kalerkantho


ইরান চাইলে তুরান যেতে পারত

ইরানের বন্ধুদের অনেকেই আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থার বড় কর্মকর্তা। কেউ বা বিদেশে গিয়ে এখন অনেক টাকার মালিক। ইরানও পারত তেমন কিছু হতে। কিন্তু পড়ায় স্কুলে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্কুল আমাদের পাঠশালা। গল্প করে এসেছেন মাহবুবর রহমান সুমন

২৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ইরান চাইলে তুরান যেতে পারত

আমাদের পাঠশালা

 

মিরপুর ১২-র ডি-ব্লকের ১৫ নম্বর রোডের ৫৮ নম্বর দোতলা বাসা হচ্ছে ‘আমাদের পাঠশালা’। এখানে এখন মিরপুর ও আশপাশের  সুবিধাবঞ্চিত প্রায় দুই শর বেশি ছাত্র পড়ালেখা করে।

এসব ছাত্রের জন্য সপ্তাহের ছয় দিন ব্যবস্থা করা হয় টিফিনের। ১২ জন শিক্ষক আছেন স্কুলে। রয়েছেন একজন শিক্ষক সহকারী ও একজন তত্ত্বাবধায়ক। শ্রেণিকক্ষ রয়েছে পাঁচটি। রয়েছে ছোট একটি লাইব্রেরিও। ছাদের এক পাশে রয়েছে ছোট একটি বাগান ও এক চিলতে খেলার জায়গা। এখানে মেধাকে শুধু পড়ালেখা দিয়ে বিচার করা হয় না। এই স্কুলে  নামমাত্র টাকা দিয়েই লেখাপড়া করা যায়। প্রতি মাসে ছাত্রদের বেতন ৩০-৪০ টাকা। টাকা নেওয়ার উদ্দেশ্য, ছাত্ররা ফ্রি শিক্ষা নিচ্ছে এমন ধারণা যেন না তৈরি হয়, অভিভাবকরা যেন বলতে পারেন, তাঁরা তাঁদের বাচ্চাদের টাকা দিয়েই পড়াচ্ছেন। এই স্কুলে প্রাক-প্রাথমিক থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। এ ছাড়া এই স্কুল প্রতিবছর বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে আয়োজন করে নানা অনুষ্ঠানের। ছাত্রদের দেওয়া হয় চিকিৎসাসেবা। নিয়ে যাওয়া হয় শিক্ষা সফরে। প্রকাশিত হয় দেয়ালপত্রিকাসহ প্রাণের হাট নামের বার্ষিক ম্যাগাজিন। এগুলো ছাত্রদের গল্প-কবিতা দিয়েই সাজানো হয়।

ব্যতিক্রমী শনিবার

শনিবারটা ছাত্র-ছাত্রীদের মেধা বিকাশের দিন। আনন্দ করার দিন। শনিবার সারা দিন শিক্ষার্থীদের শেখানো হয় অভিনয়, নৃত্য, ছবি আঁকা ও গান। আর এই কার্যক্রম পরিচালনার জন্য রয়েছেন চারজন শিক্ষক।

 

পাঠশালার অর্থসংস্থান

আমাদের পাঠশালার অর্থ জোগান দেয় ‘পাঠশালাবান্ধব’। এটি শুভানুধ্যায়ীদের একটি দল। যে কেউ এতে যুক্ত হতে পারেন। অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করা যায়, কেউ বা  সহযোগিতা দেন কম্পিউটার দিয়ে বা ছাত্রদের বসার বেঞ্চ দিয়ে। বাদ্যযন্ত্রও জোগান দিয়েছেন কেউ কেউ। স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েও বান্ধব হন অনেকে।   এখন পর্যন্ত প্রায় ১০০ দরদি পেয়েছে আমাদের পাঠশালা। এদের কেউ দেয় মাসভিত্তিক, কেউ টাকা দেয় বছরে একবার। অনেকে এককালীন টাকাও দিয়েছেন। এখন বান্ধবরা চেষ্টা করছে পাঠশালার একটি স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে। সামর্থ্যবান কেউ যদি এগিয়ে আসেন, তাহলে কাজটি সহজ হয়।

