kalerkantho


বাসাবাড়িতে ময়লা জমে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে

‘আগে বাড়ির ময়লা সরান, পরে আইসা ভোট চান’

হায়দার আলী   

১৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০




বাসাবাড়িতে ময়লা

জমে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে

রাজধানীর শ্যামপুর এলাকার বেহাল রাস্তা। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নবগঠিত ৫২, ৫৩ ও ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের দুই লাখের বেশি মানুষ নতুন বিড়ম্বনায় পড়েছে। প্রতিদিন সকালে ভ্যানগাড়িতে করে গৃহস্থালি বর্জ্য বা ময়লা নিয়ে যাওয়া হলেও গত রবিবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তিনটি ওয়ার্ডের কোনো বাড়ি থেকেই ময়লা নেওয়া হয়নি। এতে প্রতিটি বাড়িতে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। নিরুপায় হয়ে অনেকেই চুপিসারে আশপাশের রাস্তার ধারে ফেলে আসে ময়লা। এতে এলাকার পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে। ডিএনসিসির নিয়ন্ত্রণাধীন ডাস্টবিনগুলোতে ময়লা ফেলতে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ফলে ঘরের ময়লা কবে সরবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে রাজধানীর উত্তরা এলাকার এই তিনটি ওয়ার্ডের বাসিন্দারা। আর বাড়ির ময়লা সরাতে না পারায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাসের বিল চাইতে পারছে না স্থানীয় বর্জ্য অপসারণকর্মীরা।

অভিযোগ উঠেছে, ডিএনসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আগে ভ্যানগাড়িপ্রতি তিন হাজার টাকা করে নিতেন। কিন্তু গত কয়েক মাস টাকা না দিয়েই সংশ্লিষ্ট কর্মীরা ময়লা ফেলে আসছিল ডাস্টবিনে। বর্জ্য অপসারণ কাজে নিয়োজিত স্থানীয় কয়েকজন উদ্যোক্তা জানান, আবারও ভ্যানগাড়িপ্রতি তিন হাজার টাকা দিলেই ডাস্টবিনে ময়লা ফেলতে দেওয়া হবে বলে তাঁরা আভাস পেয়েছেন।

ঢাকার দুই সিটি সংলগ্ন বেশ কয়েকটি ইউনিয়নকে ৩৬টি ওয়ার্ডে ভাগ করে কয়েক মাস আগে প্রতি সিটি করপোরেশনে ১৮টি করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ওই প্রক্রিয়ায় বৃহত্তর উত্তরা এলাকার হরিরামপুর ইউনিয়নকে তিনটি ওয়ার্ডে বিভক্ত করে যুক্ত করা হয়েছে ডিএনসিসিতে।

আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি ডিএনসিসির মেয়র পদে উপনির্বাচনের পাশাপাশি নতুন যুক্ত হওয়া ওয়ার্ডগুলোতে কাউন্সিলর পদেও ভোট হবে। ওই নির্বাচন সামনে রেখে কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা সাধারণ ভোটারদের কাছে যেতে শুরু করেছেন। কিন্তু গত রবিবার থেকে উত্তরার ৫২, ৫৩ ও ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডে জনসংযোগে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন কাউন্সিলর পদে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। ডিএনসিসির ওই তিন ওয়ার্ডের বাসিন্দারা বাসাবাড়িতে জমে থাকা বর্জ্য সরাতে উদ্যোগ নিতে বলছে ওই মনোনয়নপ্রত্যাশীদের।

গত রবিবার বিকেলে ওই এলাকায় গেলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, ওই দিন ময়লা নিতে ভ্যানগাড়ি নিয়ে কর্মীরা যায়নি। এতে ময়লা পচে বাড়িতে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কামারপাড়া এলাকার মোহসীন আলী বলেন, ‘আমরা ঢাকা শহরের বাইরের মানুষ। সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছি আমরা। এলাকায় নির্বাচন সামনে। মানুষ ভোট চাচ্ছে। কিন্তু এখন ময়লা পরিষ্কার করবে না। কাউন্সিলর প্রার্থীদের বিষয়টি আমরা জানিয়েছি। কিন্তু তারা দেখবে বলে আশ্বাস দিয়ে গেলেও কোনো সমাধান দেখছি না।’ একই রকম কথা বলেন স্থানীয় বেলায়েত হোসেন ও সিরাজুল ইসলাম। রাজাবাড়ীর আনিসুর রহমান বলেন, ‘সারা দিনের ময়লা না নেওয়ায় বাড়িতে পচা দুর্গন্ধ ছুটে গেছে। তাই নিজেই রাস্তার এক পাশে ময়লা ফেলে এসেছি।’ কামারপাড়ার ডা. আশ্রাব আলী বলেন, ‘ময়লা ফেলতে দেবে না; কিন্তু কর ঠিকই নেবে। আবার নেতারা ভোটও চাইতে আসছে। আমরা কোন দেশে আছি?’

