kalerkantho

ফটো আপা

অমিতাভ দাশ হিমু, গাইবান্ধা   

২১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ফটো আপা

গাইবান্ধার সাঘাটায় বৃদ্ধাশ্রমের সামনে বৃদ্ধ নারীদের পরামর্শ দিচ্ছেন ফটো আপা। ছবি : কালের কণ্ঠ

সুলতানা শামীম আরা বেগম (৫৪) থাকেন গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামে। তাঁর পেশা শিক্ষকতা হলেও সাধারণ মানুষ তাঁকে চেনে অন্য পরিচয়ে। তিনি সমাজের অবহেলিত, স্বজনদের মমতাবঞ্চিত বৃদ্ধ নারীদের সেবা করে ‘মমতাময়ী আপা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। ফজরের নামাজ পড়েই তিনি তাঁর কচুয়াহাট এলাকার গ্রামের বাড়ি থেকে প্রায় প্রতিদিন বেরিয়ে পড়েন। খোঁজখবর নেন আশপাশের অসহায় বৃদ্ধাদের। ফটো আপার উপস্থিতি মানেই জীবনের দুঃখ-ব্যথা মন খুলে বলা। আনাবি, কস্তুরি আর ছমিরন বেওয়ারা হাসি-কান্নার ঝাঁপি খুলে বসেন একসঙ্গে। তাঁদের সঙ্গে হাসেন, কাঁদেন ফটো আপাও। মাথায় হাত বুলিয়ে তাঁদের সমস্যার কথা শোনেন। তারপর বাসায় ডাকেন, নিজের চেষ্টায় যতটা পারেন, সমস্যার সমাধান করে দেন। ১১ বছর ধরে এর মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছেন শত শত বয়স্ক নারী।

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার সাঘাটা সদর ইউনিয়নের কচুয়াহাট গ্রাম ঘুরে জানা গেছে সাদাসিধে নিরহংকারী ফটো আপার নানা কাহিনি। কোনো উচ্চাভিলাষ নেই তাঁর। সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেকে পৌঁছে দিয়েছেন এক অন্য উচ্চতায়। শামীম আরা বেগমের বাবা চিকিৎসক ডা. শামছুজ্জোহার স্বপ্ন  ছিল মেয়ে চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করবে। কিন্তু ১৯৮০ সালে ম্যাট্রিকে অসুস্থতার কারণে ফল তেমন ভালো না হওয়ায় অনেকটাই ভেঙে পড়েন শামীম আরা। এমন পরিস্থিতিতে ১৯৮২ সালে তিনি উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৮৬ সালে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের সাত দিন পর কচুয়াহাট শহীদ এইচ আর এম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তাঁর স্বামী আব্দুর রাজ্জাক মণ্ডল সাঘাটা ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক। তাঁদের সংসারে এক মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে রাজিয়া সুলতানা অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং ছেলে জারিফ দশম শ্রেণিতে পড়ে। দৃঢ় মনোবলের অধিকারী ফটো আপা ২০১২ সালে স্নাতক পাস করেন। তাঁর বাবার ইচ্ছা ছিল একটি হাসপাতাল গড়ে বাবা-মেয়ে মিলে মানুষের সেবা করবেন। কিন্তু ২০০৪ সালে হঠাৎ বাবা মারা যান। নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ফটো আপা ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে বৃদ্ধ নারীদের কল্যাণে কাজ শুরু করেন। নিজের টাকায় বাড়ির পাশের ধনারুহা গ্রামে ১১ শতক জমি কেনেন। ওই জমিতে প্রায় ছয় লাখ টাকা ব্যয়ে টয়লেটসহ আধাপাকা ঘর নির্মাণ করেন। সেখানে পাঁচটি কক্ষ, বিদ্যুৎ, পানির সংযোগসহ সব ধরনের সুযোগ রাখা হয়েছে। ২০১৩ সালে সেখানে গড়ে তোলা বৃদ্ধাশ্রমের নাম দেন ডা. শামছুজ্জোহা মেমোরিয়াল বৃদ্ধাশ্রম।

ফটো আপা জানান, বিশেষত স্বামী নেই, ছেলে-মেয়েরা ছেড়ে চলে গেছে এবং নিরাশ্রয় এমন বৃদ্ধাদের চিকিৎসায় নিজের টাকায় ওষুধ কিনে দেন তিনি। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের অনুরোধ করে বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, ভিজিডি কার্ড পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। ২০০৭ থেকে এখন পর্যন্ত কয়েক শ বৃদ্ধাকে সহায়তা করেছেন ফটো আপা। তাঁরা ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়েছেন। সহায়তা দেওয়ার পর তাঁরা কেমন আছেন, তা জানতে বৃদ্ধাশ্রমে বসে সাপ্তাহিক বৈঠক। ফটো আপা বলেন, ‘আমার স্বামী কলেজ শিক্ষক হওয়ায় তাঁর টাকায়ই সংসার চলে যায়। নিজের বেতনের টাকার পুরোটা আর জমিজমার আয় দিয়ে বৃদ্ধ নারীদের কল্যাণে কাজ করছি।’

ফটো আপা বলেন, ‘টাকার অভাবে বৃদ্ধা নারীদের বৃদ্ধাশ্রমে রেখে সেবা দিতে পারছি না। তাই শুধু পরামর্শ আর সাহায্য কেন্দ্র হিসেবে সেটি চলছে। জনপ্রতিনিধিসহ অনেক বড় মানুষ নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু কেউ কথা রাখেননি। তবু আশা ছাড়িনি। যেখানেই যাই বৃদ্ধাশ্রমের ব্যাপারে সহযোগিতা প্রার্থনা করি।’ সাঘাটা উপজেলা প্রশাসনের একটি সূত্রে জানা গেছে, ফটো আপা মানবাধিকারকর্মী হিসেবে ২৯টি কমিটির সভাপতি, সম্পাদকসহ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করছেন। বৃদ্ধাদের সহায়তার পাশাপাশি তিনি বাল্যবিয়ে রোধ, গ্রামে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় ভূমিকা রাখা এবং শিক্ষা, সামাজিক কাজের জন্য জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ১৩টি পুরস্কার পেয়েছেন। সেবাপাগল এ মানুষটি তাঁর বৃদ্ধাশ্রমে ৩০-৩৫ জন এতিম শিশুর পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছেন। সেখানে বিনা পয়সায় একজন শিক্ষক রাখা হয়েছে, যিনি তাদের পড়ালেখা শেখান। আর ওই শিক্ষক নিজেও বৃদ্ধাশ্রমের একটি কক্ষে থেকে স্থানীয় একটি কলেজে স্নাতকোত্তর পড়ছেন। ফটো আপা বলেন, ‘বয়স বেশি হলে মানুষ অসহায় হয়ে পড়েন। বয়স্ক মানুষদের দেখলেই আব্বার কথা মনে পড়ে। চিকিৎসক হয়ে তাঁর স্বপ্ন সফল করতে পারিনি। তাই বৃদ্ধাদের জন্য কাজ করছি।’


মন্তব্য