kalerkantho


শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন

প্রিয় দেশ ডেস্ক   

১৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন

তীব্র শীতে জামালপুর, রাজবাড়ী, নীলফামারী, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। লোকজন কাজে বাইরে বের হতে পারছে না। আয়-রোজগার কমে যাওয়ায় বিপদে পড়েছে শ্রমজীবী মানুষ। হাসপাতালে বেড়েছে শীতজনিত রোগী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমে গেছে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি। অনেক এলাকায় দুপুরের পর সূর্যের দেখা মিললেও রোদে উত্তাপ থাকে না। বোরো ধানের বীজতলা ও আলুক্ষেতে বিরূপ প্রভাব পড়েছে।

নীলফামারীতে বিরূপ প্রভাব আলুক্ষেতে

নীলফামারীতে শনিবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শুক্রবারের চেয়ে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়লেও দাপট কমেনি শীতের। ঘন কুয়াশার সঙ্গে হিমেল হাওয়ায় বিপর্যস্ত জনজীবন। টানা শৈত্যপ্রবাহে বিপাকে পড়েছে পশু-পাখিও। শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কমেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। বিরূপ প্রভাব পড়েছে আলুক্ষেতে।

জেলা সদরের বিভিন্ন গ্রামে গতকাল দুপুর দেড়টার দিকেও শীতের কাপড় জড়িয়ে গুটিয়ে থাকতে দেখা গেছে অনেককে। কনকনে শীতে ক্ষেতখামারে কাজে নামতে পারেনি কৃষি শ্রমিকরা। টুপামারী ইউনিয়নের কিসামত দোগাছি গ্রামের কৃষক মাহবুব হোসেন (৫০) বলেন, ‘বোরোর বীজতলায় চারার বয়স হয়েছে; কিন্তু শীতে জমিতে নামা সম্ভব হচ্ছে না। তাই চারা রোপণ পিছিয়ে পড়ছে।’ একই গ্রামের আনোয়ার হোসেন (৪৫) বলেন, ‘হামেরা দিন মিলি দিন খাই। ঠাণ্ডাত আধেক বেলা কামোত নেয় না কাহো। দুপুরের পর আধেক বেলার কামের মজুরি দিয়া হামার সংসার চলে না।’

নীলফামারী সদর আধুনিক হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ দিলীপ কুমার রায় বলেন, ‘শীতজনিত রোগে শিশুরা আক্রান্ত হয় বেশি। মানুষের মধ্যে সচেতনতা বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালে রোগী কম আসছে। ঠাণ্ডায় শিশুর সর্দি-কাশি দেখা দিলে চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন অভিভাবকরা।’ তিনি বলেন, ‘এই শীতে শিশুদের গরম কাপড় পরাতে হবে। ঘরের বাইরে আনা, ঠাণ্ডা খাবার খাওয়ানো যাবে না। পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে হবে। কোনো অসুস্থতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে।’

কিসামত দোগাছি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোসাব্বের হোসাইন গতকাল দুপুরে বলেন, ‘প্রচণ্ড শীতে গরম কাপড়ের অভাবে অনেকে বিদ্যালয়ে আসছে না, অনেকে দেরিতে আসছে।’ গতকাল তাঁর বিদ্যালয়ে ১৫২ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১০৪ জন আসে বলে জানান তিনি। এমন চিত্র অন্যান্য বিদ্যালয়েও।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এ টি এম আখতারুজ্জামান বলেন, এ বছর সরকারিভাবে বিতরণের জন্য ৪৬ হাজার ৯৩৭টি কম্বল পাওয়া গেছে। শনিবার পর্যন্ত ৪৫ হাজার বিতরণ করা হয়েছে। আরো ১৫ হাজার কম্বল ও ২০ হাজার জ্যাকেট-সোয়েটার বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক মো. আবুল কাশেম আযাদ বলেন, ‘শৈত্যপ্রবাহের বিরূপ প্রভাব বোরো আবাদে এখনো পড়েনি। আলুক্ষেতে কিছুটা পড়ছে। চাষিরা সচেতন আছে। তারা ক্ষেতে ছত্রাকনাশক ছিটাচ্ছে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে সার্বক্ষণিক নজর রাখছেন।’