তিনটি ওয়ার্ডের গৃহস্থালি বর্জ্য অপসারণ কাজের উদ্যোক্তা মো. শহিদ হোসেন বলেন, ‘শনিবার ৩৫টির বেশি ভ্যানগাড়ি নিয়ে ডাস্টবিনের সামনে রাত ১০টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও ময়লা ফেলতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত গভীর রাতে বাধ্য হয়ে বেড়িবাঁধের এক পাশে খোলা জায়গায় ময়লা ফেলে এসেছি, সেটাও চোরের মতো লুকিয়ে। কারণ ওই এলাকার মানুষ দেখলে পিটুনি খাওয়ার ভয় ছিল।’ শহিদ বলেন, ‘রবিবার তিনটি ওয়ার্ডের কোনো বাড়ি থেকে ময়লা আনতে যাওয়া হয়নি। কারণ ময়লা এনে ফেলব কোথায়? ডাস্টবিনে তালা মেরে রেখেছে ডিএনসিসির কর্মকর্তারা।’

আরেকজন উদ্যোক্তা বলেন, ‘ময়লা পরিষ্কার করে মাস শেষে বিল তুলি। কিন্তু আজ ৭ তারিখ চলছে, এলাকায় বিলের জন্য যেতে পারছি না। মানুষ ফোন করে ময়লা নেওয়ার জন্য বলতেছে। কিন্তু কোথায় ময়লা ফেলব সেটা ভেবে ময়লা আনছি না। অনেকেই গালাগালও করছে।’

বর্জ্য অপসারণ কাজের উদ্যোক্তা মো. নাগর আলী বলেন, ‘পাঁচটি ভ্যানে ময়লা পরিষ্কার করি। সব কটিই এখন বন্ধ আছে। হরিরামপুরের তিনটি ওয়ার্ডসহ আজমপুরের বেশ কয়েকটি এলাকার ময়লা ফেলতে দিচ্ছে না ডিএনসিসির লোকেরা। ময়লা বাসাবাড়িতে জমে দুর্গন্ধ আসায় আমাদের ওপর চড়াও হচ্ছে লোকজন।’ তিনি আরো বলেন, ‘নতুন করে কিভাবে ময়লা ফেলব? আগের দিনের ময়লা রাতের বেলায় ইস্ট ওয়েস্ট মেডিক্যাল কলেজের সামনে বেড়িবাঁধে ফেলে এসেছি। ডাস্টবিনে ময়লা ফেলতে না দিলে আমরাও এলাকার ময়লা আনব না। রাজাবাড়ী, কামারপাড়া, নইনছায়া, বাটুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত মানুষ ফোন দিয়েছে ময়লা আনার জন্য। সকাল থেকে কিছু ফোন ধরেছি। শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে আর ফোন ধরছি না।’

ভ্যানচালক ময়নাল হোসেন ও হাত কাটা রহিম ভ্যান নিয়ে এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে ময়লা সংগ্রহ করে ডাস্টবিনে নিয়ে ফেলেন। দুজনই সকাল থেকে এলাকায় যাননি। ময়নাল বলেন, ‘মানুষের ভয়ে এলাকায় যাই না। ময়লার জন্য মানুষ ফোন দেয়। কিন্তু ময়লা আইন্যা কই ফেলামু?’

৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও তুরাগ থানা ওষুধ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাবেক সভাপতি মো. আক্তারুজ্জামান চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্কুলের মোড়ে ময়লা জমলে সকালেই পরিষ্কার করে নিত। এখন ময়লা না নেওয়ায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। কোনো ময়লার গাড়ি দেখতে পাই না। পত্রিকায় দেখলাম, ডাস্টবিনে নাকি ময়লা ফেলতে দেয় না।’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এটা কোন নিয়ম হলো, ডিএনসিসির গেজেটভুক্ত হওয়ার পরও কেন ডিএনসিসি দায়িত্ব নেবে না!’ আরেক ব্যবসায়ী ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘ময়লা কি এখন ডিএনসিসির কর্মকর্তাদের কার্যালয়ে নিয়ে ফেলে আসব?’

সদ্য বিলুপ্ত হরিরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুর রাজ্জাক ডিএনসিসির নতুন ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হতে চান। তাঁর ছেলে হরিরামপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. এরশাদ মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিটি বাড়িতে এখন ময়লা জমে আছে। সকালে ভোট চাইতে গেলে ভোটাররা বলেন, আগে ময়লা সরানোর ব্যবস্থা করেন, পরে আইসা ভোট চান।’ তিনি জানান, ডাস্টবিনে ময়লা ফেলতে না দেওয়ায় অনেকেই অলিগলিতে বর্জ্য ফেলছে।

একই ওয়ার্ডের আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী সাবেক ২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাবেদ আলী বলেন, ‘এত দিন এলাকা থেকে ময়লা নিয়ে যেখানে ফেলত, এখন সেখানে ফেলতে দিচ্ছে না। এতে এলাকার মানুষ ময়লা নিয়ে বিপাকে আছে। ভোট চাইতে গেলে মানুষ দোয়া করবে কী বলে, আগে ময়লা সরানোর ব্যবস্থা করেন।’ ওই ওয়ার্ডের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. শাহজালাল বলেন, ‘প্রতিদিন ভোট চাই বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে। রবিবার দুপুরে রাজাবাড়ী, কামারপাড়া ও ধউর এলাকায় ভোট চাইতে গেলে মানুষ আমাকে বলে, আগে ময়লা পরিষ্কার করান, তারপর ভোট চান।’


মন্তব্য