kalerkantho


সুতা রপ্তানিতে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক বসাচ্ছে তুরস্ক

আবুল কাশেম   

২১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বাংলাদেশ থেকে সুতা রপ্তানির ওপর অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক বসাতে যাচ্ছে তুরস্ক। দেশটি বলছে, কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অন্য দেশে উৎপাদিত সুতা বাংলাদেশে উৎপাদন দেখিয়ে রপ্তানি করায় তারা এ ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্প মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ জানিয়েছে, সুতা রপ্তানির ওপর তুরস্ক অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ করলে প্রকৃত রপ্তানিকারকরা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমনকি বাংলাদেশ থেকে তুরস্কে সুতা রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশে উৎপাদিত সুতা রপ্তানির ওপর তুরস্কে শুল্কছাড় রয়েছে। এ সুবিধার অপব্যবহার করতে বাংলাদেশের এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অন্য দেশে উৎপাদিত সুতা আমদানি করে তার ওপর ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ সিল দিয়ে তুরস্কে রপ্তানি করছে। তুরস্ক সরকার গত এক বছরে এ ধরনের ১১টি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করে তদন্ত শুরু করে। তদন্তে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে তারা। এর পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশ থেকে সুতা রপ্তানির ওপর তুরস্ক সরকার উচ্চহারে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ করতে যাচ্ছে।

কর্মকর্তারা জানান, এ ধরনের শুল্ক আরোপ করা হলে প্রকৃত রপ্তানিকারকদেরও আরোপিত শুল্ক পরিশোধ করে রপ্তানি করতে হবে। তাতে বাংলাদেশি সুতার দাম বেড়ে যাবে, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাবে।

বিটিএমএর সেক্রেটারি জেনারেল ফিরোজ আহমেদ গত ৯ জানুয়ারি বাণিজ্যসচিব শুভাশীষ বসুর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে তুরস্কে রপ্তানি করা সুতার ওপর অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপের জন্য তদন্ত করছে দেশটি। যত দূর জানা গেছে, ১১টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছয়টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি। পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম পাওয়া গেছে। এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের কাছে নোটিশ পাঠিয়ে তুরস্ক তিন সপ্তাহের মধ্যে জবাব চেয়েছে।

ফিরোজ আহমেদ বলেছেন, ‘আশঙ্কা করা হচ্ছে যে তুরস্ক সরকার উচ্চহারে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ করতে পারে। যদি তুরস্ক সরকার বাংলাদেশ থেকে সুতা রপ্তানির ওপর ওই অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে, তাহলে বাংলাদেশি প্রকৃত রপ্তানিকারকরা ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ওই দেশে সুতা রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাবে।’

বিটিএমএর কর্মকর্তারা জানান, তুরস্ক সরকার যে এক বছর ধরে তদন্ত করছিল, সেটা তাঁরা জানেন। এখন পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যে অনিয়মের তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে সেটাও তাঁরা জানতে পেরেছেন তুরস্কের একটি অডিট প্রতিষ্ঠানের পাঠানো ই-মেইল থেকে। প্রতিষ্ঠানটি বিটিএমএর সেক্রেটারি জেনারেলকে পাঠানো এক ই-মেইলে বাংলাদেশের পক্ষে আইনগত সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব পাঠিয়েছে।

‘বার্জেন অ্যান্ড কুঝি পার্টনারস’ নামের প্রতিষ্ঠানটির পাঠানো ই-মেইলে বলা হয়েছে, তুরস্কের মন্ত্রণালয় তদন্ত করে দেখতে পেয়েছে যে বাংলাদেশ থেকে যেসব সুতা তুরস্কে রপ্তানি করা হচ্ছে, সেগুলো বাংলাদেশে উৎপাদিত নয়। সংস্থাটির উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, এর আগে চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে সুতা রপ্তানির ওপর অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছে তুরস্ক।

তবে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানতে চাইলে বিটিএমএর সেক্রেটারি মনসুর আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম ও তাদের সম্পর্কে কিছুই জানি না। বিটিএমএর দুটি সদস্য প্রতিষ্ঠান তুরস্কে বৈধভাবে সুতা রপ্তানি করছে। যে ১১টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তুরস্ক তদন্ত করছে, তাদের নাম জানতে আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠিয়েছি।’

‘আমার ধারণা, বাংলাদেশের কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠান, যাদের টেক্সটাইল মিল নেই, তারা চীন ও কোরিয়ার কিছু ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগসাজশ করে ওই সব দেশে উৎপাদিত সুতা তুরস্কে রপ্তানি করছে। তাদের কারণে বাংলাদেশের সুতা রপ্তানির ওপর অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ হলে যারা সত্যিকার অর্থেই দেশে সুতা উৎপাদনের পর রপ্তানি করছে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভবিষ্যতে তুরস্কের বাজারে আরো বেশি সুতা রপ্তানির যে সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছিল, তাও হাতছাড়া হয়ে যাবে’, যোগ করেন মনসুর আহমেদ।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এফটিএ) মো. শফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অভিযুক্ত ১১ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তথ্য জানতে আমরা তুরস্কে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসকে চিঠি পাঠিয়েছি। সেখান থেকে তথ্য পাওয়ার পরই এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘অন্য দেশে উৎপাদিত সুতা রপ্তানির সঙ্গে যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জড়িত, তুরস্ক যাতে সেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, সে অনুরোধ আমরা করব। গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের কারণে বাংলাদেশ থেকে সুতা রপ্তানির ওপর তুরস্ক যাতে ঢালাওভাবে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ না করে, সে জন্য নীতি সহায়তা দেবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।’  

শফিকুল ইসলাম জানান, এর আগে বাংলাদেশ থেকে মাছ ধরার জাল রপ্তানির ওপর ভারত অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপের উদ্যোগ নিয়েছিল। তাঁরা তখন প্রয়োজনীয় সহায়তা করেছিলেন। এতে করে শুধু যারা নিয়ম লঙ্ঘন করেছিল, ভারত সরকার শুধু তাদের রপ্তানির ওপরই অ্যান্টিডাম্পিং বসিয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বাড়তি শুল্ক আরোপ করেনি। তুরস্কও যেন একই ব্যবস্থা নেয়, সেই চেষ্টাই তাঁরা করবেন বলে শফিকুল ইসলাম জানান।


মন্তব্য