জামালপুরে নদীতীরে কাঁপুনি

ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদ-নদী বিধৌত জামালপুর জেলায় প্রচণ্ড শীতে কাঁপছে মানুষ। সাত দিন ধরে দুপুরের পর রোদের দেখা মিললেও শীতের তীব্রতা কমছে না। ঠাণ্ডায় স্বাভাবিক চলাফেরায় বিঘ্ন ঘটছে। বিশেষ করে ইসলামপুর উপজেলার যমুনার তীরবর্তী ও দুর্গম চরাঞ্চলের অভাবী ও বন্যায় ঘরবাড়ি হারানো মানুষ গরম কাপড়ের অভাবে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছে। অনেকেই ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়েছে। ঘন কুয়াশায় ধানের বীজতলা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছে কৃষকরা। শীতে কাবু হয়ে পড়েছে পশু-পাখিও।

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, ইসলামপুরে শীতের তীব্রতা তুলনামূলক বেশি। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন দুপুর পর্যন্ত জামালপুর শহরসহ জেলার সাতটি উপজেলাই ঘন কুয়াশায় ঢেকে থাকে। তবে যমুনার চরাঞ্চলবাসীর দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে গেছে। প্রয়োজনীয় গরম কাপড় না থাকায় প্রায় নির্ঘুম রাত কাটে দরিদ্র মানুষের। কাঠ-খড়ের জ্বালানো আগুনের উত্তাপই তাদের ভরসা। অন্য বছর শীতের শুরুতে দানশীলরা চরাঞ্চলে কম্বল ও গরম কাপড় বিতরণ করলেও এবার এখনো তাদের দেখা মেলেনি। সরকারিভাবে বিতরণ করা কম্বলও পর্যাপ্ত নয়। গেল বন্যায় আক্রান্ত চরাঞ্চলে ছাপরা ও চালাঘরে থাকা পরিবারগুলো খুব কষ্টে দিন পার করছে। খেটে খাওয়া মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। শিশু ও বয়স্কদের অনেকেই ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়েছে। কাবু হয়ে পড়েছে পশু-পাখিও। এদিকে ঘন কুয়াশায় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় অনেক কৃষকই বোরো ধানের বীজতলা পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিচ্ছে।

ইসলামপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে শীতার্ত মানুষের মাঝে এ পর্যন্ত আট হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। এবারের তীব্র শীতে কম্বলের চাহিদা অনেক বেশি। তবে বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’ 

শাহজাদপুরে গরম কাপড়ের দাম বেশি

শীত জেঁকে বসায় কাতর হয়ে পড়েছে উপজেলাবাসী। তারা শীতের কাপড় কিনতে দোকানে-ফুটপাতে ভিড় করছে। এ সুযোগে কাপড়ের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে দোকানিরা। গতকাল শনিবার সকালে ঘন কুয়াশার মধ্যেই যমুনা নদীর চরসহ প্রায় ১০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে সোনাতনি ইউনিয়নের আগবাঙালা গ্রামের আমির আলী উপজেলা সদরে এসেছিলেন তাঁর দুই শিশুসন্তান ও বৃদ্ধ মায়ের শীতবস্ত্র কিনতে। কিন্তু দাম বেশি থাকায় তিনি গরম কাপড় (সোয়েটার) দোকান থেকে কিনতে পারেননি, কিনেছেন ফুটপাত থেকে। এখানেও তাঁকে বেশি দাম দিতে হয়েছে। গতকাল ক্রেতাদের অভিযোগ ছিল, শীতের শুরুতে গরম কাপড়ের যে দাম ছিল এখন তার চেয়ে অনেক বেশি নেওয়া হচ্ছে।

রাজবাড়ীতে বাইরে বের হওয়া যায় না

শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে রাজবাড়ীর জনজীবন। কুয়াশা ও হিমেল বাতাসে ছিন্নমূল ও নিম্ন আয়ের মানুষ এবং স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা পড়েছে বিপাকে। শীতে কাজের বাইরে বের হওয়া যায় না। আয়-রোজগার কমে গেছে, দেখা দিয়েছে গবাদি পশুর খাবার সংকটও। এদিকে জেলার হাসপাতাল, ক্লিনিক ও স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রগুলোতে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। এদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা বেশি।

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন কালের কণ্ঠ’র জামালপুর, রাজবাড়ী, নীলফামারী ও শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি।]



মন্তব্য