kalerkantho


ভেজাল গুড়ে সয়লাব বাজার

নাটোর ও বড়াইগ্রাম প্রতিনিধি   

২০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ভেজাল গুড়ে সয়লাব বাজার

গুড় তৈরির জন্য রাখা হয়েছে পাঁচ বস্তা চিনি। এর সঙ্গে মেশানো হবে রং, হাইড্রোজ, সোডা, ফিটকিরি, পাথুরে চুন ও গাছের ছালের গুঁড়া। এসব আগুনে জ্বালিয়ে তৈরি করা হয় পাটালি ও খেজুরের গুড়। এ গুড় পাইকারদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে। সম্প্রতি নাটোরের গুরুদাসপুরের চাঁচকৈড় থেকে তোলা ছবি। ছবি : কালের কণ্ঠ

নাটোরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের পরও থামছে না ভেজাল গুড় তৈরি। নোংরা পরিবেশে তৈরি এসব গুড় বিভিন্ন জেলায় বাজারজাত করছে উৎপাদনকারীরা। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে সাধারণ মানুষ। সম্প্রতি বড়াইগ্রাম উপজেলার ছয়টি কারখানায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ভেজাল গুড় জব্দ, পাঁচজনকে কারা ও অর্থদণ্ড এবং লালপুরে চিটাগুড় দিয়ে খেজুর গুড় তৈরির অভিযোগে একজনকে দুই মাসের কারাদণ্ড ও তিনটি কারখানার মালিককে অর্থদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। কিন্তু নানা কারণে অভিযান কমে যাওয়ায় ভেজাল গুড় উৎপাদন চলছেই। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় এসব নিম্নমানের গুড় তৈরি অব্যাহত রয়েছে।

স্থানীয় লোকজন জানায়, শীতে নাটোরের সাতটি উপজেলায়ই কমবেশি গুড় উৎপাদিত হয়। সবচেয়ে বেশি গুড় উৎপাদিত হয় বাগাতিপাড়া, লালপুর, নলডাঙ্গা, বড়াইগ্রাম ও গুরুদাসপুরে। গুরুদাসপুর পৌর সদরের চাঁচকৈড় বাজারে গুড় তৈরির অন্তত ১০টি কারখানা আছে। কারখানাগুলোয় নোংরা পরিবেশে ভেজাল গুড় তৈরি হয়।

চাঁচকৈড়ের কয়েকটি কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, বাজার থেকে কিনে আনা নিম্নমানের গুড় ময়লাযুক্ত মেঝেতে নোংরা স্যান্ডেল পায়ে শ্রমিকরা গুঁড়া করছে। পাশেই রাখা চিনির বস্তা। দিনভর হাইড্রোজ আর কেমিক্যাল মিশিয়ে ভেজাল গুড় তৈরি করা হচ্ছে। আর এসব করছেন স্থানীয় বাদশা, মুক্তার, আজিজ সোনা নামের তিন ব্যক্তি। একাধিক ব্যক্তি জানায়, এলাকার অন্তত ১০ জন ব্যবসায়ী কারখানা খুলে হাজার হাজার মণ ভেজাল গুড় তৈরি করছে। তারা বাজার থেকে কম দামে নিম্নমানের ঝোলা ও নরম গুড় কিনে, গলিয়ে তাতে চিনি, রং, হাইড্রোজ, সোডা, ফিটকিরি, পাথুরে চুন ও বিশেষ গাছের ছালের গুঁড়া দিয়ে গুড় তৈরি করছে। ওই গুড় ট্রাকে ভরে পাঠানো হচ্ছে স্থানীয় হাট-বাজারসহ বিভিন্ন জেলায়; কিন্তু প্রশাসন ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

গুড়ের বড় মোকাম চাঁচকৈড় হাটে গুড় বেচতে আসা জরিপ আলী, শরীফ উদ্দিন ও শাজাহান আলী জানান, বাড়তি লাভের আশায় খেজুর গুড়ের সঙ্গে চিনি মিশিয়ে উৎপাদন ও বাজারজাত করছেন তাঁরা। তা ছাড়া খেজুর গুড়ের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু আশঙ্কাজনক হারে খেজুরগাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় কমছে রসের উৎপাদনও। মজুরি, জ্বালানি খরচ বাড়ায় ভেজালের প্রবণতাও বেড়েছে। চাঁচকৈড়ে মান ভেদে প্রতি কেজি খেজুর গুড় ৮০-৯০ টাকা ও ঝোলাগুড় ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রান্তিক পর্যায়ের মৌসুমি গুড় উৎপাদনকারীরা এসব গুড় বিক্রি করছে। গুড় উৎপাদনকারীরা জানায়, কার্তিক মাসের মধ্যভাগ থেকে চৈত্র মাসের প্রথম সপ্তাহজুড়ে চলনবিল অঞ্চলের নাটোরের গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম, লালপুর, পাবনার চাটমোহর উপজেলায় বিকল্প আয়ের পথ হিসেবে খেজুর গুড় উৎপাদিত হয়ে থাকে। চাঁচকৈড় হাটে আসা প্রান্তিক গুড় উৎপাদনকারী রওশন আলী, খবীর প্রামাণিক ও কোরবান আলী জানান, তাঁরা রস নিতে প্রতিটি খেজুর গাছের জন্য মালিককে মৌসুমভিত্তিক ২০০-৩০০ টাকা দেন। মজুরি, জ্বালানি খরচ করে উৎপাদন খরচ ওঠে না। খাঁটি গুড়ের প্রতি কেজির উৎপাদন খরচ পড়ে গড়ে ১০০ টাকা। কিন্তু বাজারে এত দামে বেচা যায় না। তাই গুড়ের চাহিদা ও উৎপাদন খরচ পুষিয়ে নিতে প্রতি ১০ লিটার রসে দুই কেজি চিনি মেশান তাঁরা। গুড়ের রং ফর্সা ও গুড় শক্ত করতে চিনি মেশাতে হয়। এই গুড়ে প্রকৃত স্বাদ-গন্ধ থাকে না। পিঠা-পায়সের উপযোগিতাও থাকে না। চিনিমুক্ত গুড় হয় কালচে। তাতে প্রকৃত স্বাদ-গন্ধ অটুট থাকে। এই গুড় প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়।

