kalerkantho


শীতে বিবর্ণ বীজতলা

নীলফামারীতে বোরো চাষিরা দিশাহারা

নীলফামারী প্রতিনিধি   

২১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নীলফামারীতে শীতে বিবর্ণ হয়ে গেছে বোরো ধানের বীজতলা। প্রতিষেধক ছিটিয়েও কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে বোরো আবাদ নিয়ে শঙ্কায় পড়েছে কৃষকরা। শনিবার জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বীজতলা বিবর্ণ হওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে। বেশির ভাগ বীজতলা বিবর্ণ হয়ে লালচে রং ধারণ করেছে। আবার কোথাও দেখা গেছে বীজতলায় চারা শুকিয়ে মরে গেছে। এসব বীজতলায় পরিচর্যা করতে দেখা গেছে অনেককে। আবার অনেকে তড়িঘড়ি করে চারা তুলে রোপণ করছে জমিতে।

কৃষকরা বলছে, ‘টানা কুয়াশা ও শীতের কারণে বীজতলার এমন দশা। পর্যাপ্ত প্রতিষেধক ছিটিয়েও আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে চারা কিনে বোরো আবাদ করতে হবে। তাতে খরচ বাড়বে।’ জেলা সদরের ইটাখোলা ইউনিয়নের কানিয়ালখাতা গ্রামের কৃষক বকুল চন্দ্র রায় (৪৫) এবার বোরো আবাদ করবেন পাঁচ বিঘা জমিতে। তাঁর বীজতলার বয়স হয়েছে ৩৫ দিনেরও বেশি। কিন্তু বিবর্ণ আকার ধারণ করে চারা মরতে শুরু করায় এখন তিনি দিশাহারা। শনিবার দুপুরে বীজতলা পরিচর্যা করছিলেন তাঁর স্ত্রী সুমিতা রানী রায়। তিনি বলেন, ‘আগেরবার ধান নষ্ট হইল, এইবার শীতোত বিছন নষ্ট হইল, মাথা কেমন করি ঠিক থাকে হামার।’ বিবর্ণ বীজতলা পরিচর্যা করতে দেখা গেছে একই গ্রামের কৃষক বিনয় চন্দ্র রায়ের (৪৬) স্ত্রী বনলতা রায়কে। তিনি বলেন, ‘গারিবার (জমিতে চারা রোপণ) সময় হইল, এলা বিছন মরেছে। পালা (কুয়াশা) কাটেবার মেলা ওষুধ (প্রতিষেধক) দিনো তাহো বিছন মরেছে। এলা বিছন কিনি হামাক আবাদ করির নাগিবে।’ গ্রামের গোবিন্দ চন্দ্র রায় (৪৫) বলেন, ‘এইবার মুরাই (সব জায়গায়) বিছন নষ্ট হইচে। কালি (গতকাল) পাঁচমাথা গ্রামোত গেনু (গেলাম) সেইঠেও দেখছো বিছন নষ্ট।’

জেলা সদরের কুন্দপুকুর ইউনিয়নের সুটিপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে একই অবস্থা। সেখানে জমিতে রোপণের জন্য বীজতলা থেকে চারা তুলছিল দুই কৃষি শ্রমিক। ওই বীজতলার বয়স হয়েছে ৪৫ দিনের বেশি। এ সময় কৃষি শ্রমিক আব্দুল খালেক বলেন, ‘ছয়জন মিলিয়া (মিলে) তিন বিঘা জমিত রোয়া (চারা) লাগেবার চুক্তিতে কাম করেছি। প্রত্যেক বিঘাত মজুরি পামো এক হাজার টাকা করি। এলা দেখেছি কাম আগাছে না। মরা বিছন বাছি ফেলেয়া কাম করির লাগেছে।’ আরেক শ্রমিক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘জমিত এইলা বিছন গারিয়া (লাগেয়া) আবাদ যে কেমন হোবে বোঝা যাছে না। ভালো বিছন হইলে আবাদ ভালো হয় এইটাই হামেরা জানি।’ একই ইউনিয়নের উত্তর সুটিবাড়ী গ্রামের কৃষক গোলাম মোস্তফা এবার বোরা আবাদ করবেন ৩২ বিঘা জমিতে। তিনি বলেন, ‘বিছন নষ্ট হচ্ছে শীতের আবহাওয়ার জন্য। জমিতে চারা রোপণের কিষানও পাওয়া যাচ্ছে না। জমি তৈরির পরও কিষানের অভাবে ফেলে রেখেছি। গতবার চারা রোপণে বিঘাপ্রতি ৫০০ টাকা খরচ হয়েছে, এবার সেখানে এক হাজার টাকা লাগছে। বিছন নষ্টের কারণে বাছাই করে তুলতে সময় লাগছে।’

গোলাম মোস্তফা জানান, এলাকার সব বীজতলা বিবর্ণ আকার ধারণ করেছে, অনেক স্থানে চারা মরে গেছে। ওই চারা রোপণ করে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে না। এরপরও নিরুপায় হয়ে এলাকার কৃষকরা তড়িঘড়ি করে বোরো চারা রোপণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্র মতে, জেলায় এবার বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৪ হাজার ২৭৯ হেক্টর জমিতে। এ জন্য বীজতলা তৈরি হয়েছে চার হাজার ৯৭০ হেক্টর জমিতে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মো. আফতাব হোসেন বলেন, ‘এ বছর স্মরণকালের রেকর্ড পরিমাণ শীত পড়েছে। এ নিয়ে আমরাও উদ্বিগ্ন। কোল্ড ইনজুরির কারণে বোরো বীজতলা লালচে বর্ণ হচ্ছে। সেগুলোতে আমরা সালফারযুক্ত ওষুধ ছিটানোর পরামর্শ দিচ্ছি। একটু রোদ হলে তাতে জিপসাম ও ইউরিয়া দিতে বলছি। শীত অনেকটাই কেটে গেছে। দুই দিন রোদ হলে চারা সবুজ হবে। আর সমস্যা থাকবে না। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে আছেন। কৃষকরা চাইলে তাদের কাছে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিতে পারে।’


মন্তব্য