kalerkantho


মুখ থুবড়ে পঞ্চগড়ের স্বাস্থ্যসেবা

সাত চিকিৎসক ‘নিখোঁজ’

লুৎফর রহমান, পঞ্চগড়   

১৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সাত চিকিৎসক ‘নিখোঁজ’

সাত চিকিৎসক যোগদান করার পর আর কোনো দিন অফিস করেননি। তাঁদের কেউ এক বছর আবার কেউ সাত বছর ধরে অনুপস্থিত। পঞ্চগড় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের এক পরিসংখ্যানে এ তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা ঊর্ধ্বতনদের লিখিতভাবে জানালেও কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে ১৫২টি পদের বিপরীতে চিকিৎসক রয়েছেন ৩৩ জন। তাঁদের মধ্যে অনুপস্থিতরা হলেন ২০১০ সালের ২৬ জুলাই মাগুড়া ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে সহকারী সার্জন সাজিয়া পরভীন, ২০১৭ সালের ৫ মে বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা কর্মকর্তা (এমও) মো. আব্দুল কাদের তালুকদার, ২০১৭ সালের ১৩ জানুয়ারি একই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সহকারী সার্জন ডা. সাহিদুর রহমান, ২০১৭ সালের ৫ মে বোদা উপজেলার পাঁচপীর ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে সহকারী সার্জন আবু সাদাত মো. সহিদ শরীফ, ২০১১ সালের ১০ জুলাই একই উপজেলার ঝলই শালশিরি ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে সহকারী সার্জন ডা. তানিয়া তাজরিন লায়লা, ২০০৬ সালের ১ ডিসেম্বর আটোয়ারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এমও মাহমুদুল হুদা এবং ধামোর ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডা. মো. ইকবাল হোসেন। তাঁরা যোগদান করার পর আর অফিস করেননি। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

১০ লাখ মানুষের ৩৩ চিকিৎসক

জেলার প্রায় ১০ লাখ মানুষের জন্য চিকিৎসক রয়েছেন ৩৩ জন। প্রয়োজনীয় জনবল আর অবকাঠামোর অভাবে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এ জেলার মানুষ।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ষাটের দশকে পঞ্চগড় মহুকুমায় ক্ষুদ্র পরিসরে নির্মিত পঞ্চগড় স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ১৯৮৪ সালে জেলা ঘোষণার পর উন্নীত হয় ৫০ শয্যার সদর হাসপাতালে। ২০০৫ সালে এই হাসপাতালটি ১০০ শয্যায় উন্নীত হয়ে পরিণত হয় আধুনিক সদর হাসপাতালে। এর পর থেকে শুরু হওয়া চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় জনবল সংকট আজও ঘোচেনি। ছোট জেলা শহরে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের সুযোগ কম হওয়ায় সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকরা এখানে এসে বেশি দিন থাকতে চান না।

সদর হাসপাতালটিতে প্রতিদিন বহির্বিভাগে ৩০০-৪০০ রোগী সেবা নেয়। আন্তর্বিভাগে ভর্তি থাকে প্রায় ১৪০ থেকে ১৫০ জন। ১০০ শয্যা হওয়ায় প্রায় সব সময় ৪০-৫০ জন রোগীকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হয়। এই আধুনিক সদর হাসপাতালটিতে ৩৬ পদের বিপরীতে চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ১২ জন। আবার এর মধ্যে বেশির ভাগ চিকিৎসককে নির্ধারিত সময়ে হাসপাতালে পাওয়া না যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গাইনি, চক্ষু, চর্ম ও যৌন, নাক-কান-গলাসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে নেই কোনো কনসালট্যান্ট। প্যাথলজিস্ট ও রেডিওলজিস্টের একটি করে পদের দুটি খালি। নিরুপায় রোগীরা তাই বেশি টাকা দিয়ে প্রায় মানহীন বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে বাধ্য হচ্ছে। একই অবস্থা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে। তেঁতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে ২৮ জন চিকিৎসকের পদের বিপরীতে রয়েছেন তিনজন, আটোয়ারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে ১৫ জন চিকিৎসকের পদের বিপরীতে রয়েছেন তিনজন, বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে ২৮ জন চিকিৎসকের পদের বিপরীতে রয়েছেন পাঁচজন এবং দেবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৩১ জন চিকিৎসকের পদের বিপরীতে রয়েছেন পাঁচজন। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদ শূন্য রয়েছে ১৪০টি। আবার রোগীদের বেশির ভাগ ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া সম্প্রতি দালালদের দৌরাত্ম্য বেড়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছে রোগী ও তাদের স্বজনরা।

এদিকে ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্য রাতে ৩৬টি ছিটমহল বাংলাদেশ ভূখণ্ডে অধিভুক্ত হওয়ায় জেলায় যুক্ত হয়েছে প্রায় ২০ হাজার নতুন বাংলাদেশি। বৃহৎ এই জনগোষ্ঠী পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালনির্ভর হলেও তাদের জন্য বাড়েনি কোনো অবকাঠামো বা শয্যা। এতে স্বল্প জনবল নিয়ে জেলার এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।

স্থানীয় স্কুলশিক্ষক আব্দুল মতিন বলেন, ‘আমাদের এখানে হাসপাতাল আছে; কিন্তু চিকিৎসা নেই। একটু গুরুতর হলে রোগীকে নিয়ে ছুটতে হয় রংপুর দিনাজপুরে। দরিদ্র মানুষের পক্ষে যাতায়াত খরচ বহন করা সম্ভব হয় না। এভাবে দূরের হাসপাতালে যেতে অনেক রোগী মারাও যায়।

পঞ্চগড় মকবুলার রহমান সরকারি কলেজের ছাত্র রবিউল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘদিন থেকে হাসপাতালের এই একই চিত্র দেখতেছি। ডাক্তার নেই, ডাক্তার নেই, শুনেই যাচ্ছি। কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছে না।

আমলাহার এলাকার রোগী ফাতেমা বেগম বলেন, ‘সারা দিনে মাত্র একবার ডাক্তার এসে দেখে যান। আর ওষুধ যা লেখে দেন এর বেশির ভাগ বাইরে থেকে কিনতে হয়। দালালের খপ্পরে পড়ে আমি বাইরে থেকে বেশি টাকায় এক্স-রে করেছি। অথচ হাসপাতালে কম খরচে এক্স-রে করা যায়।

পঞ্চগড় সিভিল সার্জন ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি অল্প কয়েক দিন হলো যোগদান করেছি। চিকিৎসক সংকটের মধ্যে সাধ্যমতো সেবা দিয়ে যাচ্ছি। তবে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় রূপান্তরের কাজ চলমান। হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত হলে চিকিৎসকের সংকট অনেকটা কমে আসবে।


মন্তব্য