kalerkantho


শীতের কাপড় নেই টেন্ডার জটিলতায়!

শেখ রাসেল শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র

মো. মাহবুবুল আলম, টঙ্গী (গাজীপুর)   

৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



শীতের কাপড় নেই টেন্ডার জটিলতায়!

টঙ্গীর শেখ রাসেল শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের নিবাসী শিশুরা শীতে জবুথবু। ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রতি রাতে ৪০ থেকে ৫০ জন শিশু বিছানায় প্রস্রাব করে। ভিজে যায় বিছানার চাদর, লেপ, তোশক। এগুলো শুকানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। দুর্গন্ধ আর গুমোট বিছানায়ই থাকতে হয় তাদের। নিয়ম অনুসারে ভোরে বিছানা ছেড়ে ঠাণ্ডা পানিতেই গোসল সেরে পরিচ্ছন্ন হতে হবে। ছয়-সাত বছরের এই শিশুরা শীতে কাঁপে। জবুথবু হয়ে অপেক্ষা করে সূর্যের আলোর। কারণ এ শিশুদের নেই কোনো গরম কাপড়। টেন্ডার জটিলতার কারণে অসহায় দুস্থ শিশুদের জন্য সোয়েটার বা কম্বল সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না! এটি টঙ্গীর শেখ রাসেল শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের নিবাসী শিশুদের বর্তমান বাস্তবতা।

পথশিশু, পাচার হওয়া শিশু, পালিয়ে আসা, হারিয়ে যাওয়া, এতিম, দুস্থ, যৌন নির্যাতনের শিকার ও বহুমাত্রিক ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের আশ্রয় ও প্রশিক্ষণ দিয়ে পুনর্বাসন করার লক্ষ্যে এই প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি। টঙ্গীর দত্তপড়ায় ২০১৩ সালে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতায় যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। ১০০ সিটের এই কেন্দ্রে বর্তমান নিবাসীর সংখ্যা ১২২।

নিরাপদ আশ্রয়, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান, মনো-সামাজিক সহায়তা, খেলাধুলা, শরীরচর্চা, প্রয়োজনীয় পোশাক ও খাবার সরবরাহ করে শিশুদের প্রশিক্ষিত করে পুনর্বাসিত করা হয় এখান থেকে। গত শুক্রবার সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন এই প্রতিনিধি। সকাল ৯টায় পুনর্বাসন কেন্দ্রের আঙিনায় জড়সড় হয়ে বসে আছে শিশুরা। সবাই শীতে কাঁপছে। জানতে চাওয়া হয় গরম কাপড় গায়ে নেই কেন? সবাই সমস্বরে জবাব দেয়, ‘নাই নাই।’ কেউ লুঙ্গিতে, কেউ পুরনো চাদরে ঢেকে রেখেছে শরীর। কী দিয়ে ভাত খেয়েছ জানতে চাইলে সবাই চিৎকার করে বলে, ‘আলু ভর্তা।’ এ সময় কেন্দ্রের আউটরিচ ওয়ার্কার রাকিব হোসেন এগিয়ে এসে বলেন, ‘ম্যাডামের অফিস রুমে এসে বসেন, এভাবে বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলবেন না।’ রাকিব হোসেন মোবাইলে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। সবাইকে অফিসে আসতে বলছেন। সাড়ে ৯টায় কেন্দ্রের প্রধান দায়িত্বশীল উপপ্রকল্প পরিচালক সৈয়দা হাসিনা আক্তার এলেন। কেন্দ্রে কর্মরত রয়েছেন ১৫ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী। নাইট গার্ড মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ ছাড়া আর কারো দেখা মিলল না। অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোথায় আছেন জানতে চাইলে বলা হয় ৩৪ জন শিশুকে ভোর সাড়ে ৬টায় গাজীপুরে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সুন্নতে খতনার জন্য নেওয়া হয়েছে। সঙ্গে সব কর্মকর্তা-কর্মচারী গেছেন। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালে খতনার জন্য নেওয়া হয়েছে মাত্র সাতজন শিশু।

প্রতিটি শিশুর তেল, সাবান, প্রশিক্ষণ, খাবার ও জ্বালানি বাবদ মাসিক বরাদ্দ দুই হাজার ৫০০ টাকা। খাবার মেন্যুতে মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ডাল, সবজি, ভাত সবই আছে। তবে শিশুদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেন্যুর সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। মৌসুমি ফল, দুধ এবং শিশুদের মনের ইচ্ছায় কোনো কিছুই পায় না তারা। বছরে চার সেট পোশাক দেওয়ার কথা। খয়েরি রঙের শার্ট, নেভি ব্লু প্যান্ট, চেক শার্ট এবং মাথা পর্যন্ত ঢাকা কার্ডিগান; কিন্তু শিশুদের পরনে এগুলোর কিছুই নেই। কথা হয় নিবাসী শিশু মমিনুল, ইয়াসিন, মোস্তাকিম, মাসুদসহ আরো অনেকের সঙ্গে। তারা প্রায় সবাই হারিয়ে যাওয়া শিশু। কেউ বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে। কাউকে আবার রাস্তা থেকে পুলিশ ধরে এনেছে। জানতে চাইলে কেউ কেউ বলে, ভালো আছি। আবার কেউ চুপ থাকে।

অনেকে বলেছে ৩০-৪০ জন শিশু এখান থেকে পালিয়ে গেছে। এখানে তাদের বিনোদন বলতে শুধু একটি টিভি সেট। খেলাধুলার কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না। ২০-২২ জন শুয়ে আছে বিছানায়। তারা জলবসন্ত রোগে আক্রান্ত। এই কেন্দ্রে চিকিৎসা বলতে তেমন কিছু নেই। একজন প্যারামেডিকস আছেন। চারটি সেলাই মেশিনে তাদের প্রশিক্ষণ চলে। আশপাশের ইলেকট্রিক্যাল ও ফার্নিচারের দোকানে নিয়ে তাদের কাজ শেখানো হয়। সার্বক্ষণিক শিশুদের দেখাশোনার জন্য রয়েছেন হাউস মাদার হাবিবা আক্তার। তিনি ছুটিতে আছেন। শিশুদের দেখাশোনা করেন এখন গার্ড মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। আবদুল্লাহ জানান, ২৪ ঘণ্টাই তাঁর ডিউটি। কেন্দ্র দেখাশোনার জন্য তিনিই যথেষ্ট।

শেখ রাসেল শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রের এত সব সমস্যার ব্যাপারে জানতে চাইলে উপপ্রকল্প পরিচালক সৈয়দা হাসিনা আক্তার বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া সব কথা বলা যাবে না।’


মন্তব্য