kalerkantho


হালদা নদীতে কমছে বিপন্ন ডলফিন

অভয়ারণ্য ঘোষণার দাবি গবেষকদের

শিমুল নজরুল, চট্টগ্রাম   

৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



হালদা নদীতে কমছে বিপন্ন ডলফিন

দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীতে একের পর এক মারা পড়ছে ডলফিন। গত তিন মাসে এখানে ১৫টি ডলফিন মরে ভেসে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, পানির স্তর নেমে যাওয়ায় নদীতে চলাচল করা যান্ত্রিক নৌকার প্রপেলারে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মারা যাচ্ছে ডলফিনগুলো। এ অবস্থায় বিপন্ন প্রজাতির ডলফিনগুলো রক্ষায় হালদা নদীকে ডলফিনের অভয়ারণ্য ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, শুক্রবার দুপুরে হাটহাজারী উপজেলার গড়দুয়ারা ইউনিয়নের গচ্ছাখালী খালে মাস্টারবাড়ির কালভার্টের নিচ থেকে একটি মৃত ডলফিন উদ্ধার করা হয়। এর আগে বুধবার দুপুরে একই ইউনিয়নের স্লুইস গেট এলাকায় আরেকটি মৃত ডলফিন পাওয়া হয়।

হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির কো-অর্ডিনেটর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত তিন মাসে হালদা নদীতে ১৫টি ডলফিন মরে ভেসে ওঠার তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে। বালু তোলার ড্রেজার বা যন্ত্রচালিত বড় নৌযানের প্রপেলারের আঘাতে ডলফিনগুলো মারা পড়ছে। তাই এ ব্যাপারে প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।’

হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির তথ্য মতে, উদ্ধার হওয়া মৃত ডলফিনগুলো অতি বিপন্ন প্রজাতির। মিঠা পানির এই প্রজাতির ডলফিনের সংখ্যা সারা বিশ্বে এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০টি। এর মধ্যে হালদা নদীতেই রয়েছে ২০০ থেকে ২৫০টির মতো। হাটহাজারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আজহারুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হালদায় মিঠা পানির প্রচুর ডলফিন রয়েছে। হঠাৎ করে নদীতে ডলফিন মারা যাওয়ার ঘটনায় মৎস্য অধিদপ্তর উদ্বিগ্ন। বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ডলফিনগুলো যান্ত্রিক নৌকার আঘাতে মারা যাচ্ছে। এর বাইরে রোগাক্রান্ত হয়ে ডলফিনগুলোর মৃত্যু হচ্ছে কি না, তাও পর্যবেক্ষণ করছি। তবে গবেষকদের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে আমাদের মতপার্থক্য রয়েছে। এত ডলফিন মারা গেলে আমরাও খবর পেতাম।’ তিনি জানান, হালদা নদীসংলগ্ন উপজেলাগুলোর স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপের ফলে দীর্ঘদিন ধরে হালদায় ড্রেজিং বন্ধ রয়েছে।

অবশ্য রবিবার হালদা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে গিয়ে দেখা গেছে, নদীতে বালুবোঝাই অসংখ্য যান্ত্রিক নৌকা চলাচল করছে। নৌকাগুলো নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে বালু খালাস করছে।

হাটহাজারী-রাঙামাটি সড়কের হালদা ব্রিজসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা রেজাউল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, বালুবোঝাই এসব নৌযানের কারণে প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রখ্যাত হালদায় মাছ কমে গেছে। সেই সঙ্গে যান্ত্রিক নৌকার প্রপেলারে আঘাত পেয়ে মারা পড়ছে ডলফিন। এ ব্যাপারে প্রশাসনের আরো কঠোর হওয়া উচিত। গড়দুয়ারা ইউনিয়নের গচ্ছাখালী খালের মাস্টারবাড়ি এলাকার তামিম জানান, গত শুক্রবার উদ্ধার হওয়া মৃত ডলফিনের গায়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল। সাত ফুট লম্বা ডলফিনটির ওজন ছিল প্রায় ৮০ কেজি।

স্মৃতিচারণা করে একই এলাকার বাসিন্দা মুন্না বলেন, হালদায় আগে অনেক শুশুক (ডলফিনের স্থানীয় নাম) দেখা যেত। এখন আর সেভাবে সেগুলোর দেখা মেলে না। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও ওদের দেখা মেলে না। আবার জেলেদের জালেও আটকা পড়ছে শুশুক। নদীতে যান চলাচল বেড়ে যাওয়ায় মাছ ও শুশুক দুই-ই কমে গেছে।

ড. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, ‘অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন, যান্ত্রিক নৌকা চলাচল এবং স্লুইস গেটের মাধ্যমে নদী ও শাখা খালে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করায় হালদা নদীতে ডলফিন কমে গেছে। আমরা (হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরি) ছয় মাস ধরে হালদার ডলফিন নিয়ে গবেষণা করছি। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হালদা নদী ও শাখা খালগুলোতে গত তিন মাসে প্রায় ১৫টি ডলফিন মারা গেছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক। তাই আমরা প্রশাসনের কাছে হালদা নদী রক্ষার তাগিদসহ এই নদীকে ডলফিনের অভয়ারণ্য ঘোষণার দাবি জানাই।’ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তারা জানান, হালদা নদী ও বিভিন্ন শাখা খালে (রাউজান-হাটহাজারী এলাকায়) মোট ২২টি স্লুইস গেট রয়েছে।


মন্তব্য