kalerkantho


এক লাখ টাকা, জাল নোট মেলে ১৫ হাজার টাকায়

ঈদ সামনে রেখে বেপরোয়া কারবারিরা

সরোয়ার আলম ও শেখ শাফায়াত হোসেন    

১৩ জুন, ২০১৮ ০০:০০



ঈদ বাজারে জাল নোট ছড়িয়ে দিতে তৎপর জাল টাকার কারবারিরা। এই অপতৎপরতায় দেশি চক্রের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিদেশিরাও। চক্রটি বেশি সক্রিয় রাজধানীতে। বিশেষ করে কাঁচা বাজার, বড় বড় বিপণিবিতানে কেনাকাটার সময় বিক্রেতার চোখ ফাঁকি দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে জাল নোট। আতঙ্কের বিষয় হলো, ব্যাংকের এটিএম বুথেও মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে জাল টাকা। এ নিয়ে বিব্রত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও।ঢাকাসহ দেশজুড়ে প্রায় দেড় শ চক্র জাল টাকার কারবারে জড়িত। বছরজুড়ে জাল টাকার কারবার চললেও দুই ঈদে বেড়ে যায় এই অপতৎপরতা। আবার জাল টাকা চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হলেও তাদের কারাগারে আটকে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। সহজেই জামিন নিয়ে বেরিয়ে ফের একই কাজে জড়িয়ে পড়ে তারা।

সম্প্রতি রাজধানীর কদমতলী থেকে পুলিশ ১০ জন জাল টাকার কারবারিকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার করা ব্যক্তিরা স্বীকার করেছে, ঈদ সামনে রেখে পাঁচ কোটি জাল টাকার নোট বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের। জাল টাকা চক্রের গ্রেপ্তার সদস্যরা হলো রফিক, জাকির, হানিফ, রাজন শিকদার, খোকন, রিপন, মনির, সোহরাব, জসিম ও লাবনী। এই চক্রের গুরু রফিক। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, পাঁচ কোটি টাকার জাল নোট বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের। এরই মধ্যে এক কোটি টাকা তৈরি করে বাজারে ছেড়েছে তারা। জাল এক লাখ টাকা তারা বিক্রি করে ১৪-১৫ হাজার টাকায়।

ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) দেবদাস ভট্টাচার্য্য জানান, যে পরিমাণ জাল নোট তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে, তা দিয়ে তিন-চার কোটি টাকার জাল নোট তৈরি করা সম্ভব। এসব টাকা পাইকারি বিক্রেতাদের মাধ্যমে খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে পৌঁছে দিত চক্রটি। পাইকারি বিক্রেতার কাছে নকল এক লাখ টাকা বিক্রি করা হয় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকায়। পাইকারি বিক্রেতা এসব নোট খুচরা বিক্রেতার কাছে বিক্রি করে ২০-২৫ হাজার টাকায়। প্রথম খুচরা বিক্রেতা এক লাখ টাকা দ্বিতীয় খুচরা বিক্রেতার কাছে বিক্রি করে ৪০-৫০ হাজার টাকায়। দ্বিতীয় খুচরা বিক্রেতা এসব জাল নোট বিভিন্ন কৌশলে কেনাকাটা বা লেনদেনের সময় বিক্রেতা বা পাওনাদারের হাতে গছিয়ে দিচ্ছে। জানা গেছে, জাল টাকা তৈরিতে চক্রটি ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট একই কাগজ ও মাপে তৈরি করে। এ ছাড়া একটি চক্র ১০০ টাকার নোটকে ৫০০ টাকার নোটে পরিণত করে বাজারে ছাড়ছে।১৫২ মিলিমিটার দৈর্ঘ্য ও ৬৫ মিলিমিটার প্রস্থ আকৃতির ১০০ টাকার নোট বিভিন্ন ব্যাংক থেকে সংগ্রহ করে কয়েক ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করে টাকার ওপরের রং তুলে ফেলা হয়। পরে ওই নোটের ওপর ৫০০ টাকার নোটের ছাপ দিয়ে অবিকল ৫০০ টাকায় পরিণত করা হয়। এ ক্ষেত্রে ওই নোটটি হাতে নিলে সহজে জাল নোট মনে হয় না।

