kalerkantho


ফেসবুক থেকে পাওয়া

জীবন যখন সাগরে ভাসে

১৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



জীবন যখন সাগরে ভাসে

মাসের পর মাস বিদেশের বন্দর ঘুরে জাহাজ তখন নিজ দেশের সমুদ্রে নোঙর করা। মনে মনে ভাবছিলাম, কবে সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ারকে বলে এক দিনের ছুটি ম্যানেজ করে বাসায় যাব। কিন্তু আবহাওয়া বৈরী। ছুটি পেলেও স্পিডবোটে করে সি-বিচ পর্যন্ত যেতে পারব কি না এই আশঙ্কা মনে। দুপুর ১২টা, ইঞ্জিনরুমে মাত্র ডিউটিতে নামলাম। দেখি ইঞ্জিন চলে। কন্ট্রোল রুমে গিয়ে শুনলাম জাহাজ মিয়ানমারের দিকে যাচ্ছে। ডিসচার্জ শেষ হয়নি কার্গোর, জাহাজ কেন মিয়ানমার যাবে? শুনি সাইক্লোন আসছে। সাইক্লোন রোয়ানু। অ্যাংকরেজে কলিশনের ভয় আছে, তাই পালিয়ে বাঁচা আর কি। চলতেই থাকল জাহাজ ফুল অ্যাহেডে। সন্ধ্যা ৬টায় ডিউটি শেষ করে মেসরুমে ডিনার করে কিছুক্ষণ টিভিতে নাটক দেখে রুমে গিয়ে ফুল সাউন্ডে হিন্দি গান চালু করলাম। ঢেউয়ের তোড়ে কখন টেবিল থেকে ল্যাপটপ পড়ে যায়—এই ভয়ে খাটের ওপর রাখলাম। বাসায় ফোন দিলাম, তখনো অল্প নেটওয়ার্ক আছে। আম্মা বললেন, সাইক্লোন আসছে, তোরা কই? আমি আম্মাকে বললাম, অ্যাংকরেজে তো থাকা যায় না, তাই মিয়ানমারের দিকে যাচ্ছে জাহাজ। টেনশন করতে মানা করলাম। ভারত সাগরে বেশ কয়েকবার ঝড়ের কবলে পড়ায় তখনো আমার মনে কোনো ভয় কাজ করছিল না। বাসায় কথা বলে লাইফবোট ডেকে গিয়ে রাতের অন্ধকারে উত্তাল সমুদ্র দেখে আসা আমার প্রতিদিনের অভ্যাস। দরজা খুলেই বুঝলাম এত বেশি বাতাস যে আজ বাইরে বেরোনো রিস্কি। রাত ১০টা বেজে গেল, ১২টা থেকে আবার ডিউটি। একটু হলেও ঘুমাতে হবে। বেডে শুয়েই বুঝলাম আজ আর ঘুম হবে না। তা-ও শুয়ে শুয়ে ঢেউয়ের তালে তালে ভাবছিলাম, সি-টাইম কবে শেষ হবে, কবে বাসায় যাব। টানা চারটা ঈদ করে ফেললাম এই সাগরে। আগামী ঈদে কী করব বাড়িতে, এই কন্ট্রাক্ট শেষে কোথায় ঘুরব—এসব চিন্তা করতে করতে রাত ১২টা, অ্যালার্ম ঘড়িটা জানিয়ে দিল আবার সেই ইঞ্জিনরুমে ডিউটির টাইম। মধ্যরাতের চার ঘণ্টা ইঞ্জিনরুমে কাজ করেই কেটে গেল। এক্সপেরিয়েন্সড ক্যাডেট হওয়ায় ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ারের পিউরিফায়ার চালানোর দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। পিউরিফায়ারটা চালিয়ে পরের ওয়াচকিপারকে ডিউটি বুঝিয়ে দিয়ে ছুটি মিলল রাত ৪টায়। রুমে এসে গোসল করে ঘুমানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। এমন সময় ইঞ্জিনরুম থেকে ওয়াচকিপার এসে ডাকল। পিউরিফায়ারে প্রবলেম। মনে মনে ফোর্থ এ এর ওপর প্রচণ্ড রাগ নিয়ে নিচে নেমে পিউরিফায়ার অফ করে ওপরে যাচ্ছি। এবার মনে হলো আমি এভারেস্টের চূড়ায় উঠছি। জাহাজ এত বেশি রোলিং করছিল যে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে পারছিলাম না। কিচেনের সামনে এসে মনে হলো প্রচণ্ড মাথা ব্যথা করছে। ১১ মাসের ক্যাডেটলাইফে একবারও বমি না করা আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই বমি করলাম। অনেক কষ্টে রুমে গিয়ে কোনোভাবে বেডে বসলাম। সাগরের