kalerkantho

পোড়ামাটি

মনিরুজ্জামান, নরসিংদী   

১৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পোড়ামাটি

শিক্ষকের সঙ্গে পোড়ামাটি স্কুলের শিক্ষার্থীরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

নরসিংদীর শিবপুর। এই উপজেলার সোনাকুড়া গ্রামের একটি ইটভাটার পাশে যেতেই কানে ভেসে এলো—‘অ-তে অজগর, আ-তে আম...’। এক যুবক পড়াচ্ছেন আর একদল শিশু তা একসঙ্গে বলে শেখার চেষ্টা করছে। ইটভাটায় পড়াশোনার আওয়াজ! অবাকই হতে হয়।

হ্যাঁ, এখানে রয়েছে ‘মডার্ন ব্রিক ফিল্ড’ ইটভাটার শ্রমিকদের শিশুসন্তানদের জন্য প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় ‘পোড়ামাটি স্কুল’। এখানে সবার প্রিয় ‘স্যার’ আশরাফুল ইসলাম পলাশ। তিনিই বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা ও একমাত্র শিক্ষক।

পলাশের বাড়ি মনোহরদী উপজেলার একদুয়ারিয়া ইউনিয়নের মণ্ডলদিয়া গ্রামে। মণ্ডলদিয়ার পাশের গ্রামেই পোড়ামাটি স্কুল। ইটভাটার শ্রমিকদের শিশুদের আলোর পথ দেখানোর স্বপ্ন দেখতেন পলাশ। সেই স্বপ্নের বাস্তবে যাত্রা শুরু হয় চার বছর আগে। ইটভাটার পাশে একটি দোকান ভাড়া নিয়ে ১৫টি শিশুকে নিয়ে শুরু হয় শিক্ষা কার্যক্রম। চক, ডাস্টার, ব্ল্যাকবোর্ড, পরীক্ষা সবই হয় আর সব বিদ্যালয়ের মতোই। তবে পার্থক্য, যিনি পড়ান তিনি বেতন-ভাতা নেন না। শুরুতে আগ্রহ কম থাকলেও এখন অভিভাবক বা মা-বাবারাই স্কুলে নিয়ে আসেন শিশুদের। বর্তমানে পোড়ামাটির স্কুলের শিক্ষার্থী ২৮ জন। আর পলাশের এই উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে গত ডিসেম্বরে ইটভাটার মালিক আছর আলী সরকার স্কুলের জন্য নির্মাণ করে দিয়েছেন একটি আধাপাকা টিনশেড ভবন।

পোড়ামাটি স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, হোগলা-পাটি বিছানো মেঝেতে বসা ছাত্রছাত্রীদের যত্ন করে পড়াচ্ছেন পলাশ। এই স্কুলে কতটা ভালো পাঠদান হয়, তার প্রমাণ দিল শিক্ষার্থীরাই। জোনাইয়া নামের ছোট্ট মেয়েটি একবারে ১ থেকে ৫০ পর্যন্ত নির্ভুল গণনা করল। ছোট্ট রাজন শোনাল রোমান বর্ণমালা (এ, বি, সি, ডি...)। পাঠদানের পাশাপাশি এখানে স্বল্প পরিসরে বিনোদন ও সাংস্কৃতিক চর্চাও হয়। শিক্ষক পলাশ পারিশ্রমিক পান না; বরং মাস শেষে তাঁকে শিক্ষার্থীদের জন্য ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা জোগাড় রাখতে হয়। হিসাববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও চাকরি ভালো না লাগায় আয়ের উৎস হিসেবে বেছে নিয়েছেন ছোটখাটো ব্যবসা। সেখান থেকেই স্কুলের খরচ মেটানো হয়। সম্প্রতি বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছেন শিক্ষাবিদ নরসিংদী স্কুল-কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও আবদুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজের অধ্যক্ষ ড. মশিউর রহমান মৃধা।

