kalerkantho


আবার রপ্তানি শুরুর লক্ষ্য

ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ২১৫ কোটি টাকার প্রকল্প

আরিফুর রহমান   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ২১৫ কোটি টাকার প্রকল্প

বিদেশে রপ্তানি করতে এবার ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর প্রতি মনোযোগ দিতে চায় সরকার। উৎপাদন বাড়াতে বেশ কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়নে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা’ শিরোনামের প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয় থেকে। প্রকল্পটি নিয়ে এরই মধ্যে কয়েক দফা আন্ত মন্ত্রণালয় সভাও হয়েছে। শিগগিরই প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উঠতে পারে। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ২১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি দেশের ২৯ জেলার ১৩৪ উপজেলায় বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আশা করছেন, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে, অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধ করতে পারলে এবং ‘মৎস্য সংরক্ষণ আইন’ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হলে ইলিশের উৎপাদন বাড়বে। তাঁদের মতে, সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে না পারলে আসলে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো কঠিন হবে। তাই তাঁদের প্রধান টার্গেট থাকবে মানুষকে বেশি করে বোঝানো।

মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, দেশের বিভিন্ন এলাকায় বর্তমানে ইলিশের পাঁচটি অভয়াশ্রম রয়েছে। সেগুলো হলো চাঁদপুরের ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুরের চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত মেঘনা নদীর অববাহিকায় ১০০ কিলোমিটার, ভোলার মদনপুর থেকে চরপিয়াল পর্যন্ত শাহবাজপুর শাখা নদীর ৯০ কিলোমিটার, ভোলার ভেদুরিয়া থেকে পটুয়াখালীর চররুস্তম পর্যন্ত তেঁতুলিয়া নদীর প্রায় ১০০ কিলোমিটার এবং শরীয়তপুরের নড়িয়া-ভেদরগঞ্জ উপজেলা অংশে পদ্মার ২০ কিলোমিটার। এর পাশপাশি চট্টগ্রামের মিরসরাই এলাকা, ভোলার তজুমুদ্দিন, পটুয়াখালীর কলাপাড়া, কক্সবাজারের কুতুবদিয়া এলাকাও ইলিশের প্রজননকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। প্রজনন মৌসুমে এসব অভয়াশ্রমে মা ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ রয়েছে। কিন্তু প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে ওই সব অভয়াশ্রম থেকে জেলেরা জাটকা ইলিশ ধরছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যমান পাঁচটি ইলিশ অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা গতিশীল করতে বেশ কিছু কার্যক্রমে পরিবর্তন আনা হবে। জেলেদের মাধ্যমে ‘আদর্শ মৎস্যজীবী গ্রাম’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। জাটকা আহরণকারী ৪০ হাজার জেলে পরিবারের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে মৎস্য সংরক্ষণ আইনের আওতায় ভ্রাম্যমাণ আদালত ও অভিযান জোরদার করা হবে, যাতে জাটকা ইলিশ ধরা বন্ধ হয়।

কর্মকর্তারা বলছেন, এসব কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে ইলিশের উৎপাদন বাড়বে। তখন স্বাভাবিকভাবে নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হবে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ গত ৮ জানুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে ইলিশ রপ্তানির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, পাচার ঠেকাতে বৈধভাবে ইলিশ রপ্তানি করা যেতে পারে। এতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে।

মন্ত্রী ওই দিন বলেন, সরকার ইলিশ মাছ রপ্তানি বন্ধ রাখলেও অবৈধভাবে তা পাচার হচ্ছে। এতে রাজস্ব থেকে রাষ্ট্র বঞ্চিত হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি ইলিশ রপ্তানি করি, তাহলে ওপেন পথটা করে দেওয়া যায়, গোপনে যাওয়ার পথটা তখন অনেকটা সংকুচিত হয়ে যায়।’

প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ১ আগস্ট থেকে ইলিশসহ সব মাছ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পরে আবার ওই বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর ইলিশ ছাড়া অন্য সব মাছ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

আবার ইলিশ রপ্তানির লক্ষ্যে নেওয়া প্রকল্পের আওতায় যেসব কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে, সেগুলো হলো সম্মিলিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে দেড় হাজারটি। মৎস্য সংরক্ষণ আইন বাস্তবায়নে প্রায় ১৭ হাজার অভিযান চালানো হবে। ১৩৪ উপজেলায় আয়োজন করা হবে প্রায় আড়াই হাজার জনসচেতনতা সভার। বিলবোর্ড ও সাইনবোর্ড স্থাপন করা হবে দেড় শতাধিক। ৪০ হাজার জেলেকে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা থাকছে এই প্রকল্পের আওতায়।

তবে পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এর আগে জেলেদের জন্য নেওয়া একটি প্রকল্পে সঠিকভাবে জেলে চিহ্নিত করা যায়নি। পরিচয়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ প্রকল্পে যাতে সেই ধরনের অনিয়ম না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছে কমিশন।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ মাছ উৎপাদিত হয় তার ১১ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে ইলিশের উৎপাদন ১ শতাংশ। গত অর্থবছরে পাঁচ লাখ টন ইলিশ উৎপাদিত হয়েছে। বিশ্বের মোট ইলিশের ৭৫ শতাংশ আহরণ হয় বাংলাদেশ থেকে।

রুপালি ইলিশের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২০ লাখ মানুষ সম্পৃক্ত। গত বছর ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে ইলিশ। ফলে দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের ইলিশের জনপ্রিয়তা আরো বাড়বে বলে আশাবাদ মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের।



মন্তব্য