kalerkantho


কলাপাড়া পৌর শহর

খাবার পানিতে অবিশ্বাস

জসীম পারভেজ, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)   

৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



খাবার পানিতে অবিশ্বাস

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় পৌরসভার সাপ্লাই পানির ওপর ভরসা না থাকায় একটি রেস্টুরেন্টে ফিল্টার মেশিন বসানো হয়েছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

কলাপাড়া পৌর শহরে সরবরাহ করা পানি লালচে ও আঠালো। পেট খারাপ না হলেও এই পানিতে ত্বকের ক্ষতি হচ্ছে। আর পানি এমন হওয়ার কারণ নির্ণয় করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। তারা নমুনা পাঠিয়েছে সুইজারল্যান্ডে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, পৌরবাসীর পানির চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ২০০৫ সালে ডিপিএইচই ডানিডার প্রায় দুই কোটি টাকা অর্থায়নে শহরের মোজাহার উদ্দিন বিশ্বাস কলেজ চত্বরে স্থাপন করা হয় ট্যাংক। এর ধারণক্ষমতা পাঁচ লাখ লিটার। শুরুতে ট্যাংক থেকে সরবরাহ করা পানির রং দেখে ঘাবড়ে যেত মানুষ। এটা পানে পেটের পীড়া না হলেও ত্বক অসুস্থ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এত দিন পৌরবাসী এই পানি ব্যবহার করলেও এখন বিকল্প ব্যবস্থা নিচ্ছে। বিশেষ করে রেস্টুরেন্ট, খাবার হোটেল এবং বাসাবাড়িতে অতিরিক্ত টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা হচ্ছে শোধনযন্ত্র (ওয়াটার ফিল্টার)।

পৌর শহরের বাসিন্দা মো. বশির উদ্দিন জনান, পৌরসভার পানি দিয়ে রান্না করা যায় না। ভাত ও তরকারি রান্না করলে রং ও গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়। আর গোসল করলে শরীর আঠালো এবং চুল বিবর্ণ হয়ে যায়। মাঝেমধ্যে কারো কারো শরীর চুলকায়। শহরের বহু পরিবার এবং হোটেল ব্যবসায়ীরা এই পানি সরাসরি ব্যবহার করছে না। সবাই শোধন করে নিরাপদ পানি ব্যবহার করছে।

শহরের রেস্টুরেন্ট সাহা কেবিনের মালিক গৌতম চন্দ্র সাহা জানান, তিনি ছয় মাস আগে ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি শোধনযন্ত্র স্থাপন করেছেন। আগে পানির রং দেখে কলাপাড়ায় আসা পর্যটকরা ঘাবড়ে যেত। তারা বোতলের সুপেয় পানি কিনে আনত। এখন তিনিই নিরাপদ পানি দিচ্ছেন।

শহরের লঞ্চঘাটের কালাম খাবার হোটেলের মালিক মো. কালাম হোসেন বলেন, ‘শোধনযন্ত্র স্থাপন করে পৌরসভার সরবরাহ করা পানির গাঢ় লালচে রং সাদা এবং নিরাপদ করে ক্রেতাদের পান করাচ্ছি। এতে আমাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, নিরাপদ পানি পান করানোর ফলে ভোক্তাদের রোগ আক্রান্তের আশঙ্কা দূর হচ্ছে।’

খেপুপাড়া মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবু ছাইদ জানান, পৌরসভার পানি দেখে তাঁর কাছে তেমন নিরাপদ মনে হয় না। তাঁর বাসার কাছে একটি গভীর নলকূপ রয়েছে। সেটির পানিও লালচে। এই পানিও রান্নার কাজে ব্যবহার করা যায় না। ভাত ও তরকারির রং পরিবর্তন ও স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে তিনি ২৩ হাজার টাকা ব্যয় করে একটি শোধনযন্ত্র ব্যবহার করছেন। প্রতি মাসে ২০০ টাকা ব্যয়ে এর কার্বন পরিবর্তন করতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে কলাপাড়া পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মিজানুজ্জামান জানান, পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তাঁরা নিশ্চিত হয়েছেন, পৌর সভার পানি নিরাপদ এবং খাবার উপযোগী। এই পানির প্যারামিটার (মান) ঠিক রয়েছে। তবে এতে লালচে ও আঠালো উপাদান রয়েছে। এই সমস্যা দূর করতে এবং জনমনের ভীতি কমাতে পানির ট্যাংকে অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন একটি শোধনযন্ত্র স্থাপন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালের মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত ‘উপকূলীয় শহর পরিবেশগত অবকাঠামো প্রকল্প’ আওতায় এটি স্থাপন করা হবে।

কলাপাড়া উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. জিহাদ হোসেন জানান, এলাকার গভীর নলকূপ ও পৌরসভার সরবরাহ করা পানির রং এবং অন্যান্য উপাদান নিয়ে গত বছরের এপ্রিল-মেতে ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সরকারের সহযোগিতায় পানির নমুনা সংগ্রহ করে বরিশাল আঞ্চলিক পরীক্ষাগার ও ঢাকার মহাখালীতে পরীক্ষা করা হয়েছে। পানির রং লালচে হওয়ায় তাঁরা প্রথমে ধারণা করছিলেন, এতে অধিক পরিমাণে আয়রন রয়েছে। ল্যাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিশ্চিত করেছে, রং লালচে হলেও এটি ব্যবহার উপযোগী। পানিতে সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে আর্সেনিক, ক্লোরাইড, ম্যাঙ্গানিজসহ সব উপাদান। তবে উচ্চপর্যায়ে আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। তিনি বলেন, ‘উন্নত পরীক্ষার জন্য নমুনা সুইজারল্যান্ডের গবেষণাগারে পাঠানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রতিবেদন আমাদের হাতে আসেনি। আমরা এই প্রতিবেদন পেলে নিশ্চিত হতে পারব, এই অঞ্চলের পানিতে আয়রন সহনীয় মাত্রায় থাকলেও রং কেন এত লাল ও আঠালো।’

 


মন্তব্য