kalerkantho


সচল ঢাকার অচল সড়ক

৯০% ফুটপাতে হাঁটা যায় না

যানজটের মধ্যে মানুষ হাঁটে সড়কে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



প্রায় দুই কোটি মানুষের ঢাকা মহানগরে ৭০ শতাংশ মানুষকে হেঁটে চলাচল করতে হয়। যানজটের কারণে গাড়ি থেমে থাকায় যাত্রীদের বড় একটি অংশ বাস ছেড়ে হেঁটে বারবার বাহন পাল্টিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছে। তবে সড়কের দুই পাশে হাঁটার উপযোগী ফুটপাত আছে এমন আদর্শ সড়ক রাজধানীতে চোখে পড়ে না। স্থানে স্থানে ফুটপাত দখল হয়ে আছে দোকানপাট, গাড়ি পার্কিং ও আবর্জনায়। আর হকাররা তো আছেই। কোথাও কোথাও ফুটপাত উধাও হয়ে গেছে সংস্কার বা উন্নয়নকাজের দরুন। হাঁটার উপযোগী ফুটপাত না থাকায় গাড়ি চলাচলের সঙ্গে সড়কেই খুব সাবধানে পা চালাতে হচ্ছে পথচারীদের।

যানজটের নগরীতে প্রতিদিন যোগ হচ্ছে প্রায় দুই হাজার নতুন মুখ। জনসংখ্যার এই বাড়তি চাপের বড়টাই পড়ছে সীমিত সড়কে। দেখা যায়, মগবাজার বা ফার্মগেটের মতো এলাকায় দুই বা তার বেশি বাসের সারির মাঝ দিয়ে মানুষ হেঁটে চলছে। দুই বাসে চাপা পড়লেই প্রাণ ঝরে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়েই এভাবে চলতে হচ্ছে পথচারীদের।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, দখল, সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য ভেঙে ফেলাসহ বিভিন্ন কারণে রাজধানীতে ফুটপাতের ৯০ শতাংশই চলাচলের জন্য ব্যবহার করতে পারছে না পথচারীরা। তবে এর বড় কারণ অবৈধ দখল। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার হিসেবে, রাজধানীতে প্রায় ৬৫ শতাংশ ফুটপাতই অবৈধ দখলে চলে গেছে। গত কয়েক দিন সরেজমিনে দেখা গেছে, পায়ে হেঁটে চলার ফুটপাত না থাকায় বেশির ভাগ স্থানে সড়কের ওপর দিয়ে চলতে হচ্ছে পথচারীদের। মোটরসাইকেল চালকদের একটি অংশ যানজট থেকে রেহাই পেতে দ্রুত ফুটপাত দিয়ে চালাচ্ছেন। তাতে পথচারীরা শঙ্কিত হয়ে চলেন কোনো কোনো ফুটপাতে। বিশেষ করে মিন্টো রোডে কাকরাইল মসজিদের সামনে থেকে শেরাটন হোটেলের পাশের ফুটপাত ব্যবহার করা পথচারীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে মোটরসাইকেল চালকদের অবৈধ ব্যবহারের কারণে। বাংলামোটর থেকে সোনারগাঁও মোড় পর্যন্ত সড়কের ফুটপাতেও একই অবস্থা দেখা যায়।

ঢাকায় গাড়ি বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে জনসংখ্যাও বাড়ছে। প্রশাসনিক কাজসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে ঢাকায় আসা মানুষের বড় অংশই পায়ে হেঁটে চলে। যানজটে বাসে আটকা পড়ায় কর্মস্থল বা জরুরি কাজে তাদের যেতে হয় পায়ে হেঁটেই। সরেজমিনে দেখা গেছে, মগবাজার, মালিবাগ, গুলিস্তান, মতিঝিল, মিরপুর, শ্যামলী, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন স্থানে গাড়ির জটের মধ্যে ঢুকে পথ চলতে হচ্ছে কিংবা রাস্তা পার হতে হচ্ছে পথচারীদের। মিরপুর-১০ থেকে মিরপুর-১২ নম্বর সেকশন পর্যন্ত সড়কে গতকাল রবিবার সকাল ও দুপুরে দেখা গেছে, গাড়ির জটের মধ্যে মানুষজন চলাচল করছে। ফুটপাত নেই এবং পারাপারের কোনো ফুট ওভারব্রিজও নেই। তাই অভিভাবকরা সন্তানদের হাত ধরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন সড়ক বিভাজকের ওপর। গাড়ি ছুটে যাওয়ার পর পথ পরিষ্কার থাকলে রাস্তা পার হন তারা। কেউ আবার গাড়ি ছুটে চলার মধ্যেই রাস্তা পার হন। পল্লবীর বাসিন্দা ইসমত আরা বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাস্তার ওপরদাই চলতে হইতাছে। ফুটপাত তো আর নাই।’

জানা গেছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অধীন ১৬৩ কিলোমিটার ফুটপাত আছে। তার মধ্যে ১১০ দশমিক ৬০ কিলোমিটার ফুটপাতই অবৈধ দখলে চলে গেছে। এ ছাড়া উন্নয়ন বা সংস্কারকাজের জন্য ফুটপাত ব্যবহার করা যাচ্ছে না বহু স্থানে। বাংলাদেশ ছিন্নমূল হকার্স সমিতির জরিপের তথ্য মতে, নগরীর ফুটপাতের ১৩ শতাংশ হকারদের দখলে, ১৫ শতাংশ দোকান মালিকদের দখলে, পাবলিক টয়লেট ও অন্যান্য যাত্রী ছাউনির দখলে ৫ শতাংশ, রাজনৈতিক দলের অফিস আছে ১ শতাংশে। ৪৮ শতাংশ ফুটপাত দখলে আছে। এ ছাড়া গাড়ি পার্কিং, সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য ভেঙে ফেলায় বেশ কিছু ফুটপাত ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ফুটপাতগুলো সবুজ ও সুন্দর করে রেখে হাঁটার ব্যবস্থা রাখা দরকার।

দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য মতে, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর যত লোক মারা যায়, তার ৫৮ শতাংশই পথচারী। নিহত ওই পথচারীদের এক-তৃতীয়াংশ সড়ক পারাপার করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) এবং ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডাব্লিউবিবি) ট্রাস্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার সড়কে দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের মধ্যে ৮৬ শতাংশই পথচারী। ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের গবেষকরা জানান, রাজধানীতে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে হেঁটে যাতায়াত করে। এর মধ্যে ১ থেকে ৩ কিলোমিটার দূরত্বে যাতায়াতের জন্য ৪০ শতাংশ মানুষ হেঁটে চলাচল করে। ৩ থেকে ৫ কিলোমিটার দূরত্বে যাতায়াত করে ১৫ শতাংশ মানুষ। ৫ শতাংশ মানুষ ভাড়ার অভাবে হেঁটে যাতায়াত করে। বাকিরা বাসা কিংবা অফিসের কাজে স্বল্প দূরত্বে যাতায়াত করে পায়ে হেঁটে।


মন্তব্য