এসব গুড় উৎপাদনকারী ও বিক্রেতার ভাষ্য মতে, প্রতি আট লিটার খেজুর রসে এক কেজি গুড় হয়। প্রতি কেজি গুড় উৎপাদনে খরচ হয় ১০০ টাকা। পক্ষান্তরে ১০ কেজি রসের সঙ্গে দুই কেজি চিনি মেশালে গুড় বেড়ে হয় দ্বিগুণ। বাজারে প্রতি কেজি চিনির দাম ৬০ টাকা। ভেজাল গুড় বানিয়ে বাড়তি মুনাফা হচ্ছে।

বড়াইগ্রাম থেকে তোলা ছবি।   ছবি : কালের কণ্ঠ

বড়াইগ্রামের বনপাড়া বাজার, লালপুরের ওয়ালিয়া গ্রাম, নলডাঙ্গা থানা সদর, বাগাতিপাড়ায় একই প্রক্রিয়ায় ভেজাল গুড় তৈরি হচ্ছে। মঙ্গলবার বিকেলে ওয়ালিয়া বাজারে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রুলি বিশ্বাস। অভিযানকালে রাসায়নিক ও রং ব্যবহার করে ভেজাল খেজুরের গুড় তৈরির প্রমাণ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় তিনটি কারখানা মালিককে এক লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ৭ জানুয়ারি বড়াইগ্রামের ভবানীপুরে পাঁচটি এবং কালিকাপুরে একটি বড় কারখানায় অভিযান চালায় প্রশাসন ও র‌্যাব। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত কালিকাপুরের ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলামকে এক বছরের কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড, কারখানার জমির মালিক রিকি কস্তাকে ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেন। একই দিন ভবানীপুরে ভেজাল খেজুরের গুড় তৈরির দায়ে কোরবান আলীকে ৫০ হাজার, তাঁর ভাই সাজদার আলীকে ১৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় ২৪ মণ ভেজাল পাটালি গুড়, চার ড্রাম পচা তরল গুড়, ৩২ মণ আখের চিনি, দুই লিটার রং মিশ্রিত কেমিক্যাল, ২৮ কেজি পাথুরে চুনসহ গুড় তৈরির সরঞ্জমাদি জব্দ করা হয়। ১৭ জানুয়ারি ভবানীপুরে ভেজাল গুড় তৈরির অভিযোগে জয়নাল আবেদীনকে আটক করে র‌্যাব। পরে তাঁকে ভ্রাম্যমাণ আদালত দুই মাসের কারাদণ্ড দেন।

চাঁচকৈড় বাজারে আসা ঢাকার পাইকার হানিফ আলী ও সিরাজগঞ্জের উল্লাহপাড়ার আসমত ব্যাপারী জানান, খেজুর গুড়ের সেই ঐতিহ্য আর নেই। মৌসুমি গুড় উৎপাদনকারী ও মহাজনরা ভেজাল গুড় তৈরি করছে। গুড়ের রং ফর্সা ও গুড় শক্ত করতে তারা চিনির সঙ্গে ক্ষতিকারক রাসায়নিক মিশিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছে।

নাটোর সদর হাসপতালের আবাসিক চিকিৎসক আবুল কালাম আজাদ জানান, খেজুর গুড়ে চিনি, রং, হাইড্রোজ, সোডা, ফিটকিরির মতো ভেজাল মিশ্রণের কারণে খাদ্যনালিতে ক্যান্সার, কিডনি ড্যামেজ, লিভারের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

নাটোরের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মনিরুজ্জামান ভূঞা বলেন, খেজুর গুড়ে ভেজাল মেশানোর বিচ্ছিন্ন অভিযোগ তাঁর কাছে রয়েছে। ভেজাল ও নিম্নমাণের গুড় তৈরি বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার করা হবে। র‌্যাব-৫ (নাটোর সিপিসি-২)-এর কম্পানি কমান্ডার মেজর শিবলী মোস্তফা ও বড়াইগ্রামের ইউএনও আনোয়ার পারভেজ জানান, জেলা প্রশাসনের পরামর্শে ভেজাল গুড় উৎপাদকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে।


মন্তব্য