kalerkantho


দ্য স্ট্রেইটস টাইমসে নিবন্ধ

ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের বন্ধনে সিঙ্গাপুর-বাংলাদেশ

শেখ হাসিনা   

১৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের বন্ধনে  সিঙ্গাপুর-বাংলাদেশ

বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে ১৯৭২ সালের প্রথম দিকে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর থেকে দেশ দুটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ রয়েছে। আমাদের বন্ধুত্বের মূল একই মূল্যবোধ ও অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার গভীরে প্রোথিত রয়েছে।

গত কয়েক দশকে সিঙ্গাপুরের যে বিস্ময়কর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটেছে ব্যক্তিগতভাবে আমি তার প্রশংসা করি। বিগত ষাটের দশকে সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জিডিপি) প্রতিবেশী অন্যান্য এশীয় দেশের মতোই ছিল। বর্তমানে সিঙ্গাপুর বিশ্বের অন্যতম সেরা ধনী দেশ।

এটি সম্ভব হয়েছে সম্ভবত দেশটির বিচক্ষণ ও কঠোর পরিশ্রমী জনগণ, রাজনৈতিক নেতাদের প্রজ্ঞা এবং সর্বোপরি গণমুখী আর্থ-সামাজিক নীতির কারণে। মি. লি কুয়ান ইয়ের মতো বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরও দেশকে শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করার স্বপ্ন ছিল। তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুর ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও শ্রম খাতে নিবিড়ভাবে যুক্ত। প্রতিবছর বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের বর্তমান বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আড়াই বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও ওপরে। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক সিঙ্গাপুরের উন্নয়ন ও অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছে।

৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশকে স্বাধীনতার পর নানা চাড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। পরাজিত শক্তি ১৯৭৫ সালে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ আমার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে। দুর্ভাগ্যজনক ওই রাতে জার্মানিতে থাকায় নৃশংস ওই হত্যাকাণ্ড থেকে আমি ও আমার ছোট বোন বেঁচে যাই।

দেশটি দীর্ঘদিন সামরিক ও আধাসামরিক শাসনে ছিল। আমাকেও ১৯৮১ সালের মে পর্যন্ত নির্বাসনে থাকতে হয়। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিতে আমি দেশে ফিরে আসি, যে রাজনৈতিক দলটি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়। দেশে ফিরে আমি অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন শুরু করি। অবশেষে আমাদের দল ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় এবং বহু উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে।

১৯৭৫ সালের ট্র্যাজেডির পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে। আমরা ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি জ্ঞানভিত্তিক মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে ‘ভিশন ২০২১’ ঘোষণা করি। ওই লক্ষ্য অর্জনের পথে আমাদের অগ্রগতি বেশ ভালো।

দারিদ্র্যের হার ২০০৫ সালের ৪১.৫ শতাংশ থেকে গত বছর ২২ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। অন্যদিকে মাথাপিছু আয় ২০০৫ সালের প্রায় ৫৪৩ মার্কিন ডলার থেকে এক হাজার ৬১০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। গত বছর আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৭.২৮ শতাংশ। লিঙ্গসমতার দিক থেকে ১৪৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৭তম এবং টানা তিন বছর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ শীর্ষে রয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। ২০১৫ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির হার ছিল ৯৮ শতাংশ এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছিল ৫৪ শতাংশ।

গোটা দেশ ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হয়েছে। দেশে ১৩ কোটি মোবাইল সিম ব্যবহার হচ্ছে। জন্মহার ২.১৭ শতাংশে নেমে এসেছে। মাত্র ৯ বছরে মানুষের গড় বয়স ৬৫ বছর থেকে বেড়ে ৭২ দশমিক ৪ বছর হয়েছে। বাংলাদেশ এ মাসেই উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেতে যাচ্ছে বলে আশা করা হচ্ছে।

আমাদের আরো এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টা দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে মূল বিষয় হবে বিদেশি বিনিয়োগ। আমার সরকার আমাদের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন লাভে সিঙ্গাপুরের সঙ্গে কাজ করতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

সিঙ্গাপুরে রয়েছে মূলধন, আধুনিক প্রযুক্তি এবং তা পরিচালনা সম্পর্কে ধারণা। বাংলাদেশের রয়েছে দক্ষ জনবল। এসব সুবিধা আমাদের উভয়ের জন্য পারস্পরিক সুফল বয়ে আনতে পারে।

আমাদের রয়েছে উদার বিনিয়োগ নীতি। আইন করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। কর অবকাশের এবং বিদেশিদের জন্য রয়েছে শতভাগ মূলধন বিনিয়োগের সুবিধা। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

মিয়ানমার থেকে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে আশ্রয় নেওয়ায় বাংলাদেশকে সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে। আমি রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের উপায় খুঁজে বের করতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য আসিয়ানের বর্তমান চেয়ার হিসেবে ভূমিকা রাখতে সিঙ্গাপুরের নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

দুই দেশের জনগণের স্বার্থে যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে আমাদের সম্পর্ক আরো জোরদার করতে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। আমি আশা করি, আমার এই সফর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করবে। সূত্র : বাসস।

 


মন্তব্য