সাবেক ছাত্রদের কয়েকজন

একজনের নাম হৃদয়। এবার সে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। আমাদের পাঠশালায় পড়েছে চতুর্থ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। বলল, ‘এই স্কুলের স্যার অন্য স্কুলের স্যারদের মতো নয়। এখানকার স্যাররা বন্ধুর মতো। বকা দেন না, ধমক দিয়ে কথা বলেন না। এই স্কুলকে অনেক মিস করি। সব স্যার যদি এই স্কুলের স্যারদের মতো হতেন!’ ফাতেমা আক্তার পড়ে দশম শ্রেণিতে। এখানে পড়েছে তৃতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। সে বলল, ‘এই স্কুলে যেভাবে পড়ানো হয়, অন্য স্কুলে সেভাবে পড়ানো হয় না। এই স্কুলের স্যাররা সহজ করে বুঝিয়ে দেন। ’ শারমিন আক্তার এই স্কুলে পড়েছে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত, ‘এই স্কুলের মতো ভালো আর মজার স্কুল কোনোখানে নেই। সারা জীবন যদি এই স্কুলে সব ক্লাসে পড়তে পারতাম। ’ উল্লেখ্য দুর্গা পূজার ছুটি ছিল। শনিবারের দুপুর ছিল সেটা। সাবেক ছাত্ররা স্কুলে এসেছিল ইরান স্যারের কাছে গণিত বুঝে নিতে।

 

‘আমাদের ছাত্রদের রোল নম্বর নেই’

বনভোজনে আমাদের পাঠশালা

 

একজন মাহবুব ইরান, ১৯৮৩ সালে জন্ম। ঢাকার মিরপুরে পৈতৃক বাড়ি। তবে ক্লাস থ্রিতে উঠেই বাসা ছেড়ে তাঁর নতুন ঠিকানা হয় হোস্টেলে। সেই থেকে তাঁর হোস্টেল জীবন শুরু। পড়ালেখা করেছেন ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজে। সেখান থেকে ১৯৯৯ সালে এসএসসি ও ২০০১ সালে এইচএসসি করেন। এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন। যুক্ত ছিলেন ‘চলচ্চিত্র আন্দোলন’ নামের একটি ফিল্ম সোসাইটির সঙ্গে। ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন।

 

আমাদের পাঠশালার শুরুর কথা বলুন।

ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত ছিলাম। আমরা দেখেছি, দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ভয়ানক বৈষম্য রয়েছে। এ কারণেই দেশ পুরোপুরি সাক্ষর হতে পারছে না। এখনো দেশের ৪৯ শতাংশ শিশু শিক্ষার আলোর বাইরে রয়ে যায়। বৈষম্যের সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ সদিচ্ছা। আমাদের দেশে গরিবকে দরিদ্র (পুওর অর্থে) শিক্ষা দেওয়া হয়। এসব দেখে আমরা কয়েকজন আজিজ সুপার মার্কেটে জড়ো হলাম। সেই সময় আমি, আবুল হাসান, রণজিৎ মজুমদার, অমল আকাশ, মুনতাসির বিল্লাহ আর এমজে ফেরদৌস মিলে নতুন ধারার একটি স্কুল করার পরিকল্পনা করি। এমন একটি স্কুলের কথা আমরা ভাবলাম, যেখানে গরিব শিশুদের জন্য গরিব হবে না শিক্ষা। মানে বৈষম্য থাকবে না। এভাবে আমাদের পাঠশালার যাত্রা শুরু। আমার বাসাতেই প্রথম চালু হয়েছিল স্কুলটি।  

 

নৃবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। অনেক কিছুই হতে পারতেন।

হ্যাঁ, বাঁচার জন্য টাকা দরকার। তবে কত টাকা? আরেকটি প্রশ্ন আমাকে তাড়িত করে, বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য কী? এসব প্রশ্নের মধ্যে থাকতে থাকতেই এই কাজ শুরু করে দিই। বলতে পারেন, ভালো লাগা ও দায়িত্ববোধ থেকে এই কাজ করি।

 

দশ বছরের অভিজ্ঞতা কেমন?

