kalerkantho


ইয়াবা সেবন করতে গিয়ে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার রিমন খুন!

রেজোয়ান বিশ্বাস   

৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ইয়াবা সেবন করতে গিয়ে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার রফিকুল হাসান রিমন খুন হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আর এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত রয়েছে অন্তত পাঁচজন। ১৮ দিনের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এসব তথ্য। পুলিশ এরই মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। বর্তমানে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ।

মামলার তদারক কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার মো. শহিদুল্লাহ গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে জানান, ইয়াবা সেবন করতে গিয়েই খুন হন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার রফিকুল হাসান রিমন। এ ঘটনায় জড়িত বাহারকে গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। হত্যার ঘটনায় জড়িত আরো অন্তত চারজনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

থানা ও গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ ডিসেম্বর ছোট বোন লিজার উত্তরার বাসা থেকে দুই সন্তানকে নিয়ে এলিফেন্ট রোডে সাবেক শ্বশুরালয়ে যান রফিকুল ইসলাম রিমন। স্ত্রীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব থাকায় বাসায় প্রবেশ না করে ছেলে রাফাত হাসান (১০) ও মেয়ে রাইসা হাসানকে (৪) বন্ধু রিপনের মাধ্যমে স্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেন। পরে রিপনের সঙ্গে এলিফেন্ট রোডের মালঞ্চ রেস্টুরেন্টে নাশতা করেন। সেখান থেকে নিউ মার্কেটের উদ্দেশে রওনা করেন। এর পর থেকে নিখোঁজ রিমন। কোথাও খোঁজ না পেয়ে তাঁর বাবা খলিলউল্লাহ নিউ মার্কেট থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। ১৭ ডিসেম্বর রাত পৌনে ১২টার দিকে শুক্রাবাদে নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবনের নিচতলা থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। লাশ শনাক্ত করেন রিমনের বন্ধু জসিম উদ্দিন। এ ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয় সাজেদুল করিম রনি নামের একজনকে। তিনি রিমনের দূর সম্পর্কের আত্মীয়।

পরে নিউ মার্কেট থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন রিমনের বাবা খলিলউল্লাহ। মামলার একমাত্র এজাহারভুক্ত আসামি রনি। এ ছাড়া সন্দেহভাজন আরো কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।

ঘটনার সাত দিন পর বাহার নামের আরো একজনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে সে জানিয়েছে, ঘটনার সময় সে নিজেও ইয়াবা সেবন করছিল। ওই ভবন থেকে নিচে পড়ে মারা যান রিমন। তাদের মধ্যে কেউ রিমনকে ফেলে দিয়ে হত্যা করেছে কি না তা তার জানা নেই। বাহার জানায়, রিমনসহ তারা চার-পাঁচজন শুক্রাবাদে নির্মাণাধীন ওই ভবনে নিয়মিত ইয়াবা সেবন করত। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় তারা ওই ভবনের সাততলায় ইয়াবার আসর বসায়। সেখানে তারা মধ্যরাত পর্যন্ত ছিল। জায়গাটিতে বিদ্যুতের আলো ছিল না। সিঁড়ি ছিল অন্ধকার। ইয়াবা সেবনের একপর্যায়ে নিচে পড়ে যান রিমন। এরপর তারা সবাই পালিয়ে যায়।

তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা জানান, রিমন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে গেলে কেউ তাঁকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দিয়ে হত্যা করেছে বলেই মনে হচ্ছে। এতে রিমনের পূর্বপরিচিত মাদকসেবী বন্ধুরাই জড়িত। তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হতে পারে। কারণ রিমনের সঙ্গে ফ্ল্যাট নিয়ে রনির দ্বন্দ্ব চলছিল। রনির পরিকল্পনায় ওই ভবনে ডেকে নিয়ে ইয়াবা সেবন করিয়ে রিমনকে হত্যা করা হতে পারে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট অন্য এক পুলিশ কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, ওই ভবনে মাদকসেবীরা নিয়মিত ইয়াবা সেবন করত। রাত হলেই একাধিক গ্রুপ ওই ভবনে জড়ো হতো। স্থানীয় বখাটেরা ওই ভবনে প্রবেশ করে নিরাপত্তাকর্মীদের মারধর করে ইয়াবা সেবন করত।

রফিকুল হাসান রিমন দুই মাস আগে দেশে ফেরেন। বিজয় দিবসের দিন দুই সন্তানকে নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। জানা যায়, ২০১৫ সালে রিমন আগারগাঁওয়ে দুটি ফ্ল্যাট কেনেন। এর মধ্যে একটিতে রনিকে থাকতে দেন। আগে রনির সঙ্গে রিমনের ভালো সম্পর্ক ছিল। এরই মধ্যে রনি গ্রেপ্তার হয়ে অনেক দিন কারাগারে ছিল। ফলে সে বেকার হয়ে পড়ে। এরপর রনি কৌশলে নকল দলিল বানিয়ে ওই ফ্ল্যাটের মালিকানা দাবি করে। এ নিয়ে বিরোধ শুরু হলে রিমনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে রনি।

রিমনের স্ত্রী কানিজ ফাতেমা জানান, রিমনের ফ্ল্যাট দখল করে রেখেছিল রনি। ওই ফ্ল্যাট নিয়েই হয়তো রনি ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী দিয়ে রিমনকে হত্যা করেছে।

রিমন হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে সাজেদুল করিম রনিকেই সন্দেহ করছে পুলিশ ও পরিবারের সদস্যরা।

তবে রনির স্ত্রী মমতাজ ময়না দাবি করেছেন, যে ফ্ল্যাট নিয়ে দ্বন্দ্বের কথা বলা হচ্ছে, সেই ফ্ল্যাট রিমনের কাছ থেকে রনি কিনে নিয়েছে। তাঁর স্বামী ছাত্রদলের রাজনীতি করে। তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল রাজনৈতিক কারণে।

নিউ মার্কেট থানার ওসি আতিকুর রহমান বলেন, মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তরের আগে তাঁরা তদন্ত করতে গিয়ে জানতে পারেন, আগারগাঁওয়ের একটি ফ্ল্যাট নিয়ে রনির সঙ্গে রিমনের দ্বন্দ্ব ছিল। এ কারণে রিমন হত্যাকাণ্ডে রনিকে সন্দেহ করা হয়। মাদক সেবন করতে গিয়েই রিমনের মৃত্যু হয়। তবে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে, নাকি সিঁড়ি থেকে পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে তা নিয়ে অধিকতর তদন্ত চলছে।


মন্তব্য