ঢেউ মনে হচ্ছিল জাহাজটাকে ভেঙে ফেলবে। একবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। বাইরের দৃশ্য এতটা ভয়ংকর যে বেশিক্ষণ বাইরে তাকাতে পারলাম না। মনে হচ্ছিল জাহাজ পুরো কাত হয়ে ডুবে যাচ্ছে, আবার পরমুহূর্তে অন্যদিকে কাত হয়ে সেদিকে ডুবে যাচ্ছে। আর বসে থাকতে পারলাম না। শুয়ে আছি; কিন্তু একি, বেড থেকে মনে হচ্ছিল কেউ ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে। কোনোভাবে একটি টেবিল ধরে শুয়ে থাকলাম। ভাগ্যিস এই টেবিলটা ফ্লোরের সঙ্গে ফিক্সড ছিল। হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে বোট ডেকের একটি দরজা খুলে গেল। হয়তো কেউ ঠিকভাবে বন্ধ করেনি। লোহার দরজা জাহাজের রেলিংয়ে প্রচণ্ড শব্দ করতে লাগল। আমার রুমের পড়ার টেবিলটা এর মধ্যেই কয়েকবার ডিগবাজি খেয়ে একপাশে উল্টো হয়ে পড়ে আছে। ডিটারজেন্টের একটা প্যাকেট কিভাবে যেন খুলে পুরো কেবিনে ছড়িয়ে গেল। রুমে পুরো এক কেস পানির বোতল প্যাকেট করা ছিল। জাহাজ এত বেশি দুলতে শুরু করছিল যে এই শক্ত প্যাকেটের পানির বোতল নিজে নিজেই খুলে গেল ধাক্কা খেয়ে। সব পানির বোতল পুরো কেবিনে গড়াগড়ি খাচ্ছে। দাঁড়িয়ে যে তুলে রাখব সেই শক্তি নেই। একবার দাঁড়াতে চেষ্টা করলাম, পারলাম না, আবার পড়ে গেলাম বেডের ওপর। একদিকে লোহার দরজার প্রচণ্ড শব্দ, অন্যদিকে ফ্লোরে পানির গড়াগড়ির শব্দ, মনে হচ্ছিল আজরাইল খুব হাসছে, আর মৃত্যুঘণ্টা বাজছে, ঢং ঢং ঢং। বাসার কথা মনে হলো। কি দেখা হবে আম্মার সঙ্গে, ছোট বোনের সঙ্গে! প্রতি সেকেন্ডে মনে হচ্ছিল এই বুঝি ডুবে গেল জাহাজ। প্রচণ্ড ভয় নিয়ে এভাবে পার করে দিলাম চার ঘণ্টা। ৮টা বাজতে সাগর একটু শান্ত হয়ে এলো। প্রচণ্ড ক্লান্তিতে ঘুম চলে এলো। ১০টার দিকে খিদেয় ঘুম ভাঙল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি রোদ উঠছে, সাগর আস্তে আস্তে শান্ত হচ্ছে, কিচেনে গিয়ে দেখি একটা ফ্রিজ বাদে বাকি সব ফ্রিজ যেগুলো ফিক্সড করা ছিল না, সব একেক দিকে ছড়িয়ে আছে, চিফ কুক রান্নার বদলে কিচেন গোছানোয় ব্যস্ত। কোনোমতে দুই টুকরা পাউরুটি আর একটু জেলি নিয়ে আপাতত ক্ষুধা মিটিয়ে রুমে গিয়ে আরেক ঘণ্টা রেস্ট নিলাম। আবার দুপুর ১২টা, যতই ঝড় আসুক, ডিউটি টাইম তো এক মিনিটও এদিক-সেদিক হবে না। বয়লার স্যুটটা পরে নিয়ে আবার ইঞ্জিনরুমে। ইঞ্জিন তখন আবার দেশের দিকে জাহাজ নিয়ে চলছে। রাতে ডিনার শেষে সবাই আবার চিরাচরিত গান-বাজনা নিয়ে মেতে উঠলাম, কেউ কেউ আগের রাতের ঝড়ের ধকল তখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আমার বমি করার খবর তো কেউ জানে না, সেই সুযোগে আমিও বেশ কয়েকজন সহকর্মীকে নিয়ে মজা করলাম। রাত গভীর হতে হতে মোবাইলে নেটওয়ার্ক এলো, ভাবলাম বাসায় চিন্তা করবে, আম্মাকে ফোন দিয়ে জানালাম ভালো আছি। একে একে সবার কল, মেসেজ। সবাই আমাকে নিয়ে চিন্তিত। ভালো আছি শুনে সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। আমিও রেডি হচ্ছিলাম রাতের ডিউটির জন্য। ল্যাপটপে গান ছাড়লাম, ইটস মাই লাইফ!

 

শহিদুল আলম সুমন

ইঞ্জিন ক্যাডেট, এমভি জাহান


মন্তব্য