kalerkantho


নাব্যতা সংকটে তিস্তা খেয়াঘাট বন্ধ, দুর্ভোগ

স্বপন চৌধুরী, রংপুর    

১৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নাব্যতা সংকটে তিস্তা খেয়াঘাট বন্ধ, দুর্ভোগ

মৌসুমের শুরুতে তিস্তায় পানি না থাকায় সংকটে বোরো চাষ। আর নদীতে নাব্যতা না থাকায় রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও কুড়িগ্রামের অর্ধশত খেয়াঘাট প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। কার্যত মাঝি-মাল্লাসহ খেয়াঘাট ইজারাদাররা হয়ে পড়েছেন কর্মহীন। সব কিছু মিলিয়ে তিস্তার কারণে রংপুর অঞ্চলের মানুষ চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন। হুমকির মুখে ব্যবসা-বাণিজ্য।

সূত্র জানায়, প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ খরস্রোতা তিস্তা সিকিম, দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর হয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারীর ভেতর দিয়ে ১১৫ কিলোমিটার অতিক্রম করে ব্রহ্মপুত্র নদে গিয়ে মিশেছে তিস্তা। বর্ষাকালে এ নদীর দুকূল উপচে সৃষ্ট বন্যা ও ভাঙনে লোকজন মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন। আর শুষ্ক মৌসুমে ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে তিস্তার বুকজুড়ে এখন জেগে উঠেছে ধু ধু বালুচর। এতে ছোট-বড় অর্ধশত খেয়াঘাট বন্ধসহ নৌ-যোগাযোগের ক্ষেত্রে মারাত্মক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে নৌ রুট হিসেবে চিহ্নিত ৩২টি বড় খেয়াঘাট প্রতিবছর ইজারা দেওয়া হয়।

সরেজমিন দেখা যায়, তিস্তায় পানি না থাকায় ঘাটগুলোতে চলছে না নৌকা। হেঁটে নদী পারাপার হচ্ছে লোকজন। শুধু তিস্তায় পানি না থাকার কারণে এই অঞ্চলের ধরলা, ঘাঘট, যমুনেশ্বরী, আখিরা, দুধকুমার, বুড়ি তিস্তাসহ প্রায় ৩৩টি ছোট বড় নদ-নদীর শাখা খালগুলো ভরাট হয়ে গেছে। এ অবস্থায় নদী পারাপারে এখন আর নৌকা লাগে না, হেঁটে পার হয় অধিকাংশ লোকজন।

বাপ-দাদার পেশা আঁকড়ে ধরেছিলেন মহিপুর এলাকার মাঝি এনামুল হক। তিনি বলেন, ‘হামরা মাঝি-মাল্লারা বেকার হয়া গেছি। হামার আর সংসারে চলে না।’ একই এলাকার দুলাল মিয়া, জয়নাল, মজিবর ঘাটিয়ালসহ মাঝিরা জানান, নদীতে পানি না থাকায় নৌকা চলে না। তাই তাঁরা এখন পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন। ভিন্ন কাজের সন্ধানে ছুটছেন দক্ষিণাঞ্চল ও ঢাকা শহরে।

মহিপুর-কাকিনা খেয়াঘাটের ইজারাদার গোলাম রব্বানী জানান, বুড়িমারী স্থলবন্দরসহ লালমনিরহাট জেলার চারটি উপজেলার মানুষ এ ঘাট ব্যবহার করেন। ইজারামূল্য ৫০ লাখ টাকারও বেশি। আগের বছরে ২৮ লাখ টাকায় ঘাট ডাকা হলেও মৌসুমের শেষে আসল টাকা ওঠেনি।

লালমনিরহাটের কাকিনা এলাকার ওছমান আলী হেঁটে নদী পার হন। তিনি বলেন, ‘ঠেকায় (দায়ে) পড়ি হাঁটি আসনু। ইয়াতে কষ্ট হয় খুব।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, তিস্তা ছাড়াও ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর নাব্যতা অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এতে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী, বগুড়া ও জামালপুর জেলার ১৬টি উপজেলার ৫৪ খেয়াঘাটসহ শতাধিক নৌপথ বন্ধ হয়ে গেছে। বালুচর জেগে ওঠায় বন্ধ হয়ে যাওয়া নৌঘাটগুলোর মধ্যে রয়েছে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় পাঁচটি, রৌমারীর চারটি, রাজীবপুরের তিনটি, কুড়িগ্রাম সদরে তিনটি ও ভূরুঙ্গামারীর তিনটি, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের পাঁচটি, গাইবান্ধা সদরের আটটি, ফুলছড়ির ১২টি, সাঘাটার ছয়টি, জামালপুরের ইসলামপুরের তিনটি, দেওয়ানগঞ্জের পাঁচটি, বগুড়ার সোনাতলার দুটি ও সারিয়াকান্দির তিনটি। এসব নৌপথের সঙ্গে ন্যূনতম ৩০ লাখ মানুষ নানাভাবে জড়িত। বর্তমানে তারা দিশাহারা হয়ে পড়েছে।

রংপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট ছাফিয়া খানম বলেন, ‘খেয়াঘাট থেকে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় হয়। কিন্তু নদীতে নাব্যতা না থাকায় এসব ঘাট বন্ধের পথে। বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে ঘাটসংশ্লিষ্টদের। নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে জনজীবনে।’


মন্তব্য