পলাশ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সুবিধাবঞ্চিত শব্দটা শুনলেই মন খারাপ হয়ে যেত। পত্রিকা, টিভিতে এসব অসহায় শিশু নিয়ে নানা সংবাদ আমাকে পীড়া দিত। আবার তাদের জীবনমান উন্নয়নে ব্যক্তি বা সংগঠনের নানা উদ্যোগ আমাকে উৎসাহিতও করত। গ্রামে স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া ছিল কঠিন। তাই সমমনা বন্ধুরা মিলে শীতে গরম কাপড়, ঈদে ঈদসামগ্রী ও গরিব ছাত্রদের বই-খাতা বিতরণকাজে সীমাবদ্ধ ছিলাম। গ্রামে শীতকালে দেখতাম, ইটভাটায় কিছু মহিলা ও পুরুষ ইট বানানোর কাজ করছেন। আর তাঁদের সঙ্গে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা ধুলাবালিতে খেলা করছে। এ মানুষগুলো আমাদের এলাকার ছিল না। জানতে পারলাম, বিভিন্ন ইটভাটায় দেশের দরিদ্র এলাকার মানুষগুলো অনেকটা কৃতদাসের মতো জীবন যাপন করে। অন্য পেশায় যাওয়ার সুযোগ নেই সর্দারের মাধ্যমে দাদনে বাধা পড়ায়।’ পলাশ বলেন, ‘ওই শ্রমিকদের সন্তানদের লেখাপড়ার সুযোগ থাকে না। কারণ তারা নভেম্বর মাসে (শীতের শুরু) ইটভাটার কাজে চলে আসে এবং মে মাসের (বর্ষার শুরু) দিকে বাড়ি ফিরে যায়। এলাকার স্কুলেও লেখাপড়ার সুযোগ হয় না। দেশের হাজার হাজার ইটভাটার লাখ লাখ শিশু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। দিন দিন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে শারীরিক শ্রম যেখানে কমে যাচ্ছে সেখানে লাখো শিশু নিরক্ষর থেকে দেশের বোঝা তৈরি হচ্ছে। যে শ্রমিকরা আমাদের বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে জরুরি ইট তৈরি করছে, তাদের সন্তানদের শিক্ষার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না! এই চিন্তা থেকে আমি ইটভাটার শিশুদের শিক্ষার জন্য ‘পোড়ামাটি স্কুল’ করেছি।’

শ্রমিক সমলা বেগম বলেন, ‘আমার দুই পোলা মোবারক আর পাভেল। তারা পড়ালেহা করব চিন্তাও করতে পারি নাই। পলাশ স্যারের উছিলায় হেরা স্কুলে যাইতাছে। আমগো পোলাপাইনের যেন আমগো মতন ইটভাটায় কাজ না করা লাগে, এই দোয়াই করি।’

মডার্ন ইটভাটার মালিক আছর আলী সরকার বলেন, ‘পলাশের পোড়ামাটি স্কুল আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। তাই আমি স্কুলের জন্য একটি ঘর তৈরি করে দিয়েছি। আমি চাই এই উদ্যোগ সব ইটভাটায় ছড়িয়ে পড়ুক।’

শিক্ষাবিদ মশিউর রহমান মৃধা বলেন, ‘শিক্ষা-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য তথা সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দেখার বিষয় শিক্ষা থেকে শিশুরা বঞ্চিত হচ্ছে কি না। এই পরিপ্রেক্ষিতে তারুণ্যদীপ্ত পলাশের অনন্য উদ্যোগ পোড়ামাটি স্কুল। পলাশ সুবিধাবঞ্চিতদের মধ্যে শিক্ষার আলো জ্বালানোর চেষ্টা করছে। আশা করি দেশের প্রতিটি ইটভাটা কর্তৃপক্ষ ও সরকার পলাশের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাবে এবং অনুরূপ ব্যবস্থা নেবে।’

নরসিংদী জেলা প্রশাসক ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘পোড়ামাটি স্কুলের কথা শুনেছি। উদ্যোগটি অনেক মহৎ। আমি অফিশিয়ালি এ ব্যাপারে ইটভাটার মালিকদের নির্দেশনা দিতে না পারলেও ব্যক্তিগতভাবে পরামর্শ দেব যেন জেলার সব ইটভাটা এটি অনুসরণ করে।’


মন্তব্য