সারেঙ্গী বাদ্যযন্ত্রটির নামকরণ করা হয়েছে ‘শ রঙ্গী’ বা ‘শতরঙ্গী’ শব্দ থেকে। মতিউর জানান, এই যন্ত্রটি শতরঙ্গে বাজানো যায় বলেই বোধ হয় এ ধরনের নামকরণ হয়েছে। যন্ত্রটিতে প্রধান তিনটি তার রয়েছে। আর তরপের তার রয়েছে ৩৬টি।

মতিউরের তিন বছর বয়সী যমজ দুটি সন্তান রয়েছে—বিসমিল্লাহ ও মেহবুব। বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী মতিউরের কাছে সারেঙ্গী শিখতে আসছে। তাদের মধ্যে কজন বিদেশি শিক্ষার্থীও রয়েছে।


মন্তব্য