kalerkantho


টর্চের আলোয় সিজার প্রসূতির মৃত্যু

বাঘারপাড়ায় ক্লিনিক বন্ধ করে দিলেন সিভিল সার্জন

বিশেষ প্রতিনিধি, যশোর   

১৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলা সদরের নিউ সেবা ক্লিনিকে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় সিভিল সার্জন সরেজমিন পরিদর্শন করে ক্লিনিকটি বন্ধ করে দিয়েছেন।

স্থানীয়রা জানায়, ২০১৭ সালের ৭ ডিসেম্বর বাঘারপাড়া ডাকঘরের দক্ষিণ পাশে জরাজীর্ণ একটি দ্বিতল ভবনে নিউ সেবা নামে ক্লিনিক খুলে চিকিৎসা বাণিজ্য শুরু করেন লিটন ও সাখাওয়াত। স্বাস্থ্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট কোনো বিভাগের অনুমোদন নেননি তাঁরা। নিয়োগ দেওয়া হয়নি এমবিবিএস পাস কোনো চিকিৎসক। এমনকি ডিপ্লোমা পাস করা কোনো নার্সও নেই। খুপরিঘরের মধ্যে বানানো হয়েছে অস্ত্রোপচারকক্ষ। রোগীর শয্যার পরিবর্তে কাঠের চৌকিতে চিকিৎসা দেওয়া হতো। সার্বক্ষণিক বিদ্যুতের কোনো ব্যবস্থা নেই। এত অব্যবস্থার মধ্যে ক্লিনিকটিতে নিয়মিত সিজারসহ বিভিন্ন রোগীর অস্ত্রোপচার হতো।

এই ক্লিনিকে গত ৬ মার্চ রাত আনুমানিক ৮টায় একলেমশিয়া রোগে আক্রান্ত প্রসূতি রেশমা খাতুনকে (২৫) ভর্তি করায় পরিবারের লোকজন। তিনি জামালপুর গ্রামের মুনছুর মোল্লার মেয়ে। তাঁর শ্বশুরবাড়ি নড়াইলের আফরায়। ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ সালাউদ্দিন নামের একজন চিকিৎসককে দিয়ে সিজার করানোর উদ্যোগ নেয়। তিনি প্রসূতি বিশেষজ্ঞ না হওয়া সত্ত্বেও রোগীর অস্ত্রোপচার শুরু করেন। কোনো অবেদনবিদও ছিলেন না। একপর্যায়ে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় টর্চ জ্বেলে অস্ত্রোপচার শেষ করার চেষ্টা করেন সালাউদ্দিন। ছেলেসন্তানের জননী হন রেশমা। কিন্তু অস্ত্রোপচার টেবিলে তাঁর চরম খিঁচুনি ওঠে। যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। রক্তক্ষরণও বন্ধ হচ্ছিল না। এতে অনভিজ্ঞ চিকিৎসক দিশাহারা হয়ে পড়েন। এদিকে রোগীর রক্তচাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় জরায়ুর ভেতর থেকে প্লাসেন্টা (ফুল) অপসারণ করা হয়নি। তড়িঘড়ি করে পেটের কাটা স্থান সেলাই করে সটকে পড়েন চিকিৎসক। এর ফলে রক্ত জমে রোগীর পেট ফুলে ওঠে। যন্ত্রণায় ছটফট করলে রোগীর লোকজন ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের ওপর চড়াও হয়। একপর্যায়ে ওই রাতেই রোগীকে যশোর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হওয়ায় রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এদিকে চিকিৎসক সালাউদ্দিন বিষয়টি জানতে পেরে ভয়ে ওই রোগীর লোকজনকে ম্যানেজ করে ইবনে সিনা প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে দ্বিতীয় দফায় অস্ত্রোপচার করেন। এতে রোগীর অবস্থা আরো অবনতি হয়। শেষে তাঁকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রবিবার রাতে এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

এ বিষয়ে চিকিৎসক সালাউদ্দিন বলেন, ‘কোনো ভুল চিকিৎসা দিইনি। একটু-আধটু এদিক-ওদিক হলেই রোগীর লোকজন উল্টাপাল্টা কথা বলে। সব বিষয়ে কান দেওয়া ঠিক না।’

রোগীর ভাই আবু হাসান বলেন, ‘ক্লিনিকের মালিক সাখাওয়াত ও ডাক্তার সালাউদ্দিন টাকার লোভে আমার বোনকে মেরে ফেলছে। আমি এর বিচার চাই।’

যশোরের সিভিল সার্জন দিলীপ কুমার রায় বলেন, ‘ক্লিনিকটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্তের পর দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


মন্তব্য