২০০৭ সালে স্কুল শুরু। আমাদের কিন্তু ছাত্রের অভাব হয়নি। প্রথম বছরই এক শর মতো ছাত্র-ছাত্রী ছিল। স্কুল ভালো লাগছে না বলে কোনো ছাত্র ঝরে পড়েনি আমাদের স্কুল থেকে। তবে অনেক পরিবার স্থানান্তরিত হওয়ার কারণে ড্রপ আউট হচ্ছে। মানে ছাত্রের পরিবার মিরপুর ছেড়ে লালবাগ বা রায়েরবাজার চলে যাওয়ায় ছাত্রের আর স্কুলে আসা হচ্ছে না। আমাদের শিক্ষকরা ছাত্রদের দ্রুতই আপন করে নেন। তাই তারা পড়ালেখায় মনোযোগী হয়। ছাত্রদের জোর করা হয় না। তাদের মজা করে পড়ালেখা করানো হয়। তারা যে কাজ বেশি পছন্দ করে, আমরা সেটিকে পড়ালেখার অংশ হিসেবে যুক্ত করে দিই। আমরা ছাত্রদের সম্মানের দিকটিও নজরে রাখি। সে কারণেই ছাত্রদের কোনো রোল নম্বর নেই। এ ছাড়া আমরা ছাত্রদের মধ্যে আশার সঞ্চার করি।

 

সংকট হয়নি কিছুই?

এই এত বছর পরে ক্যাম্পাস সংকট সত্যি প্রকট হয়ে উঠেছে। প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণেরও অভাব বোধ করেছি। এ ছাড়া আমরা আমাদের সব শিক্ষককে ধরে রাখতে পারিনি। কারণ অনেকেই এটাকে পেশা হিসেবে ধরে রাখতে পারেনি।

 

এবার সফলতার গল্প শুনি

২০১০ সাল থেকে আমাদের স্কুলের ছাত্ররা প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। প্রথমবার ১৫ জনের মধ্যে দুজন গণিতে অকৃতকার্য হয়। বাকিদের মধ্যে ৯ জন প্রথম বিভাগ আর অন্যরা দ্বিতীয় বিভাগ পেয়েছিল। এরপর থেকে ২০১১-১৬ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে কেউ ফেল করেনি। ছাত্রদের গ্রেডও ভালো ছিল। বি গ্রেডের নিচে কেউ পায়নি। ২০১১ থেকে ৭৭ জন পরীক্ষার্থী পাস করেছে সমাপনী পরীক্ষায়। পাসের হার ১০০। এর মধ্যে ৫৭ জন এ-গ্রেড বা তার ওপরে পেয়েছে। এ পর্যন্ত এ-প্লাস পেয়েছে দুজন। অন্যদিকে ২০১৩ সাল থেকে আমাদের ছাত্ররা জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে শুধু প্রথমবারই একজন অকৃতকার্য হয়েছিল। এরপর থেকে পাসের হার শত ভাগ। আমাদের সবচেয়ে সিনিয়র ছাত্র মোমিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে ভর্তি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় ৫৫তম হয়েছে। সে এখন প্রথম বর্ষের ছাত্র।

 

আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা?

আমাদের পাঠশালাকে আরো বড় করতে চাই। বলতে পারেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আমরা বেশ কিছু এমন স্কুল করতে চাই। স্কুলগুলো যে আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে এমন কথা নেই। যদি কেউ আমাদের থেকে আইডিয়া নিয়ে এমন স্কুল করতে চায়, আমরা সাহায্য করব। এ ছাড়া স্কুল চালানোর অভিজ্ঞতা লিখে রেখে যেতে চাই। চাই সমমনা স্কুলগুলোর সঙ্গে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে।


মন্তব্য