kalerkantho


জীবন চলে গাছের ছালে

হাকিম বাবুল, শেরপুর   

১৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



জীবন চলে গাছের ছালে

শেরপুর শহরের পশ্চিম শেরী এলাকায় গাছের ছাল ছাড়ানোর কাজে ব্যস্ত এক নারী। ছবি : কালের কণ্ঠ

কত বিচিত্র পেশা আছে দুনিয়ায়। শেরপুর শহরে অনেক নারী আছে যারা গাছের ছাল (বাকল) তুলে বেচে সংসার চালায়। তারা ‘ছাল শ্রমিক’ বা ‘ছালজীবী’ হিসেবে পরিচিত। তবে তারা আসলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বা উদ্যোক্তা। কারণ তারা করাতকল (সমিল) মালিকদের কাছ থেকে গাছের গুঁড়ি নিয়ে ছাল ছাড়িয়ে শুকিয়ে বাসাবাড়িতে বেচে। ছাল ছাড়ানোর পর তারা ওই গুঁড়ি ফেরত এবং ছালের জন্য টাকা দেয় করাতকল মালিকদের।

শেরপুর শহরের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চকপাঠক, নামা শেরী, অষ্টমীতলা, মধ্য শেরী, পূর্ব শেরী ও পশ্চিম শেরীপাড়া মহল্লায় শতাধিক আসবাবপত্র (ফার্নিচার) কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানার কাঠ চিরাই ও কাঠের জোগান দিতে অষ্টমীতলায় অন্তত ২৫টি করাতকল রয়েছে। এই কারখানা-করাতকলে শত শত শ্রমিক ও কাঠমিস্ত্রি কাজ করে। তাদের পাশাপাশি স্থানীয় অর্ধশত নারীর জীবন চলে গাছের ছালে। তারা সাংসারিক কাজের সঙ্গে ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত ওই সব গুঁড়ি থেকে ছাল তুলে শুকিয়ে নেয়। পরে তারা সেই ছাল স্থানীয় বাসাবাড়িতে বেচে। অনেকেই আবার শুকনো ছাল তাদের বাড়ি থেকেই কিনে নিয়ে যায়। এমনই কয়েকজন হলেন শেরীপাড়ার ফালানী বেগম (৬৭), ফিরোজা বেগম (৬৮), রাশেদা বেগম (৫২), ছালেহা বেগম (৪৮) ও মমতাজ বেগম (৪৬)।

সম্প্রতি পশ্চিম শেরী ও অষ্টমীতলায় গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন বয়স্ক নারী হাতে শাবল আর হাতুড়ি নিয়ে একাশিয়াগাছের ছোট ছোট গুঁড়ি থেকে ছাল উঠিয়ে এক স্থানে জমা করছেন, কেউ কেউ ছাড়ানো ছাল রোদে শুকাচ্ছেন, কেউ বা ছাল আঁটির মতো বাঁধছেন। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়া মেয়ে মনোয়ারা বেগমকে নিয়ে গুঁড়ি থেকে ছাল তুলছিলেন ছয় ছেলে-মেয়ের জননী ফালানী বেগম। তিনি জানান, করাতকল মালিকদের কাছ থেকে তিনি এক ট্রলি গাছের গুঁড়ির ছাল ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ২৫০ টাকা দিয়ে কিনে নেন। এক ট্রলি কাঠের গুঁড়িতে সাত-আট মণ ছাল পাওয়া যায়। সেই ছাল ওঠাতে ও শুকাতে প্রায় দুই দিন লাগে। পরে প্রতি মণ ছাল ৯০ টাকায় বিক্রি করেন। এতে যা লাভ হয় তাতে সংসারের খরচে কিছুটা জোগান দেওয়া যায়। ফালানী বেগম বলেন, ‘এই বয়সেও গাছের ছাল তুইল্লা খাই। সোয়ামী (স্বামী) ভাড়ায় অটো চালায়। বয়সের কারণে ঠিকমতো ভাড়াও মারতে পারে না। পুলাপান সব বিয়াশাদি কইরা আলদা অইয়া গেছে। পাঁচ-ছয় বছর অইলো এই পুরিডার (মেয়ে মনোয়ারা) অসুখ। সোয়ামীয়ে ছাইড়া দিছে। অহন আমগর সাতেই থাহে। জীবন তো আর চলে না। মেম্বররে (ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য) কইছিলাম, একটা কার্ডের (বয়স্ক বা বিধবা ভাতা) কতা। কিন্তু পরিচয়পত্রে বয়সের ভুল আছে কয়। কিছুই তো বুঝি না। একটা কার্ড পাইলে খুব উফুগার অইতো।’

ছালজীবী ফিরোজা বেগম বলেন, ‘এই ছাল তুইল্লা যাই পাই, অইডাই আমগর কাছে অনেক। এই ট্যাহা দিয়া চাইল-ডাইল কিন্না খাই, ঋণ-ধার হোজাই (পরিশোধ করি)। পাঁচ-ছয় বছর ধইরা ছাল তোলার কাম করতাছি। খুব কষ্টের কাম। কিন্তু পেটের জ্বালা তো সহ্য অয় না।’ তিনি বলেন, ‘একটা মেয়ে আছে আমার। বাহুত্তুরা (কর্মহীন) জামাই কোনো খোঁজখবর নেয় না, খাওন-দাওন দেয় না। বয়স্ক বাতা, বিধুফা বাতার কাড চাইয়াও পাইলাম না। তাই ছাল-বাহল তুইল্লা যা পাই তাই দিয়াই দিন খেদাই, খাই-দাই।’

রাশেদা বেগম বলেন, ‘আমরা গবির-দরিব মানুষ। সরকারেও আমগরে খোঁজখবর নেয় না। এইন্না বেইচ্চা সংসারে জোড়াতালি দিওয়ুন নাগে। পুনাইপানরে খাওয়ান নাগে। ছয় বছর আগে বড় পুলাডা মইরা গেছে। একটা পুরি আছিল। বিয়া দিয়া হালাইছি। ঋণ কইরা ঘর দিছিলাম। ছাল বেচার ট্যাহা দিয়া ঘরের ঋণ হোজাইছি।’

গৃহবধূ ছালেহা বেগম বলেন, ‘সংসারের কাজের ফাঁহে আমরা ছাল তুলি। পরে ছাল রাস্তার পাশে শুকাইয়া আশপাশের বাসাবাড়িতে বেচি। এতে আমাদের প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ ট্যাহা লাভ অয়। পরিশ্রম অনুযায়ী এই ট্যাহা খুব বেশি না অইলেও অবাবের সংসারে এইডাই অনেক।’

পশ্চিম শেরীর করাতকল মালিক মো. জহির উদ্দিন (৪৮) ও মো. আব্দুল লতিফ (৪৬) বলেন, এলাকার ৪০-৫০ জন বিধবা, স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়া, দরিদ্র নারী এই ছাল তোলা ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত। তারা ট্রলিপ্রতি আড়াই শ টাকা দিয়ে ছালগুলো কিনে তুলে নেয়। পরে তারা ওই ছাল শুকিয়ে বেচে। এভাবে তারা উপার্জন করে সংসারে সহায়তা করছে। অভাবী এসব নারীর প্রতি সরকারের লোকজনের একটু দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।


মন্তব্য