kalerkantho


কর্মসৃজনের শ্রমিক কাজ করে মেম্বারের খামারে!

আলম ফরাজী, ময়মনসিংহ (আঞ্চলিক)   

১৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



কর্মসৃজনের শ্রমিক কাজ করে মেম্বারের খামারে!

কর্মসৃজন প্রকল্পের শ্রমিকদের দিয়ে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার সরিষা ইউনিয়নের মেম্বার নিজের পুকুর খননের পাশাপাশি মুরগি খামারে মাটি ভরাট করাচ্ছেন। ছবিটি গতকাল দুপুরে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে অতিদরিদ্রদের জন্য ৪০ দিনের কর্মসৃজন কর্মসূচির শ্রমিক দিয়ে বিধিবহির্ভূতভাবে ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যের (ইউপি মেম্বার) মুরগির খামারে মাটি ভরাটের কাজ করানো হচ্ছে। আরেক মেম্বারের শ্যালক শ্রমিকের তালিকায় থেকে কাজ না করেই তদারকির দায়িত্ব নিয়েছেন। গতকাল বুধবার দুপুরে ঘটনাস্থল সরিষা ইউনিয়নে গিয়ে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।

গত ২৩ ডিসেম্বর থেকে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে ৪০ দিনের কর্মসৃজন কর্মসূচির কাজ শুরু করেন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও)। তাঁর দপ্তর থেকে জানা যায়, পাঁচ হাজার ১৬৭ জন শ্রমিকের বিপরীতে চার কোটি ৩৭ লাখ ২৮ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়েছে। গতকাল দুপুরে সরিষা ইউনিয়নের মাছিমপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রুহুল আমীনের তত্ত্বাবধানে শ্রমিক ২৪ জন আছে। এর মধ্যে আটজন শ্রমিক রুহুলের পুকুর থেকে মাটি কেটে পাশেই তাঁর মুরগির খামারের আশপাশ ও ভিটায় মাটি ভরাটের কাজ করছে। পাশের ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শহীদুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে শ্রমিক আছে ২০ জন। কিন্তু কাজ করছে ১১ জন। সেখানে ওই শ্রমিকদের সঙ্গে আছেন শফিকুলের শ্যালক নুরুল ইসলাম।

তিনি জানান, দুলাভাইয়ের কাজটিই তিনি তদারকি করেন। সঙ্গে শ্রমিকদের তালিকায়ও তাঁর নাম আছে। অথচ এই ইউনিয়নে কাজ তদারকির জন্য উপজেলা সহকারী পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. মোসলেম উদ্দিনকে ট্যাগ অফিসার হিসেবে নিয়োজিত। কিন্তু এই দুই ইউপি সদস্যের কেউই ট্যাগ অফিসারের নাম জানেন না। আবার কাজ শুরুর পর থেকে ওই কর্মকর্তা একবারও আসেননি। তবে তিনি বলেন, ‘আমি সম্ভবত দুই-তিন দিন গিয়েছি। তখন তো ভালো কাজ হয়েছে দেখলাম।’ শ্রমিকদের কাছে হাজিরা খাতা না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এইবার এসে সব ব্যবস্থা করব।’

ইউপি সদস্য মাছিমপুর গ্রামের রহুল আমীনের খামারে মাটি ভরাটে কর্মরত শ্রমিকদের সর্দার মো. আতাবুর রহমান (৫০)। তিনি জানান, তাঁরা সকাল থেকে মাটি ভরাটের কাজ করছেন। মেম্বারের নির্দেশে তাঁরা কাজ করছেন। সেখানে জিন্সের প্যান্ট পরা রুমান মিয়া (১৪) নামে এক কিশোর জানায়, সে রুহুল আমীনের ভাগ্নে। তার নাম এই প্রকল্পে শ্রমিক হিসেবে রাখা হয়েছে। খবর পেয়ে কর্মস্থলে ছুটে আসেন রুহুল। তিনি বলেন, কামালের বাড়ি থেকে কুশিপাড়া পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার প্রকল্পের কাজ করছেন তিনি। প্রকল্পের শ্রমিক দিয়ে নিজের মুরগির খামারে মাটি ভরাটের কাজ করানো বিষয়ে রুহুল দাবি করেন, ‘এটি মাদরাসার ঘর।’ কিন্তু একই গ্রামের লোকজন জানায়, স্থাপনাটি মুরগির খামার করার জন্য তৈরি করা হয়েছে, মাদরাসার জন্য নয়। গ্রামের ওয়াজেদ আলী (৮০) এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। রুহুল জানান, তাঁর আওতায় ২৪ জন শ্রমিক আছে। তবে মাটি ভরাটকাজে আটজন শ্রমিককে উপস্থিত পাওয়া যায়। শ্রমিকের তালিকা, হাজিরা খাতা দেখতে চাইলে রুহুল দেখাতে পারেননি। তদারকি কর্মকর্তার নামও বলতে পারেননি।

দুপুর দেড়টার দিকে একই ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের এনায়েতনগর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, একটি সড়কের পাশে তিন নারীসহ ১১ জন শ্রমিক বসে আছে।

কর্মরত শ্রমিকদের সর্দার মো. সিদ্দিক মিয়া (৫৫) জানান, এখানে প্রতিবন্ধী কোটায় কোনো শ্রমিক নেই। তবে নারী শ্রমিক আছে। শ্রমিকের তালিকায় স্থানীয় মসজিদের মুয়াজ্জিন, ইউপি সদস্য শহীদুল ইসলামের শ্যালক নুরুল ইসলামকে (৩৮) রাখা হয়েছে। কর্মস্থলে শ্রমিকরা কোদাল হাতে কাজ করলেও নুরুলকে প্যান্ট ও জ্যাকেট গায়ে হাতে মুঠোফোন নিয়ে রাস্তায় ঘুরতে দেখা যায়। শ্রমিকের তালিকের শ্যালককে রাখা প্রসঙ্গে শহীদুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি হেসে উড়িয়ে দেন। তিনিও তদারক কর্মকর্তার নাম বলতে ও শ্রমিকের তালিকা দেখাতে পারেননি।

গতকাল বিকেল ৪টার দিকে প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ, শ্রমিক কতজন ইত্যাদি বিষয়ে জানতে চাইলে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম জানান, তিনি এই মুহূর্তে বাইরে আছেন। সরিষা ইউনিয়নে ট্যাগ অফিসারের বিষয়ে বলেন, তিনি উপজেলায় নতুন এসেছেন, অফিসে গিয়ে ওই কর্মকর্তার নাম জেনে বলবেন। এরপর প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়ে জানতে বেশ কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি।


মন্তব্য