kalerkantho


খুলনা সিটি নির্বাচন

বিএনপির ঘরে ছাইচাপা আগুন, মুখে ঐক্য

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

১৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে মেয়রের চেয়ার ধরে রাখতে বিএনপির হাইকমান্ড মরিয়া হলেও স্থানীয় নেতাদের কোন্দল থামেনি। মুখে ঐক্যের কথা বললেও ভেতরে চলছে গৃহদাহ। এরই মধ্যে মেয়র প্রার্থীর বিরোধীপক্ষ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে দুজন কাউন্সিলর প্রার্থীও ঘোষণা করেছে। খুলনায় তিন ধারায় বিভক্ত বিএনপির দুটি গ্রুপের নেতারাই নির্বাচনী কর্মকাণ্ডের বাইরে রয়েছেন। গতকাল সোমবারের আগ পর্যন্ত নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতেও তাঁদের রাখা হয়নি।

কেন্দ্রের শীর্ষস্থানীয় দুই নেতা বারবার ফোন করে চাপ দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত গতকাল যৌথ সভায় বসেন জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতারা। সভায় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি পুনর্গঠন করে বিরোধীদেরও রাখা হয়। তবে কেন্দ্রের চাপে এই ঐক্যের প্রতিফলন মাঠে দেখা যাবে না বলে একাধিক সূত্র কালের কণ্ঠকে জানিয়েছে।

খুলনায় তিন ভাগে বিভক্ত বিএনপির এক ভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মেয়র পদপ্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু স্বয়ং। তিনি দলের খুলনা মহানগর শাখার সভাপতি এবং খুলনা বিভাগীয় কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক ও কেসিসি মেয়র মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মনিও এই গ্রুপে। অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মনার নেতৃত্বে খুলনা জেলা শাখা একেবারে বিপরীতমুখী। জেলা শাখার বেশির ভাগ নেতা মনার অনুসারী। এই নেতাদের উল্লেখযোগ্য অংশ খুলনা মহানগরের বাসিন্দা। তারা দীর্ঘদিন ধরে দলের রাজনৈতিক কর্মসূচিও পৃথকভাবে পালন করে আসছে। আরো একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দলের মহানগর শাখার কোষাধ্যক্ষ এস এম আরিফুর রহমান মিঠু। খুলনা সদরের সাবেক এমপি আলী আসগার লবির অনুসারী বলে মিঠু পরিচিত।

গতকাল জেলা ও মহানগর বিএনপির যৌথ সভার পরও নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, মনা ও মিঠু গ্রুপের অনুসারীদের মঞ্জুর নেতৃত্ব মেনে নিতে আপত্তি রয়েছে। তারা কেউ কেউ বলছে, তারা মঞ্জুকে হারাতে চায়। তাদের অভিযোগ, মঞ্জু এককভাবে দলকে নিয়ন্ত্রণ করেন, একটি স্বৈরতান্ত্রিক পদ্ধতি দাঁড় করিয়েছেন। বিএনপি খুলনা মহানগর শাখার একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মঞ্জুর একচ্ছত্র দাপট অনেকেই পছন্দ করে না। অতীতে তাঁর বিরোধিতাকারীরা যেমন কোণঠাসা হয়েছে, বর্তমানেও তা-ই চলছে। সূত্র জানায়, নির্বাচনী কার্যক্রমে বিরোধিতাকারী গোষ্ঠীর কেউই অংশ নেবে না। লোক-দেখানো অর্থে দু-একজন হয়তো প্রচারণায় সঙ্গী হতে পারে।

জানতে চাইলে বিএনপি খুলনা মহানগর শাখার সহসভাপতি ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক সাহারুজ্জামান মোর্তজা বলেন, ‘দল নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে মনোনয়ন দিয়েছে, তিনি খুবই শক্তিশালী প্রার্থী। আমরা এখন সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে তাঁকে বিজয়ী করে আনতে চাই। মতভিন্নতা, গ্রুপিং এখন আমরা মাথায় আনছি না। আগে খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই; খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন আমাদের ঐক্যবদ্ধ করেছে। পরে আমরা গ্রুপিং করব।’

তবে দলের পক্ষ থেকে মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মনির নেতৃতে ১০১ সদস্যের প্রথম যে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছিল, তাতে মনা বা মিঠুর অনুসারী কাউকে রাখা হয়নি। এর কারণ জানতে চাইলে গত বৃহস্পতিবার সাহারুজ্জামান মোর্তজা বলেছিলেন, নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে যারা বেশি সময় দিতে পারবে তাদেরই রাখা হয়েছে। গতকাল এই নির্বাচন পরিচালনা কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন করে কমিটি করা হয়েছে, যার নেতৃত্ব দেবেন এখন মোর্তজা নিজে। এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানার জন্য গতকাল তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।

খুলনায় মঞ্জুর বিরোধী শক্তিশালী গ্রুপের নেতা জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মনা এবারের মেয়র নির্বাচনে বিএনপির জোরালো প্রার্থী ছিলেন। আগেরবারও তিনি মেয়র পদে মনোনয়ন চাইলে পরেরবার দেওয়া হবে বলে ‘কথা’ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার মনি ও মনা উভয়কে বাদ দিয়ে নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে প্রার্থী করা হয়েছে। এটা মানতে পারছেন না তাঁরা।

অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মনা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতি করি। আমি খুলনা শহরের বাসিন্দা। খুলনা পৌরসভার কাউন্সিলর ছিলাম। আমি গতবারে মেয়র পদে মনোনয়ন চেয়েছিলাম। আমাকে বলা হলো, পরেরবার তোমাকে দেওয়া হবে। এ কারণে আমি এবার মনোনয়ন চাই। কিন্তু দল আমাকে মনোনয়ন দিল না।’ তিনি বলেন, ‘আগে মহানগর কমিটি একটি নির্বাচন পরিচালনা কমিটি করেছিল, পরে আমরাও একটি পরিচালনা কমিটি করেছিলাম। আজ (গতকাল) জেলা ও মহানগর কমিটির যৌথ সভায় একটি নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠিত হয়েছে।’

বিএনপি খুলনা মহানগর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম আরিফুর রহমান মিঠু। উত্তরাধিকার সূত্রে খালিশপুর শিল্পাঞ্চলে নোয়াখালী-বরিশাল অঞ্চলের মানুষের মধ্যে তাঁর প্রভাব রয়েছে। তিনি ও তাঁর অনুসারী নেতারা নির্বাচন থেকে দূরে সরে আছেন।

মেয়র পদপ্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘বড় দল। গ্রুপিং থাকবে। তবে আমাদের দলে বড় কোনো সমস্যা নেই। দলের বিপদের সময় যারা চলে গেছে, তাদের গ্রুপিংয়ে কিছুই আসে যায় না। আর মনোনয়নবঞ্চিত হলে কারো খারাপ লাগা স্বাভাবিক, তার মানে এই নয় যে কেউই দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাবে।’ নির্বাচন পরিচালনা কমিটি পুনর্গঠন করার ব্যাপারে তিনি বলেন, কমিটির সদস্যসচিব করা হয়েছে জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আমীর এজাজ খানকে (মনা গ্রুপের অনুসারী)। এ ছাড়া জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মনাকে ২০ দলীয় জোটের প্রধান সমন্বয়কারী নির্বাচিত করা হয়েছে।

 



মন্তব্য