গোয়েন্দাদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, ১০০০, ৫০০ ও ১০০ টাকার নোট বেশি জাল করছে প্রতারকরা। তবে অভিযোগ রয়েছে, চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করা হলেও যথাযথ তদন্ত হচ্ছে না। কিছু মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হলেও দুর্বল তদন্তের কারণে জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছে আসামিরা।সাক্ষীর অভাবে আদালতে অনেক মামলার সুরাহা হচ্ছে না।

আবার আসামি শনাক্ত না হওয়ায় অনেক মামলা খারিজ করে দিচ্ছেন আদালত। গত ১২ বছরে দেশে ১০ হাজার মামলা হলেও তিন হাজারের বেশি মামলার তদন্ত নেই। 

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, জাল টাকার কারবারিদের ধরতে পুলিশ নানাভাবে চেষ্টা চালায়। সম্প্রতি বেশ কয়েকজন প্রতারককে ধরা হয়েছে।তিনি আরো বলেন, ‘জাল টাকা প্রতিরোধে ডিএমপির আলাদা কয়েকটি টিম কাজ করছে। সতর্কতার সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করতে হবে। বিদেশি কিছু চক্র জাল টাকার ব্যবসায় জড়িত আছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। ওই সব চক্রের সদস্যদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।’   

জানা গেছে, নারী ক্রেতারা মার্কেটে গিয়ে দামি পোশাক, প্রসাধনী কেনার নাম করে এসব জাল টাকা চালিয়ে দেয়। এ ছাড়া ধনী ক্রেতা গাড়ি থেকে নেমে টাকা ভাঙানোর নাম করে অনেক সময় জাল টাকা চালানোর চেষ্টা করে।

বাড্ডা লিংক রোডের ফুটপাতে খেজুর বিক্রেতা মো. আসলাম জানান, রোজা শুরুর আগের দিন খেজুরের বিক্রি বেশি ছিল। তাঁর কাছ থেকে এক লোক কিছু খেজুর নিয়ে একটি এক হাজার টাকার নোট দেয়। নোটটি তাঁর কাছে জাল মনে হয়। এরপর আশপাশের দু-একজন বিক্রেতাকে দেখালে তারাও বলে নোটটি জাল। কিন্তু তিনি কিভাবে প্রমাণ করবেন টাকাটি জাল! কারণ তাঁর কাছে যন্ত্র নেই। এ নিয়ে ওই ক্রেতার সঙ্গে বাগিবতণ্ডা করলে একপর্যায়ে সে কেটে পড়ে।

জাল টাকার শাস্তি : পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, ১৯৭২ সালের সংশোধিত আইনে জাল টাকার কারবারিদের মৃত্যুদণ্ডের শাস্তির বিধান ছিল। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে জাল টাকা বা জাল স্ট্যাম্পের সঙ্গে জড়িতদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান করা হয়। পরে ১৯৮৭ সালের ১৯ জানুয়ারি আইন সংশোধন করে জাল নোটের সঙ্গে জড়িতদের মৃত্যুদণ্ড বা ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গত ২০ মে জারি করা এক সার্কুলারে বলা হয়, আসল নোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যসংবলিত ভিডিও চিত্র ব্যাংকের সব শাখা এবং রাজধানীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরে প্রদর্শন করতে হবে। ২৪ মে থেকে ৩১ জুন পর্যন্ত এটি প্রচার করতে হবে। ঢাকার ৫৬টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ভিডিও প্রচারের তারিখ ও স্থান সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

সার্কুলারে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, আসল ব্যাংক নোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যসংবলিত ভিডিও চিত্রটি সংযুক্ত সূচি অনুযায়ী ঢাকা শহরে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা অফিসগুলোর নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী বগুড়া জেলাসহ অন্য বিভাগীয় শহরের গুরুত্বপূর্ণ জনসমাগমস্থলে বা রাস্তার মোড়ে প্রচার করতে হবে।গুলশান, বনানী,  শ্যামলী, ফার্মগেট, শাহবাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ ৫৬টি স্থানে এই ভিডিও প্রচারের জন্য ৫৬টি ব্যাংককে তারিখ নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বছর কয়েক আগে জাল নোটপ্রবণ এলাকা হিসেবে আটটি উপজেলাকে চিহ্নিত করে বাংলাদেশ ব্যাংক, যার বেশির ভাগই সীমান্তবর্তী।

বর্তমানে জাল টাকার পাশাপাশি জাল ডলারও তৈরি হচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে।


মন্তব্য