kalerkantho


মাউশি অধিদপ্তর

শেষ কার্যদিবসে ৭৭ জনকে বদলির আদেশ ডিজির

বদলি সিন্ডিকেটে প্রশাসন শাখা!

শরীফুল আলম সুমন   

৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



কোনো দপ্তরপ্রধান সাধারণত নিজের শেষ কার্যদিবসে বদলির কোনো নথিতে সই করেন না। যুগ যুগ ধরে এই রেওয়াজ চলে আসছে। কিন্তু মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের বিদায়ী মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এস এম ওয়াহিদুজ্জামান তাঁর শেষ কার্যদিবসে সেই রেওয়াজ ভঙ্গ করেছেন। গত বৃহস্পতিবার ছিল তাঁর শেষ কার্যদিবস। ওই দিন তিনি ৭৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলির আদেশ অনুমোদন করেছেন। এ ছাড়া শেষ দিনে কেনাকাটারও বেশ কিছু নথি অনুমোদন করেছেন তিনি। এসব বদলি ও কেনাকাটার সঙ্গে অনৈতিক লেনদেন জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন অনেক কর্মকর্তা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এর আগে যেসব মহাপরিচালক চাকরি শেষ করেছেন, তাঁদের শেষ দিনে বদলির আদেশ দেওয়ার রেকর্ড নেই। এমনকি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যেসব সচিব এর আগে অবসরে গেছেন, তাঁরাও শেষ দিনে বদলি বা পদোন্নতির কোনো নথিতে সই করেননি।

জানা যায়, বদলির নথিতে যেদিন সই হয় সেদিনই তা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার যেসব বদলি হয়েছে, তা ওই দিন ওয়েবসাইটে প্রকাশ না করে গতকাল রবিবার দেওয়া হয়েছে। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনে অনৈতিক লেনদেনের সন্দেহ আরো গভীর হয়েছে।

মাউশি অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, মহাপরিচালকের শেষ কার্যদিবসে ২৯ জন কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছে। একই দিনে সরকারি কলেজের ২৫ জন শিক্ষক, আটজন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং ১৫ জন সহকারী শিক্ষকের বদলির আদেশ জারি করা হয়েছে। এর আগে ২৭ ডিসেম্বর ১৯ জন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, ২৬ ডিসেম্বর বিসিএস ক্যাডারের ১৯ কর্মকর্তা, ২২ ডিসেম্বর ৬৪ জন কর্মচারী, ২১ ডিসেম্বর বিসিএস ক্যাডারের ১৯ কর্মকর্তা, ১৪ ডিসেম্বর ১৭ জন কর্মচারী, ৭ ডিসেম্বর চার কর্মকর্তাসহ আরো বেশ কয়েকজনকে বদলি করা হয়। অর্থাৎ মহাপরিচালকের শেষ কর্মমাসেও তিন শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়, যা অন্যান্য মাসের তুলনায় রেকর্ড বলে জানিয়েছেন মাউশি অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বদলির আদেশে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার সদস্যদের অর্থাৎ সরকারি কলেজ শিক্ষকদের বদলি করে কলেজ শাখা। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলি করে মাধ্যমিক শাখা। আর মাউশি অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখা বদলি করে উপজেলা ও জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাসহ সব পর্যায়ের কর্মচারীদের। এই বদলিতেই মূলত ব্যাপক লেনদেন হয়।

জানা যায়, উপজেলা ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বদলির নথিতে সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মুহাম্মদ জাকির হোসেনের সই থাকলেও তিনি রুটিন ওয়ার্ক করেন। একটি সিন্ডিকেটের অধীনে এই বদলি হয়। এর পেছনে মূল কলকাঠি নাড়েন প্রশাসন শাখার উপপরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম সিদ্দিকি ও মহাপরিচালকের পিএ মাসুদ পারভেজ। একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর তিন বছর পর বদলি হওয়ার কথা থাকলেও তাঁরা দুজনই পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে এই দপ্তরে রয়েছেন। এ ছাড়া প্রশাসন শাখার কয়েকজন কর্মচারী এই সিন্ডিকেটে জড়িত। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বদলির সিন্ডিকেটের মূল হোতা মাধ্যমিক শাখার একজন উপপরিচালক ও একজন সহকারী পরিচালক। আর কলেজ শিক্ষকদের বদলির ক্ষেত্রে একজন সহকারী পরিচালকের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।

মহাপরিচালকের শেষ কার্যদিবসে বিপুলসংখ্যক বদলির বিষয়ে অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন) শফিকুল ইসলাম সিদ্দিকি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা রুটিন ওয়ার্ক। আর মহাপরিচালক চেয়েছেন তিনি বদলি করেছেন। এখানে আমাদের করার কিছুই নেই।’

অধিদপ্তরের পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক মো. আবদুল মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা মহাপরিচালককে বলেছিলাম, তাঁর শেষ দিনে যেন তিনি বদলির আদেশে স্বাক্ষর না করেন। এতে সমালোচনা হতে পারে। কিন্তু এর পরও এত বদলি কিভাবে হলো, তা বলতে পারব না। তবে এটা একেবারেই শেষ সময়ে হয়েছে।’

অভিযোগ রয়েছে, মাউশির প্রশাসন শাখার কিছু কর্মকর্তা গত শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও অফিস করেছেন। অনেক কর্মচারীর বদলির ফাইল বৃহস্পতিবারের তারিখ দিয়ে আসলে গত শনিবার সই হয়েছে। তাই গত বৃহস্পতিবার তা ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়নি।

উপজেলা ও জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমপিওর ক্ষেত্রে ব্যাপক ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। তাই এসব পদে বদলির রেটও অনেক বেশি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এই দুই পদে বদলির ক্ষেত্রে দুই লাখ থেকে তিন লাখ টাকা লেনদেন হয়। এরপর কর্মচারী বদলিতেও এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। আর কর্মচারীরা যদি আঞ্চলিক শিক্ষা অফিসে বদলি হতে চান সে ক্ষেত্রে পাঁচ লাখ থেকে সাত লাখ টাকাও অনৈতিক লেনদেন হয়।


মন্তব্য